প্রশ্ন - নির্ভরযোগ্যতা কাকে বলে? নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ের পদ্ধতি গুলি কি কি? যেকোনো দুটি পদ্ধতির বিবরণ দাও।
ভূমিকা:- নির্ভরযোগ্যতা হল স্থিরতা। কোনো পরিমাপক যন্ত্রের নির্ভরযোগ্যতা বলতে বোঝায়, ওই যন্ত্র দ্বারা যদি কোনো বস্তুকে সদৃশ পরিস্থিতিতে দু-বার পরিমাপ করা যায় তাহলে ফল সমান হবে। এই অর্থে কোনো অভীক্ষা নির্ভরযোগ্য হবে যদি উক্ত অভীক্ষা দ্বারা কোনো ব্যক্তিকে সমপরিস্থিতিতে পরিমাপ করা হয়, তাহলে ফল একই হবে। যথার্থতার মতো নির্ভরযোগ্যতাও অভীক্ষার নয়, নির্ভরযোগ্যতা পরিমাপের।
নির্ভরযোগ্যতা Reliability:- যদি কোন শিক্ষাগত ও মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষা দ্বারা একই শিক্ষার্থীর একই বৈশিষ্ট্য প্রায় একই পরিস্থিতিতে একাধিকবার পরিমাপ করলে একই ফল সবসময় পাওয়া যায়। মাখিক পরী তাহলে অভীক্ষাটিকে এবং প্রাপ্ত পরিমাপটিকে নির্ভরযোগ্য (Reliability) বলা যায়। পরিমাপের এই সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থিরতা বা অপরিবর্তনীয়তার মাত্রাকেই পরিমাপটির নির্ভরযোগ্যতা (Reliability) বলা হয়।
অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয় করার পদ্ধতি:-নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয় করার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করার পূর্বে নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কিত কিছু তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। এগুলি হল—
1. নির্ভরযোগ্যতা হল অভীক্ষার প্রাপ্ত ফলের স্থিরতা অভীক্ষার স্থিরতা নয়। সেজন্য অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতার পরিবর্তে অভীক্ষার স্কোরের নির্ভরযোগ্যতা বলা উচিত।
2. অভীক্ষার স্কোরের স্থিরতা সাধারণ বৈশিষ্ট্য নয়। স্থিরতার প্রেক্ষিতে উল্লেখ করা। প্রয়োজন। যেমন সময়ের প্রেক্ষিতে স্থিরতা, প্রশ্নের বিভিন্ন Sample-এর উত্তরের স্থিরতা, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নম্বর দানের স্থিরতা ইত্যাদি।
3. নির্ভরযোগ্যতা যথার্থতার একটি শর্ত। কিন্তু একমাত্র শর্ত নয়। নিম্নমাত্রার নির্ভরযোগ্যতা নিম্নমাত্রার যথার্থতার কারণ, কিন্তু উচ্চমাত্রার নির্ভরযোগ্যতা উচ্চমাত্রার যথার্থতাকে নিশ্চিত করে না।
4. নির্ভরযোগ্যতা প্রধানত পরিসংখ্যানগত। একে হয় নির্ভরযোগ্যতা সহগ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়, না হয় Standard Error of Measurement দ্বারা ব্যস্ত হয়।
Type of Reliability Test:-
১.পুনঃঅভীক্ষা পদ্ধতি (Test Retest Method) :-কোনো অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল পুনঃঅভীক্ষা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে বিবেচ্য অভীক্ষাটি (যার নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয় করতে হাবে) একদল শিক্ষার্থীর ওপর প্রায় একই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র সময়ের ব্যবধান পরপর দুবার প্রয়োগ করা হয়।
ত্রুটি :- পুনঃঅভীক্ষা পদ্ধতিতে নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ে নিম্নলিখিত ত্রুটিগুলি লক্ষ করা যায়। যথা-
(i) অভীক্ষাটির দুবার প্রয়োগের মধ্যে যদি সময়ের ব্যবধান খুব কম হয় (1-2 দিন), তাহলে অভীক্ষার্থীর স্মৃতি, অনুশীলন, অভিজ্ঞতা সঞ্চালনের জন্য দ্বিতীয় প্রয়োগে প্রাপ্ত ফলাফলে উন্নতি লক্ষ করা যায়। ফলে নির্ভরযোগ্যতা সহগারে যে মান পাওয়া যায় তা অভীক্ষাটির নির্ভরযোগ্যতার সঠিক পরিমাপ নয়।
(ii) আবার সময়ের ব্যবধান খুব বেশি হলেও (6 মাস বা তার বেশি) শিক্ষার্থীর অর্জিত নতুন অভিজ্ঞতাগুলি দ্বিতীয় প্রয়োগের ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।ফলে নির্ভরযোগ্যতা সহগাঙ্কের মান হ্রাস পাবে।
(iii) অভীক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমপরিস্থিতি বজায় রাখা অনেকক্ষেত্রে সম্ভব না হওয়ার নির্ভরযোগ্যতার সঠিক মান পাওয়া যায় না। অর্থাৎ উপরোক্ত ত্রুটিগুলির জন্য পুনঃঅভীক্ষা পদ্ধতিতে কোনো অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতার সঠিক মান নির্ধারণ করা যায় না।
২. বিকল্প পদ্ধতি বা সমান্তরাল পদ্ধতি বা সমতুল্য অভীক্ষা পদ্ধতি (Alternate Form or Parallel Form or Equivalent Test Method): -এই পদ্ধতিতে কোনো অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ের জন্য একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন (different) কিন্তু সদৃশ (equivalent) অভীক্ষা গঠন করা হয়। অভীক্ষা দুটির বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য, কাঠিন্যমাত্রা নির্দেশাবলির প্রকৃতি, অভীক্ষাপদের পার্থক্য নির্ণায়ক মান, সময়সীমা ইত্যাদির মধ্যে পরিপূর্ণ সাদৃশ্য থাকে। তাই অভীপ্স দুটিকে “সমান্তরাল অভীক্ষা” বলা হয়।
সমান্তরাল অভীক্ষার বৈশিষ্ট্য : - অভীক্ষা দুটির মধ্যে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি থাকলে তাদের সমান্তরাল অভীক্ষা বলা হবে। যথা-
(i) উভয়ক্ষেত্রে অভীক্ষাপদের সংখ্যা একই হবে।
(ii) অভীক্ষাপদের প্রকৃতি, কাঠিন্যমাত্রা ও বিন্যাসে সাদৃশ্য থাকবে।
(iii) উভয় অভীক্ষার সময়সীমা একই হতে হবে।
(iv) বিষয়বস্তুগত ও উদ্দেশ্যগত সাদৃশ্য থাকবে।
(v) উভয় অভীক্ষার উত্তরদানের জন্য একইরকম নির্দেশাবলি থাকবে।
(vi) অভীক্ষা পরিচালনা ও নম্বরদানের ক্ষেত্রে একই নিয়ম ও নির্দেশ অনুসরণ করা হবে।
ত্রুটি :- এই পদ্ধতিতে নিম্নলিখিত ত্রুটিগুলি লক্ষ করা যায়-
i) অভীক্ষা দুটি সদৃশ হওয়ায় প্রথম অভীক্ষাগ্রহণের অভিজ্ঞতা বিকল্প অভীক্ষার ফলাফলকে প্রভাবিত করে।
(ii) সমান্তরাল অভীক্ষা গঠনে ব্যক্তিগত প্রভাব পড়ে। কারণ, দুটি অভীক্ষাপদ ভিন্ন বাস্তির কাছে সমকাঠিন্যমান সম্পন্ন মনে নাও হতে পারে।
(iii) দুটি অভীক্ষাগ্রহণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কম হলে নির্ভরযোগ্যতার মান বেশিহবে। আবার সময়ের ব্যবধান বেশি হলে নির্ভরযোগ্যতার মান কম হয়।
(iv) দুটি যথাযথ সমান্তরাল অভীক্ষা গঠন সময়সাপেক্ষ ও পরিশ্রমসাধ্য ।
উপরোন্ত ত্রুটিগুলি থাকা সত্ত্বেও সমান্তরাল অভীক্ষা পদ্ধতি হল নির্ভরযোগ্যতা নির্ধারণের অধিকতর সন্তোষজনক কৌশল। অভীক্ষা দুটি প্রয়োগের মধ্যে কমপক্ষে 2-4 সপ্তাহ সময়ের ব্যবধান রাখা হলে অভীক্ষার্থীর পূর্ব অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সুযোগ হ্রাস পায়।
.৩ অর্ধ-দ্বিখণ্ডিত পদ্ধতি (Split-half Method or Intra Split half method):- পুনঃ অতীক্ষা পদ্ধতি ও সমান্তরাল অভীক্ষা পদ্ধতিতে দুবার অভীক্ষা প্রয়োগের মধ্যে।সময়ের ব্যবধান থাকায় অভীক্ষার্থীর স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সঞ্চালন নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ে প্রভাব ফেলে। এর ফলে নির্ভরযোগ্যতার স্থায়ী মান নির্ণয় করা যায় না। অর্ধ-দ্বিখণ্ডি পদ্ধতিতে এই অসুবিধা দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।অর্ধক দ্বিখন্ডিত পদ্ধতির নির্ণয় করার এই পদ্ধতিতে কোনো অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতার সহগাঙ্ক নির্ণয় করতে হলে নিম্নলিখিত পর্যায়গুলি অনুসরণ করতে হয়।
প্রথম ধাপ:- প্রথমে অভীক্ষাটি একদল নির্বাচিত অভীক্ষাথীর ওপর প্রয়োগ করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ :- প্রয়োগের পর অভীক্ষাপদগুলিকে দুটি অংশে ভাগ করে নেওয়া হবে।
তৃতীয় ধাপ:- অভীক্ষার অন্তর্গত যুগ্ম ক্রমিক সংখ্যাসম্পন্ন অভীক্ষাপদগুলিতে প্রাপ্ত স্কোর এবং অযুগ্ম ক্রমিক সংখ্যা সম্পন্ন অভীক্ষাপদগুলিতে প্রাপ্ত স্কোর-এর পৃথক দুটি বণ্টন নির্ণয় করা হবে।
চতুর্থ ধাপ :- দুটি পৃথক স্কোর বণ্টনের সহগতির সহগাঙ্ক নির্ণয় করা হবে। যা অভীক্ষার দুটি অর্থের নির্ভরযোগ্যতার সহগাঙ্ক (Reliability Co-efficient of Half-tests)।
পঞ্চম ধাপ:- • খণ্ডিত অংশের নির্ভরযোগ্যতার মান থেকে পূর্ণ অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ের জন্য স্পিয়ারম্যান ও ব্রাউনের (Spearman Brown Formula) সূত্র প্রয়োগ করা হবে।
পদ্ধতির সুবিধা :- পুনঃঅভীক্ষা পদ্ধতি ও সমান্তরাল অভীক্ষা পদ্ধতির চেয়ে এই পদ্ধতি অধিক সুবিধাজনক।
কারণ— (i) বিবেচ্য অভীক্ষাটিকে একবারই প্রয়োগ করতে হয়। তাই নির্ভরযোগ্যতার মান নির্ণয়ে অভীক্ষার্থীর স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সঞ্চালনের কোনো প্রভাব পড়ে না।
(ii) দুটি পৃথক (বিকল্প) অভীক্ষা গঠন করার প্রয়োজন না থাকায় সময়ও কম লাগে আবার পরিশ্রমও লাঘব হয়।
পদ্ধতির ত্রুটি :-এই পদ্ধতিতে কোনো অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতার যে মান নির্ণয় করা হয় তা সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত বলা যায় না। কারণ—
১)অভীক্ষাটিকে যে দুটি খন্ডে বিভক্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যেকার সাদৃশ্য সম্পূর্ণভাবেই অনুমানভিত্তিক। তাই নির্ভরযোগ্যতার যে মান পাওয়া যায় তা অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।
২) অভীক্ষার অন্তর্গত অভীক্ষাপদগুলির ভিন্ন ভিন্ন বিন্যাসের খুন অভীক্ষার খন্ডিতাংশ দুটির মধ্যে পৃথক পৃথক সংগতির সহগাঙ্কের মান পাওয়া যাবে। ফলে নির্ভরযোগ্যতার স্থায়ী মান পাওয়া যাবে না।
৩.অন্তপদীয় সামগ্ধস্য পদ্ধতি (Inter-item Consistency Method) :- এই পদ্ধতিতে কোনো অভীক্ষার নির্ভরযোগ্যতার মান নির্ধারণ করতে হলে অভীক্ষাটিকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রয়োজন হয় না। অর্ধ-দ্বিখণ্ডিত পদ্ধতির মতো এই পদ্ধতিতেও অভীক্ষার অন্তর্গত অভীক্ষাপদগুলির অভ্যন্তরীণ সাম্যস্যতা নির্ণয় (Measure of internal consis- tency) করা হয়।


0 মন্তব্যসমূহ
Thank you