পরা ও অপরা বিদ্যা (Para and Apara Vidya)
আত্মার মুক্তি ও বিশ্বাত্মাকে উপলব্ধি জীবনের চরম লক্ষ্য মনে করলেও ভারতীয় ঋষি মানুষের ব্যবহারিক পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় শিক্ষা সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন না। উপনিষদের ঋষি নির্দেশ দিলেন-"ছে বিদ্যে বেদিতব্যে পরা ৪ অপরা চ" (দুই প্রকার বিদ্যার অনুশীলন করতে হবে পরা বিদ্যা এবং অপরা বিদ্যা)।
পরম জ্ঞানলাভের জন্য তিন বেদ, ছয় বেদালা এবং বেদান্ত অনুশীলন করার কথা বলা হল। আত্মসংযম ও যোগ সাধনার পথে এই বিদ্যালাভ করতে হবে। এটাই হল পরাবিদ্যা। অপরদিকে পার্থিব দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অনুশীলনকে অপরা বিদ্যারূপে অভিহিত করা হল। অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্যা বা অধ্যাত্ম বিদ্যাই পরাবিদ্যা, আর যাবতীয় শিল্প, কলা, সাহিত্য ইত্যাদি হল অপরাবিদ্যা। পরাবিদ্যা-অপরাবিদ্যার সার্থক সমন্বয়ে সফল হয়েছে প্রাচীন বৈশ্বিক শিক্ষা। উপনিষদের ঋষি বলেছেন-
"অবিদ্যয়া মৃত্যুংভীত্বা বিদ্যায়াহমৃতশ্রুতে"-অবিদ্যা অর্থাৎ কলা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প বিদ্যার অনুশীলন প্রয়োজন পার্থিব জগতে বেঁচে থাকার জন্য এবং শিক্ষার্থীকে সমাজে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য। আর ব্রহ্মবিদ্যার অনুশীলন প্রয়োজন অমৃতত্ব লাভ বা চরমশান্তির জন্য। বৈদিকযুগে কি ব্রাহ্মণ্যযুগে অতি সামান্য সংখ্যক শিক্ষার্থীই আজীবন ব্রহ্মচারী থেকে অধ্যয়ন অধ্যপনা ও সত্যানুসন্ধানে নিয়োজিত ছিলেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই গার্হস্থ্য জীবনে প্রবেশ করেছেন। তাই শিক্ষার নিকট বা প্রত্যক্ষ লক্ষ্য এবং অন্তিম লক্ষ্য দুটিই ছিল। প্রথমটি পার্থিব ব্যবহারিক জীবনের যোগ্যতা অর্জনের জন্য এবং দ্বিতীয়টি নিজের পূর্ণতাকে উপলব্ধি করে অসীম সত্তার সঙ্গে মিলনের জন্য। তাই পরাবিদ্যা প্রাচীন ভারতে শিক্ষার শেষ কথা হলেও অপরাবিদ্যা প্রাচীন শিক্ষায় অবহেলিত হয়নি। উপনিষদে সতর্ক করা হয়েছে এই বলে-
"অন্ধং তমঃ প্রবিশান্তি যে অবিদ্যাং উপাগতে তত ভূয় এবতে উ বিদ্যায়াং রতাঃ।"
যারা কেবল লৌকিক বিদ্যার অনুশীলন করে, তারা অজ্ঞান অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। কিন্তু তার চেয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় তারা, যারা কেবল ব্রহ্মবিদ্যার অনুশীলন করে।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you