1. বৈদিক যুগে শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম ও পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে বর্ণনা করুন।
Ans:-বৈদিক শিক্ষার লক্ষ্য:- প্রাচীন কাল থেকেই ভারতের সভ্যতা সমন্বয় ধর্মী আর্য ঋষি নিজেকে ক্ষুদ্রগম্ভীর মধ্যে আবদ্ধ না রেখে বিশ্বমানবকে বলেছেন “অমৃতস্য পুত্রাঃ”। এই উপলব্ধি থেকেই সমন্বয়ের মনোভাবের জন্ম নিয়েছিল। প্রাচীন ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতি ধর্মকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। আর্য ঋষিরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, পরমাত্মা অবিনশ্বর হলেও জীবাত্মা নশ্বর। তখন শিক্ষা ধর্মের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত ছিল। আর্য ঋষিরা মনে করতেন যে, আত্ম-জ্ঞান ও আত্মপলব্ধি ই হচ্ছে শিক্ষার চরম লক্ষ্য। ‘আত্মনাং বিদ্ধি’ নিজেকে জানবার মধ্য দিয়েই সত্যোপলব্ধির সাধনা আর্য ঋষিরা করে গিয়েছেন। হিন্দু দর্শন ও ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার মতে, শিক্ষার লক্ষ্যহল আত্মোপলব্ধি (Self realization) ও আত্মবিকাশ (Self developnet)। জ্ঞানার্জনের শেষ নেই। শিক্ষার শেষ নেই ‘যাবজ্জীবন অধীতে বিপ্রঃ।“ পরম ব্রহ্মকে জানবার অতীন্দ্রীয় বাসনা থেকেই ভারতীয় আর্য ঋষিরা একসময় বলেছিলেন “ভূমৈব সুখ্যং, নাচ্ছে সুখমস্তি।“ বিদ্যাই মানুষকে মুক্তির সন্ধান দেয়।“সা বিদ্যা যা বিমুক্ত যে।“ আর্য ঋষিরা জাগতিক সুখকে জীবনের চরম বলে মনে করেন নি। “যেনাহং নামুতাস্যাম কিমহং তেন কুম।“ জ্ঞান অর্জন করবার পরিবর্তে চরিত্র গঠন। ব্যাক্তিত্ব বিকাশ ও আত্মোপলব্ধি ছিল প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার আদর্শ ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার শেষ কথা ছিল আত্মার মুক্তি। পরাবিদ্যা ও অপাবিদ্যার মধ্য দিয়েই ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা বিকশিত হয়েছিল। ব্রহ্মবিদ্যা বা অধ্যাত্ম বিদ্যা-ই- পরবিদ্যা; আর যাবতীয় শিল্প বিজ্ঞান কলা ইত্যাদি লৌকিক বিদ্যা হল অপরাবিদ্যা। ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা চেয়েছিল দুই ধরনের শিক্ষার যুগপৎ বিকাশ ঘটাতে। পরাবিদ্যা শিক্ষার শেষ কথা হলেও অপরাবিদ্যা ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল।
বৈদিক শিক্ষার পাঠক্রম:- বৈদিক শিক্ষায় ব্যাপক পাঠক্রম ছিল না। পরে পাঠক্রমের মধ্যে নানাবিধ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ব্রাহ্মণ্য যুগে বর্ণভেদে শিক্ষার তারতম্য সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন বর্ণের উপযোগী বৃত্তি শিক্ষা পাঠক্রমে স্থান পায়। ৪টি বেদ (ঋক, সাম, যজু, অথর্ব), ৬টি বেদাঙ্গ (ছন্দ, ব্যাকরণ, শিক্ষা অর্থাৎ ধ্বনিবিজ্ঞান, নিরুক্ত, কল্প ও জ্যোতিষশাত্র), উনিষদ, আরণ্যক ও ব্রাহ্মণ পাঠক্রমের অন্তগত ছিল। ব্রাহ্মণদের আচরণবিধি পালনের জন্য সূত্র ও দার্শনিক জনের জন্য বেদান্ত ও পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পাঠক্রমের মধ্যে ইতিহাস, পুরাণ, ব্যকরণ, অস্ত্রবিদ্যা, রাশি (গণিত), ভূতবিদ্যা, সর্পবিদ্যা, নক্ষত্র বিদ্যা, একায়ন (নীতিশাস্ত্র), ব্রহ্মবিদ্যা, বাক্যাবাক্য (তর্কপান্ত) ইত্যাদি বিষয়ও স্থান পেয়েছিল।
শিক্ষাদান পদ্ধতি:- ব্রাহ্মণ্য শিক্ষায় মৌখিক পদ্ধতি সর্বাধিক স্থান পেয়েছিল। তবে শুরু অনেক সময় শিষ্যের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষাদান করতেন। বেদ শিক্ষাগ্রহণে অনেক সময় লাগত। সাধারণত শ্রাবণ পূর্ণিমাতে শিক্ষারন্ত হত। অমাবস্যা-পূর্ণিমা, ঝড়-বৃষ্টি, ধর্মানুষ্ঠান প্রভৃতি কারণে শিক্ষাদান বন্ধ থাকত। গুরু-শিষ্যের মধ্যে মধুর সম্পর্ক থাকলে ও শিক্ষার শান্তিদানের ব্যবস্থা ছিল। শিক্ষার্থীদের ভয় দেখিয়ে, খেতে না দিয়ে, ঠান্ডা জলে স্নান করতে দিয়ে শান্তি দেওয়া হত, দৈহিক শান্তিদানের ব্যবস্থা ছিল না।-
❏চরম অবস্থার মধ্যে গুরুগৃহ থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হত। প্রতি বছর ৪ ১/২ থেকে ৬ মাস শিক্ষাদান চলত পরে এই সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ব্রাহ্মণ্য শিক্ষায় ব্যাক্তি কেন্দ্রিক শিক্ষার প্রাধান্য থাকলেও গুরু সমষ্টিগত শিক্ষা ও দিতেন। গুরুর মৌখিক শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীরা আবৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করত। শুরু মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তি ও বিচার স্থান পেত। গুরু ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দিতেন। শিক্ষা পদ্ধতিতে স্মৃতি ও মেধাশক্তির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। শ্রবণ-মনন- নিদিধ্যাসনের মাধ্যমে শিক্ষাদান হত।
শ্রবণ:- গুরু যা বলেন তা মন দিয়ে শোনা।
মনন:- গভীর ভাবে চিন্তা করা।
নিদিধ্যাসন:- একাগ্র ভাবে ধ্যান করে সত্যকে উপলব্ধি করা।
2.- বাংলা ও বিহারের দেশীয় শিক্ষা সম্পর্কে অ্যাডাম এর সুপারিশ গুলি বর্ণনা করুন অ্যাডামের তৃতীয় রিপোর্টটি কেন গুরুত্বপূর্ণ। 12 + 6
ANS:- ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা যুক্তি নির্ভর হওয়ায় শিক্ষার প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। অনেক সময় গুরু সম্বধনে শিক্ষা দিতেন। শিক্ষায় পরীক্ষা ব্যবস্থা না থাকলেও বিতর্ক ও আলোচনায় অংশগ্রহণ থেকে শিক্ষার্থীদের অধীত বিদ্যার পরীক্ষা হত। সমাবর্তন উৎসবের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার্থী তার শিক্ষা সম্পূর্ণ করে গুরুগৃহ থেকে বিদায় নিত। গুরু সমাবর্তন উৎসবে শিক্ষার্থীকে কতকগুলি মূল্যবান উপদেশ দিতেন- সেই উপদেশ গুলি ও অধীত বিদ্যাকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষার্থী বৃহত্তর জীবনের কর্মযজ্ঞে প্রবেশ করত।
❏ মি এ্যাডাম ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে মিশনারীরূপে ভারতবর্ষে আসেন। কিছুদিন শ্রীরামপুরের মিশনারীদের সঙ্গে কাজ করেন। রামমোহন রায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব সূত্রে আবন্ধ হন। তিনি ১৮১২ খৃষ্টাব্দে একেশ্বরবাদী হয়ে মিশন পরিত্যাগ করেন এবং সাংবাদিকরূপে এদেশের জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশের গ্রাম্য শিক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করার জন্য তিনি ১৮২৯ ও ১৮৩৪ খৃষ্টাব্দে দুবার লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি দু'বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দে তিনি তৃতীয়বার প্রস্তাব করেন এবং সমীক্ষার অনুমতি পান। তখনকার বাংলাদেশ বলতে বোঝাত পূর্ববাংলা, পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার কিছু অংশ। ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তিন বছর বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে এ্যাডাম পর পর তিনটি শিক্ষা বিবরণী দাখিল করেন। ১৮৩৫ খৃঃ তথ্যভিত্তিক দুটি বিবরণ এবং ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দে তথ্য ও সুপারিশ সম্বলিত আর একটি বিবরণ সরকারের কাছে পেশ করেন। তাঁর মোট এই তিনটি বিবরণ ইতিহাসে এ্যাডামের রিপোর্ট (Adam's Report) নামে খ্যাত হয়ে আছে। এই বিবরণীগুলি হল সে যুগের দেশীয় শিক্ষা পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যলিপি।
প্রথম রিপোর্ট:- প্রথম রিপোর্টটি মূলত ছিল সরকারী দলিল, শিক্ষা কমিটির দপ্তরে সংগৃহিত রিপোর্ট। মিশনগুলির কার্যবিবরণী এবং পত্রপত্রিকা থেকে সংগৃহীত তথ্যাদির সারসংক্ষেপ। এই রিপোর্টে এড্যাম দাবি করেন যে তখনকার বাংলাদেশে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ অর্থাৎ প্রতি ৪০০ ব্যাক্তির জন্য একটি প্রাথমিক স্কুল।
valid দ্বিতীয় রিপোর্ট:- দ্বিতীয় রিপোর্টে সন্নিবেশিত হয় রাজসাহী জেলার নাটোর থানার বিস্তৃত তথ্য। এখানে দেখা যায় যে ৪৮৫ টি গ্রামে ছিল ২৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ছাত্র সংখ্যা ছিল ২৬২। তদুপরি ২৩৮ গ্রামের ১৫২৮ টি পারিবারিক বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা ছিল ২৩৪২। সুতরাং পারিবারিক বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভে করত সাধারণ স্কুল থেকে বহুগুন বেশি শিশু । প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল নানা ধরনের যেমন দেশজ প্রাথমিক, অদেশজ প্রাথমিক পারিবারিক, দেশীয় নারী শিক্ষালয়, বয়স্ক বিদ্যালয়, ইংরেজী বিদ্যালয় প্রভৃতি। ভাগ্য মাধ্যমও ছিল নানা ধরনের। বিভিন্ন বিদালয়ে শিক্ষার মাধ্যমরূপে ব্যবহৃত হত ইংরেজী, আরবী, ফরাসী, বাংলা, হিন্দী প্রভৃতি নানা ভাষা। সমীক্ষাধীন অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানরূপে ছিল আবাসিক ও অনাবসিক ৩৯৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৩৮টি টোল। স্ত্রী-শিক্ষার প্রচলন ছিল অতি নগন্য। তথাপি সমীক্ষাধীন অঞ্চলে লিখন- পঠন শক্তি সম্পন্ন শিক্ষিতর হার ছিল আনুমানিক প্রায় প্রায় শতকরা ৬ ভাগ।
তৃতীয় রিপোর্ট:- এ্যাডোমের তৃতীয় রিপোর্টে স্থান পায় মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান, ত্রিভুত এবং দক্ষিণ বিহার- এই পাঁচটি জেলার সমীক্ষা। সমীক্ষাধীন অঞ্চলে পারিবারিক বিদ্যালয় ছাড়া সাধারণের প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ২৫৬৭ টি এবং ছাত্রসংখ্যা ৩০৯১৫। তদুপরি ছিল বহুসংখ্যক পারিবারিক বিদ্যালয়। মোট জনসংখ্যার অনুপাতে বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা ছিল। ৭৩ জনে একজন। এবং মহিলা বাদ দিলে প্রতি ৩৬ জন একজন। স্থান এবং বর্ণভেদে পূর্ণবয়স্ক ব্যাক্তিদের মধ্যে। স্বাক্ষরতার হার ছিল শতকরা ৮ থেকে ১২ ভাগ। কোন কোন উচ্চবর্ণের সকলেই ছিলেন স্বাক্ষর, আবার কোন কোন নিম্নর্ণের সকলেই ছিলেন নিরক্ষর। শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যাক্তিদের এ্যাডাম ছয়টিই ভাগে ভাগ করেন, যেমন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক; অশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী, | প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত পূর্ণবয়স্ক, কেবলমাত্র লিখন পঠনে সক্ষম ব্যাক্তি এবং কেবলমাত্র নিজ নাম পড়তে শিখতে পারেন এমন ব্যাক্তি।
রেভাঃ- এ্যাডামের তৃতীয় রিপোর্টটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কারন ঐ রিপোর্টেই রয়েছে তার বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ। তিনি বলেন যে তদাস্তীন কালে দেশজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল প্রধানত দুই শ্রেণীর প্রথম শ্রেণীভুক্ত ছিল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ - হিন্দুদের টোল এবং মুসলিমদের মাদ্রাসা। পাঠক্রমের বৈশিষ্ঠ্য অনুসারে টোল ও ছিল আবার তিন ধরনের (১) ব্যাকরণ, ছন্দ ও অলঙ্কার প্রধান, (২) কাব্য, ন্যায় ও শাস্ত্র প্রধান এবং (৩) তর্কশাস্ত্র প্রধান। এইসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দেওয়া হত উচ্চতম মানে। পাঠবস্তু এবং বিদ্যালয়ের আবহাওয়া ছিল ধর্ম প্রভাবিত। শিক্ষকরা ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং ছাত্রও অধিকাংশই ব্রাহ্মণ সন্তান। স্বভাবতই উচ্চশিক্ষার দ্বার সকলের কাছে উন্মুক্ত ছিল না। টোলগুলি ছিল নারী বর্জিত। এইসব বিদ্যালয়েই তৈরী হতেন সমাজের পণ্ডিতবর্গ। সুতরাং শিক্ষকরা ছিলেন উচ্চতম শিক্ষার অধিকারী। শিক্ষার ভাষ্য মাধ্যমে ছিল সংস্কৃত।
❏নির্ভীক কণ্ঠে এ্যাডাম বলেন যে, ভারতের উন্নতি করতে হলে ভারতবাসীকে সাথে নিতে হবে। ভারতবাসীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে সঙ্গী করা যাবেনা। নিজেদের উন্নতির জন্য ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ভারত তথা ভারতের প্রতিষ্ঠান সমূহের সাথে একাত্ম না হলে ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ করা যাবে না।
❏তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন যে, ইংল্যান্ডে যেমন পুরনো স্কুলগুলি জাতীয়শিক্ষার অংশ হয়েছে, ভারতেও তেমনইপ্রাচীন এতিহ্যের বাহক এইসব স্কুলকেই ভবিষ্যৎ জাতীয় শিক্ষার সৌধভিত্তিরূপে গ্রহণ করতে হবে। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলি, জনসাধারণের নিকট সুপরিচিত এবং জনপ্রিয় এই শিক্ষাব্যবস্থার বদলে বহিরাগত কোন ব্যবস্থা জনজীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে পারবে না। তাই রেভাঃ এ্যাডাম সংশোধন ও পরিবর্ধন করে দেশজ ব্যবস্থাকেই গ্রহণ করতে বলেন। তিনি সংস্কারের জন্য এক কর্মসুচীও পেশ করেন। আরও ব্যাপক অনুসন্ধানের জন্য কর্মচারী নিয়োগের কথা তিনি বলেন। ভারতীয় ও ইউরোপীয় যৌথ প্রচেষ্টায় বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় এবং বিভিন্ন মানের পাঠপুস্তক রচনা এবং বিতরণ, গৃহ ও আসবাবপত্রের উন্নয়ন, শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধি চাকরি কালের মধ্যে তাঁদের শিক্ষক শিক্ষণ, শিক্ষতায় আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে ভূমি দান, পরীক্ষায় ছাত্রদের ফলাফল সন্তোষজনক হলে অন্যান্য রকম পরিতোষিক এবং এইসব ব্যবস্থা গ্রহণ করবার জন্য জেলা শিক্ষা পরিদর্শক নিয়োগের সুপারিশ ও রেভাঃ এ্যাডাম করেছিলেন। কিন্তু তিনি কেবল অরণ্যে রোদনই করলেন। বস্তুত তাঁর তৃতীয় রিপোর্ট পেশ করার আগেই লর্ড বেন্টিঙ্ক তাঁর রায় দিয়ে। রেখেছেন। ফলে এড্যামের রিপোর্ট হয়ে রইল সরকারী দপ্তরখানায় ইতিহাসের দলিল এবং উত্তরকালে ভারতবাসীর যুগপৎ গৌরব ও বেদনার উৎস।
3.- উপনিষদীয় শিক্ষার মূল বৈশিষ্ট্য গুলি লিখুন। উপনিষদীয় শিক্ষাপ্রণালী, পাঠক্রম এবং শিখন পদ্ধতি আলাদা হয় ব্যাখ্যা করুন। 8+4+3+3
Ans:- উপনিষদ’ কথাটির ব্যুৎপত্তি গত অর্থ হল ‘কাছে এসে উপবেশন করা। রীতি এই ছিল যে শিষ্য গুরুর অতি নিকটে বসে পরম গোপনীয় জ্ঞান ও তত্ত্বকথা শুনবে। সেই জ্ঞান অবশ্যই পরম ব্রহ্মকে জানা ও তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি সম্পর্কিত; তবেই সে মোক্ষলাভের পথ খুঁজে পাবে। মহা পণ্ডিত সোপেনহাওয়ার বলেন, “In the whole world there is no study so beneficial and so elevating as that of the Upanishads. It has been the solace of my life, it will be the solace of my death, গুরুত্বের বিচারে বেদের পরেই উপনিষদের স্থান। মুনি-ঋষিদের রচনা এই উপনিষদের মূলমন্ত্র হল “সত্যং জ্ঞানমনস্তং ব্রহ্মা-অর্থাৎ শিক্ষার মাধ্যমেই পরম জ্ঞানের উপলব্ধি সম্ভব।
❏উপনিষদের মূল উপজীব্য বিষয় হল বস্তু জগৎ, আত্মা ও পরম ব্রহ্ম এবং তাদের আন্তঃসম্পর্ক। বিশ্বজগতের সৃষ্টি কেন’ এবং ‘কীভাবে’ এই মৌলিক জিজ্ঞাসার উত্তরখোঁজার তাগিদেই উপনিষদ রচিত হয়েছিল।
❏তাই উপনিষদীয় দর্শন অনুসারে শিক্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি উল্লেখ করা হল:-
1.সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্য:- এর অর্থ হল সেই জ্ঞান অর্জন যা একজনকে পার্থিব আনন্দ ভুলে যেতে এবং ব্রহ্মাকে (ঈশ্বর) বুঝতে সাহায্য করতে পারে, অন্য কথায়, অমরত্ব লাভ করতে পারে। এই ধরনের জ্ঞান অন্য সব কিছুর উর্ধ্বে বিবেচিত হত। এটা ছিল গুণ, অসৎ, কারণ ও প্রভাব এবং অতীত ও বর্তমান থেকে তিন্ন।
2.শারীরিক বিকাশের লক্ষ্য:- এই লক্ষ্যঅর্জনের জন্য ছাত্রকে গুরুকুলে কঠোর জীবনযাপন করতে হয়েছিল। এই সময়কাল ছিল জীবনের প্রথম আদেশ (পৃথিম আশ্রম), অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য (ব্রহ্মচর্যের জীবন)। একজন সুস্থ ছাত্র একাই এই ধরনের জীবন যাপন করতে পারে।
❏তাই শারীরিক বিকাশের উপর জোর দেওয়ার জন্য ছাত্রকে গুরুকুলে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতে হত। সুস্থ দেহের বিকাশের জন্য তাকে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় প্রাণায়াম করতে হতো।
3.চরিত্র বিকাশের লক্ষ্য:- চারিত্রিক বিকাশের জন্য ইচ্ছাশক্তির প্রশিক্ষণ অপরিহার্য বলে মনে করা হতো। তাই তাকে নৈতিকতার বিভিন্ন নিয়ম পালন করতে হয়। তাকে প্রতিদিন বেদ ও অন্যান্য সম্পূরক গ্রন্থ অধ্যয়ন করতে হতো। উপনিষদ একজন ছাত্রকে তার চরিত্রের বিকাশ ঘটাতে চাইলে খারাপ আচরণ থেকে দূরে থাকতে সতর্ক করে।
4.সম্পূর্ণ উন্নয়ন লক্ষ্য:- সম্পূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যছিল ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্তর্মুখিতা অনুশীলন করা। এটি সম্পূর্ণ জীবনযাপনের আদর্শ পদ্ধতি হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল যার অর্থ সর্বতরফা উন্নয়ন। গুরুকুলে প্রতিদিন সম্পাদিত বিভিন্ন দায়িত্ব সর্বাত্মক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের দিকে নিয়ে যেতে হয়েছিল।
5.আধ্যাত্মিক বিকাশের লক্ষ্য:- যজ্ঞের কর্মক্ষমতা অন্য সব কিছুর উপরে বিবেচিত হত। বিভিন্ন উপনিষদে আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
6.সংস্কৃতির জন্য শিক্ষা:-- উপনিষদিক দিনের আতিথেয়তা একটি বাধ্যতামূলক সামাজিক বাধ্যবাধকতা হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল এবং এটি একটি ধর্মীয় কর্তব্যের অবস্থানে উন্নীত হয়েছিল। পথচারী বা অতিথিকে খাবার দেওয়াকে কুরবানীর সমতুল্য মনে করা হত।
❏শিক্ষার পদ্ধতি (Method of Education) শিক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে শংকরাচার্য বিভিন্ন বিদ্ধির কথা বলেন। যেমন শ্রবণ বিধি, মনন বিদ্ধি, নিদিধ্যাসন বিদ্ধি, প্রশ্ন-উত্তরবিদ্ধি, তর্ক বিদ্ধি, দৃষ্টাত্ত বিদ্ধি, উপদেশ বিদ্ধি, ইত্যাদি।
❏এইসব পদ্ধতি অবলম্বনে পরিশেষে বিদ্যার্থীর শিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হবে। সে পরমজ্ঞান লাভ করবে এবং পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটবে। প্রবণ, মনন ও বিদিধ্যাসন ব্রহ্মজ্ঞান লাভের তিনটি উপায়। প্রশ্ন থেকেই শ্রুতির উৎপত্তি। শ্রুতি প্রদীপের মতো সর্বভাসক। প্রতি ছাড়া অন্য কোনো কিছু থেকেই জীন ও ব্রহ্মের ঐকাজান লঙ হতে পারে না। ‘তত্ত্বমসি’, অহং রত্নান্সি প্রভৃতি প্রতি মাড়া অন্য কোনো প্রমাণেই জানা যায় না। প্রতি স্বতঃপ্রমাণ। শ্রুতি প্রামাণ্য, কিন্তু শকের বিচারবুদ্ধিকে উপেক্ষা করেননি। প্রর্ণতলব্ধ আনের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করার জন্য যুক্তি তর্কের প্রয়োজন আছে। কিন্তু শুতির কথায় বিশ্বাস না থাকলে নিছক যুক্তি তর্কের দ্বারা আত্মোপলব্ধি সম্ভব নয়। যে তর্ক প্রতির অনুগামী, সেই তর্কই গ্রহণযোগ্য। সুতরাং বেদান্ত মতে, যুক্তি তর্কের ভরা অত্মোপলব্ধি (Self-realization) শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
❏Valid সর্বশেষে, অঙ্ক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি এবং গার্হস্থ্য আশ্রমজীবন শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উপসংহার, আধুনিক কালে বেদান্ত শিক্ষা শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, ভোগসর্বস্ব জীবনের হাহাকার থেকে মানুষকে মুক্তির মন্ত্র শোনায় বেদান্তের ‘আত্মোপলব্ধির উদাত্ত বাণী।
❏পাঠক্রম (Curriculum):- অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনে গুরুকুল আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত। বেদ এবং উপনিষদ পাঠ পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া ব্যাবহারিক কলাবিদ্যা পাঠের বিধানও দেওয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য আত্মজ্ঞান বা মোক্ষ যেহেতু শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য, সেহেতু বেদ-উপনিষদ পাঠ পাঠক্রমে মুখ্য স্থান অধিকার করেছে।
❏সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি (Co-curricular activities):-অদ্বৈত বেদান্ত পাঠক্রমে নানান সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যথা সৎসঙ্গ, তীর্থভ্রমণ, উপবাস পালন এবং যোগকে কারিকুলামে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
❏আধুনিক শিক্ষা চিন্তায় বৈদান্তিক ধ্যানধারণার প্রভাব যে বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করে, তা হল সমগ্র মানবসমাজের স্বার্থে এবং সকল মানুষের উন্নতিকল্পে মানুষকে একই সঙ্গে বিজ্ঞানমনস্ক ও আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন হতে হবে। অন্যথায়, মানবজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে।
4.– জাতীয় শিক্ষানীতির (১৯৮৬) মূল বৈশিষ্ট্য গুলি লিখুন। জাতীয় শিক্ষানীতির মূল বৈশিষ্ট্য গুলি লিখুন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করুন। 10+8
Ans:- 1968 সালে ভারতবর্ষে যে শিক্ষানীতি রচিত হয়েছিল নানা কারণে তার সবগুলি বাস্তবায়িত হয়নি। অভাবনীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রাম- শহর বৈষম্য, মূল্যবোধের অবক্ষয় জাতীয় শিক্ষানীতির রূপায়ণের প্রধান অন্তরায়। ফলে নতুন করে জাতীয় শিক্ষানীতি গঠনের প্রয়োজন অনুভূত হয়। 1985 সালের জানুয়ারী মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের শিক্ষার চিত্র ও ভবিষ্যৎ রূপের আভাষ দিয়ে Challenge of EduA Policy Perspective নামে একটি খসড়া শিক্ষানীতি দেশব্যাপী আলোচনা ও বিতর্কের জন্য প্রকাশিত হয়। কেন্দ্রীয় শিক্ষা উপদেষ্টা পর্ষদ এই খসড়া অনুমোদন করার পর 1986 সালের মে মাসে বিলটি সংসদের উভয় সভায় অনুমোদিত cation হয়।
❏ভারত সরকারের ঘোষিত এই শিক্ষানীতি বারটি অংশে বিভক্ত। প্রথমে মুখবন্ধ ও শেষ অধ্যায়ে ভবিষ্যৎ। বাকী দশটি অধ্যায়ে দেশের শিক্ষার গতি প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা ও সুপারিশ নিয়ে গঠিত। অনেক উপধারায় সজ্জিত এই শিক্ষা দলিলে বিস্তৃত অলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে মূল বিষয়বস্তুকে সংক্ষেপিত করে উল্লেখযোগ্য দিকগুলি আলোচনা করা হল।
A)জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা:- ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভারতবর্ষের প্রতিটি নরনারী শিক্ষার সুযোগ পাবে। বিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থা তিন ভাগে বিভক্ত হবে: প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নিম্ন প্রাথমিক শিক্ষা, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষা এবং নবম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষা। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনে পরিবর্তনযোগ্য পাঠক্রম থাকবে। পাঠক্রমের মধ্যে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, সাংবিধানিক কর্তব্য, জাতীয় ভাবধারার বিকাশ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, গণতন্ত্র, পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী পুরুষের সমান অধিকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের সহায়ক বিষয় থাকবে। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় গতানুগতীক শিক্ষণ কৌশলগুলির সঙ্গে জীবন ব্যাপী শিক্ষার জন্য প্রথা বহির্ভূত শিক্ষা ও পত্রযোগে শিক্ষা ইত্যাদি কৌশল ব্যবহৃত হবে।
B) সাম্যের জন্য শিক্ষা:- শিক্ষায় অসাম্য দূর করতে হবে। এতদিন যারা বঞ্চিত হয়ে এসেছেন তাদের সবাইকে যোগ্যতা অনুযায়ী সমান সুযোগ সুবিধা প্রধান করতে হবে। নারীদের প্রতি বৈষম্য, নিরক্ষরতা, প্রাধমিক শিক্ষালাভের বাধা প্রকৃতি অসাম্য দূরীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
C) প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা :-প্রত্যেক শিশুর সামগ্রিক বিকাশে সহায়তা করা শিশু সংক্রান্ত জাতীয় নীতির লক্ষ্যবলে কমিশন অভিমত ব্যক্ত করে। এই উদ্দেশ্যে Early Childhood Care and Education (ECCE) কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচী রূপায়নে কমিশন সুপারিশ করে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা হবে শিশু কল্যাণেরই অঙ্গ।
D) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষা:- এই সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপনের বিশেষ নীতি গ্রহণ করতে হবে। মূল জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যরেখে বিশেষ পাঠক্রম রচনা করতে হবে।
❏তফশিলী জাতি ও উপজাতির শিক্ষা গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের 14 বছর বয়স পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত করা হবে। চর্মকার, হরিজন পরিবারের ছেলেমেয়েদের প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বৃত্তি দেওয়া হবে। তফশিলী ছাত্রছাত্রীদের জন্য জেলা সদরে ছাত্রাবাস নির্মাণ, আদিবাসী অঞ্চলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, বৃত্তি শিক্ষার ব্যবস্থা, নিজস্ব সংস্কৃতির রক্ষণ প্রভৃতিকে বাস্তবায়িত করা
❏Valid. প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা: প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষার ব্যবস্থা, ছাত্রাবাস তৈরি, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণে: উৎসাহিত করা প্রভৃতি কল্যাণকর কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। জেলাস্তরে একটি করে বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
বয়স্ক শিক্ষা:- 14 থেকে 34 বছর বয়স্কদের নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা আশু কর্তব্য। এজন্য গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন, পুস্তক প্রকাশনা, রেডিও, দূরদর্শন ও সিনেমার মত গণমাধ্যমের ব্যবহার প্রভৃতির সুপারিশ করা হয়।) প্রাথমিক শিক্ষা 14 বছর পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে ভর্তি এবং পাঠ সমাপ্তিকরণে, এবং পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের অনুন্নয়ন ব্যবস্থা বাতিল এই দুটি বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ জন্য প্রতি বিদ্যালয়ে দুটি শ্রেণি কক্ষ, দুজন শিক্ষক (একজন পুরুষ ও একজন নারী), বোর্ড, চার্ট, মানচিত্র, শিক্ষার অন্যান্য সরঞ্জাম, খেলাধূলার সামগ্রী এসবের ব্যবস্থাপনার সুপারিশ করা হয়। এই কর্মসূচীর বাস্তব রূপায়নের পরবর্তী প্রচেষ্টা Operation Black Board নামে পরিচিত।
মাধ্যমিক শিক্ষা:- এই স্তরে অতি বিবেচনা করে পাঠক্রম রচনা করতে হবে যেন বিজ্ঞান, মানবীয় বিষয়, সমাজবিজ্ঞান, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক চেতনা বৃদ্ধির সহায়ক বিষয় পাঠক্রমে সংযোজিত হয়। এই শিক্ষান্তরে বৃত্তিমুখী পাঠক্রম চালু করে মানবসম্পদ উন্নয়নের চাহিদা পরণের চেষ্টা করা হবে।
❏বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করুন:- স্বাধীনতার পরে ভারত সরকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য বহু কমিশন (রাধাকৃষ্ণন কমিশন, মুদালিয়ার কমিশন, কোঠারি কমিশন) ও কমিটি (১৯৬৮ খ্রি., ১৯৭৯ খ্রি.-এর শিক্ষা কমিটি) গঠন করেছে। এদের সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক সংস্কারও হয়েছে। যেমন, কোঠারি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুপারিশ। হল- শিক্ষায় সমসুযোগ, জাতীয় সংহতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, মূল্যবোধ ইত্যাদি। এই নীতিগুলির উপর ভিত্তি করেই NPE-1986-তেও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, শিশু শিক্ষা, নারী শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, শিক্ষার মাধ্যম ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
❏আবার নতুন কতগুলো সুপারিশ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড কর্মসূচি (প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য), মাধ্যমিক স্তরের মান উন্নয়নের জন্য নবোদয় বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, চাকরি থেকে ডিগ্রি বিযুক্তিকরণ, স্বশাসিত কলেজ, শিক্ষক, স্কুলের জোট সংগঠন ইত্যাদি। এগুলিকে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করা হলো। যথা-
(১) মডেল স্কুলে অঢেল অর্থধ্যয়:- সমগ্র মাধ্যমিক স্তরকে অবহেলা করে বৈষম্যমুলক মডেল স্কুলের (পরবর্তী নবোদয় বিদ্যালয়) জন্য কেন্দ্রের অঢেল অর্থ ব্যয়।
(২) বহিঃপরীক্ষার মূল্য হাস:- অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের উপর গুরুত্ব দিয়ে বহিঃপরীক্ষার মান হ্রাস।
(৩) ডিগ্রিকে চাকুরি থেকে বিচ্ছিন্নকরণ:- ডিগ্রির সঙ্গে চাকুরির সম্পর্ক ছেদ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন ব্যবস্থার গুরুত্ব হ্রাস।
(৪) স্বায়ত্তশাসন বৈষম্য:- বিশেষ বিশেষ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার নিয়ে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি।
(৫) ভাষাগত বৈষম্য :- হিন্দি ও ইংরেজির উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ভারতীয় অন্যান্য ভাষাকে অবহেলার ইঙ্গিত প্রদান।
(৬) নিরক্ষরতাকে বাঁচিয়ে রাখা:- নিরক্ষরতা সৃষ্টির উৎসমুখ রুদ্ধ না করে নিরক্ষরতা বাঁচিয়ে রাখার ইঙ্গিত প্রদান।
(৭) অবৈতনিক শিক্ষা :-এই শিক্ষানীতির একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হল ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ১১ বছরের ছেলে মেয়েদের, যাদের পাঁচ বছরের শিক্ষাকাল শেষ হয়েছে তাদের এবং ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ১৪ বছরের সব ছেলেমেয়ে আবশ্যিক ও অবৈতনিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। যদিও এটিকে কার্যকরী করার জন্য যে প্রচুর অর্থ প্রয়োজন, সে ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি।
(৮) বৃত্তি শিক্ষা:- NPE-1986-তে বলা হয়েছে, ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫% শিক্ষার্থীদের বৃত্তি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। এই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য প্রতিটি প্রদেশে অনেকগুলি সরকারি ও বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তবে যতটা প্রত্যাশিত ছিল ততটা হয়নি, হলে ততদিনে ৫০% শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে উঠত। for
(৯) খেলাধুলা:- দেহমনের পরিপূর্ণ বিকাশ প্রসঙ্গে আধুনিক খেলাধুলার সঙ্গে দেশজ খেলাধুলার অন্তর্ভুক্তি এবং যোগ শিক্ষা (Yoga Education) উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান নতুন শিক্ষানীতির একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ বলে গণ্য করা যায়। যোগের মৌলিক জ্ঞান ভারতেই উদ্ভূত এটি ভারতীয় ঐতিহ্য। জাতীয় শিক্ষানীতি (১৯৮৬)- তে বলা হয়েছে “Efforts will be made to introduce Yoga in all schools; to this end, it will be introduced in Teacher Training courses.” সুতরাং, আগামী নাগরিকদের জন্য এটি একটি সুনির্দিষ্ট ও অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ।
(১০) বিদ্যালয়গুচ্ছ:- শিক্ষার মানউন্নয়নের উল্লেখযোগ্য উপায় হিসেবে বিদ্যালয় গুচ্ছ এর কার্যকারিতা স্বীকৃত। বিদ্যালয় গুচ্ছ বা School Complex বিষয়ক ধারণা শিক্ষা কমিশন (১৯৬৪-৬৬ খ্রি.) প্রতিবেদনে প্রথম গুরুত্ব দিয়ে সুপারিশ করা হয়। দু-একটি রাজ্যে বিষয়টিকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। তাই ১৯৮৬-এর জাতীয় শিক্ষানীতিতে বিদ্যালয় গুচ্ছের উপর গুরুত্ব দিয়ে দেশব্যাপী তার সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।
(১১) কেন্দ্রীয় পাঠক্রম:- এই শিক্ষানীতিতে সারা দেশের জন্য একটি সাধারণ কেন্দ্রীয় পাঠক্রম রচনা করার কথা বলা হয়েছিল, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে শিক্ষায় সমতা আসবে। শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১০+২+৩ কাঠামো বজায় রাখার কথা বলা হয়েছিল, যা এখনও বর্তমান।
(১২) অপারেশন ব্লাকবোর্ড ও পথনির্দেশক বিদ্যালয় :- প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য ‘অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড” কর্মসূচি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচি। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘পথনির্দেশক বিদ্যালয় বা ‘নবোদয় বিদ্যালয়’ কর্মসূচি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। প্রধানত মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য এই কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
❏তবে সব কিছু ভালোর মধ্যেও কিছু ত্রুটি আছে। যেমন Dropout শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। কলেজ পরিচালনার ব্যাপারে যে সততা ও শৃঙ্খলার প্রয়োজন, তার অভাব রয়েছে। নবোদয় বিদ্যালয় গুলো ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে উঠেছে। তাই অনেকে এটিকে গোড়াকাটা বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন। NPE-1986-এর ভালো দিকগুলি আলোচনা করলে দেখা যায়, এই শিক্ষানীতি ভারতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার নির্ভরযোগ্য দলিল।
5. ফ্রয়বেল একটি শিক্ষাগত পরীক্ষা করেছিলেন, যা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করেছিল- বাক্যটি যথার্থতা বিচার করো। 12
উত্তর- ফ্রয়েবেল শিক্ষাক্ষেত্রে যে নতুন ধারণার কথা বলেন তা কিন্ডারগার্টেন নামে পরিচিত। কিন্ডারগার্টেন একটি জার্মান শব্দ, যার অর্থ হল শিশু উদ্যান (children’s garden) জিনি বিশ্বাস করতেন যে বিদ্যালয় হল একটি উদ্যান, শিক্ষক হলেন মালি, আর শিক্ষার্থীরা হল চারাগাছ। বাগানের মালিং নায়ে শিক্ষক ও চারাগাছের ন্যায় শিক্ষার্থীদের বড় হয়ে ওঠার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করেন।
❏শিক্ষা হল সুন্দর পবিত্র জীবনের উপলব্ধি। তাই মহান এই দার্শনিক তার শিক্ষাদর্শনের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার্থীকে সুন্দর এবং পবিত্র করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তাঁর শিক্ষাদর্শন আজও প্রাসঙ্গিক ও কার্যকারী। জার্মানির একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে শিশুশিক্ষা নিয়ে গবেষণা করে তিনি এমন একটি শিক্ষাপদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন যার জনপ্রিয়তা আজও বিশ্বজনীন। তাঁর এই শিক্ষাপদ্ধতি বিশ্বব্যাপী সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। শিক্ষায় তাঁর অবদান নানাবিধ। শিক্ষাক্ষেত্রে ফ্রয়েবেলের অবদান নিয়ে আলোচনা করা হল-
(1)শিশুশিক্ষার ওপর গুরুত্ব প্রদান (Giving importance on childeducation):- শিক্ষাক্ষেত্রে ফ্রয়েবেল-এর অবদান আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপদ্ধতির কথা। শৈশবকালীন শিক্ষার গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তার কথা তিনিই সর্বপ্রথম গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন। সেইজন্যই তাঁর সৃষ্ট কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয় ( Kindergarten School) আজ সর্বত্র বিরাজমান। এই বিদ্যালয় পৃথিবীর সব দেশে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি শিক্ষাকে বিজ্ঞানসম্মত করে তুলেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর গুরুত্ব সম্পর্কে প্রথম আলোকপাত করে রুশো (Rousseau), কিন্তু রুশোর চিন্তাধারাকে দার্শনিক তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করেন ফ্রয়েবেল।
(ii) সক্রিয়তার প্রতি গুরুত্ব প্রদান (Giving importance an activity):- ফ্রয়েবেল শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুদের সক্রিয়তার ওপর গুরুত্ব প্রদান করেন। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি শিক্ষাব্যবস্থাতেই শিশুসক্রিয়তাকে গুরুত্ব সহকারে বিচার-বিবেচনা করা হয়। পেস্তালজি (Pesstalozzi) যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে আত্মসক্রিয়তার কথা বলেছেন ঠিক তেমনই ফ্রয়েবেল (Froebel) ও শিক্ষাক্ষেত্রে শিশু সক্রিয়তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিচার-বিবেচনা করেছেন এবং তাঁর এই চিন্তাভাবনা পরবর্তী শিক্ষাপদ্ধতিকে আরও উন্নত করে তুলেছে।
(iii) স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত শিক্ষা (Natural and sponteneous education):- ফ্রয়েবেল শিশুশিক্ষাকে স্বাভাবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত করতে চেয়েছেন। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন কৃত্রিমতাকে বর্জন করতে চেয়েছেন। তাই শিক্ষাপদ্ধতিতে খেলা, মাটি, হাতের কাজ, গল্প বলা প্রভৃতির মাধ্যমে বাস্তবিক অভিজ্ঞতা দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে বিদ্যালয় হয়ে ওঠে আকর্ষণীয় যেখানে শিশু সুন্দরভাবে তার শিক্ষা অর্জন করতে পারেন।
(i)খেলাভিত্তিক শিক্ষা (Playway method):- ফ্রয়েবেল-এর শিক্ষাক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল খেলাভিত্তিক শিক্ষা। খেলার মাধ্যমে তিনি শিশুর জন্য স্বাভাবিক এবং সহজাত শিক্ষাপদ্ধতি প্রয়োগ করেন। শিশুশিক্ষায় খেলার গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করেন এবং খেলার মাধ্যমে কার্যকারীভাবে শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা তিনি করেন।
(iv) মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি (Psychological bases):- ফ্রয়েবেল-এর শিক্ষাতত্ত্ব মনস্তত্ত্ব নির্ভর। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর আবেগ এবং প্রবণতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আবেগ এবং প্রবণতাকে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা দিয়েছেন।
(v) ইন্দ্রিয় পরিমার্জন (Teaching of sense organ):- ফ্রয়েবেল-এর আর-একটি বিশেষ অবদান হল ইন্দ্রিয় পরিমার্জনের ধারণা। তিনি শিক্ষার্থীদের ইন্দ্রিয় পরিমার্জনের জন্য বিভিন্ন প্রকার উপহার এবং বৃত্তির আয়োজন করেছিলেন। তিনি মনে করতেন ইন্দ্রিয় এ পরিমার্জিত হলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অনেক কার্যকারীভাবে অর্জন করতে সক্ষম হবে।
(vi) সামাজিকতার গুরুত্ব বৃদ্ধি (Increasing importance of socialisation):- ফ্রয়েবেল শিক্ষার্থীদের জন্য নানা প্রকার যৌথ এবং দলগত কর্মের আয়োজন করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা এবং সহমর্মিতাবোধ গড়ে ওঠে। ফলস্বরূপ তারা ভবিষ্যতের উপযোগী নাগরিক হিসেবে পরিপূর্ণতা পায়।
সুতরাং, শিক্ষাক্ষেত্রে ফ্রয়েবেল-এর অবদান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাকে আধুনিক রূপ দিতে তাঁর শিক্ষাদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।
6.-জন ডিউই শিক্ষা দর্শনের শিক্ষার লক্ষ্য, শিক্ষাগত পরীক্ষা, শিক্ষা পদ্ধতি ব্যাখ্যা করো,
ভূমিকা:- জন ডিউই এর শিক্ষা চিন্তার মধ্য যুগে সর্বোচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশের গ্রহণ করেছে। তাঁর শিক্ষাদর্শন একদিকে যেমন সামাজিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যরাজ্যের প্রতিনিধিত্বকারী যন্ত্রাংশের বিকাশের সঙ্গে সমতা তা সংগঠিত। তাঁর শিক্ষা দর্শনের মধ্যে এই দুই উপাদানের সার্থক ব্যাখ্যা আমরা দেখতে পাই। তিনি যে শুধু শিক্ষার তাত্ত্বিকের দিকে আলোকপাত করেছেন তাই পরীক্ষামূলকভাবে তাঁর শিক্ষাকে চিন্তা করার চেষ্টা করার চেষ্টা করুন। ১৯০১ সালে তিনি তাঁর গবেষণামূলক বিদ্যালয় স্থাপন করে, সেখানে তাঁর শিক্ষামূলক চিন্তা-ভাবনাকে নয়, প্রয়োগ করেন।
শিক্ষার লক্ষ্য(Aim of education):- জন ডিউই কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার লক্ষ্যের কথা বলেননি। তাঁর মতে, শিক্ষার কাজ হল শিক্ষার্থীর মধ্যে সেই সমস্ত গুণাবলি ও সামর্থ্যের বিকাশ ঘটানো যা পরিবেশের সঙ্গে সংগতি বিধানে সহায়তা করবে এবং তাকে সমাজের একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। যেহেতু শিক্ষার্থীর জীবন-পরিবেশ সদা পরিবর্তনশীল, তাই পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি ও সমাজের চাহিদা বদলে যায়। ফলে শিক্ষা ও শিক্ষার লক্ষ্যও বদলে যায়। তাই পরিবর্তনশীল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার লক্ষ্যকে নতুন করে স্থির করতে হবে। ডিউই তাঁর ‘Democracy and Education’ গ্রন্থে বলেন যে, শিক্ষা ছাড়া শিক্ষার কোনো লক্ষানেই। শিক্ষা প্রক্রিয়া নিরন্তর অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে চলেছে। তাই বিকাশের লক্ষ্যযেমন আরও বিকাশ, শিক্ষার লক্ষ্যআরও শিক্ষা। যেহেতু শিক্ষার কাজ শিক্ষার্থীকে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে সংগতিবিধানে সহায়তা করা, তাই ডিউই-এর মতে শিক্ষার লক্ষ্যহবে বহুবিধ। ডিউই-এর মতে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কিংবা অন্য যে- কোনো পরিবর্তন হোক না কেন শিক্ষার প্রধান তিনটি উদ্দেশ্য আছে। যেটা সব ক্ষেত্রেই প্রায় অপরিবর্তিত থেকে যায়। শিক্ষার তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য হল সহজাত ব্যক্তিত্বের বিকাশ, ব্যক্তিগতভাবে মানসিক উৎকর্ষতালাভ ও সামাজিক দক্ষতা (Social efficiency) লাভ। শিক্ষা হল সামাজিক অগ্রগতি ও সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। ধরনের
❏ ডিউই-র প্রস্তাবিত শিক্ষাদান পদ্ধতি (Method of teaching proposed by Dewey): পাঠ্যক্রমে সঙ্গে শিক্ষাদান পদ্ধতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ডিউই-র প্রস্তাবিত পাঠনের পরিবর্তে শিশুকে সক্রিয়তার মাধ্যমে বা কাজের মাধ্যমে শেখাতে হবে। তিনি শিক্ষাদান পদ্ধতি হিসাবে বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাও বলেন। শিশুর পাঠ্যক্রমে এমন সব অভিজ্ঞতা থাকবে যেগুলি সঙ্গে শিশুর জীবনের বাস্তব যোগাযোগ আছে। অর্থাৎ এককথায় শিশু তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যেসব অভিজ্ঞতা আহরণ করে বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতাও সেগুলির সঙ্গে নিবিড়ভাবে গ্রন্থিবদ্ধ হবে। for
(i) সমস্যা সৃষ্টি:- এই স্তরে পরিস্থিতিকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীকে তার প্রবণতা অনুযায়ী দিতে হবে। কাজ করতে গিয়ে সে যখন বাধার সম্মুখীন হবে তখনই তার সমস্যা সৃষ্টি হবে। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতির মূল নীতি হল সমস্যার সমাধান মূলক পরীক্ষণ প্রক্রিয়া, জানা, অনুভব করা ও কাজ-এই তিনটি প্রধান প্রক্রিয়ার সমন্বয়ন এই পদ্ধতির মূল নির্যাস। ডিউই-র মতে সমস্যার সমাধানমূলক পদ্ধতি পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকে। যথা:
(ii)সম্ভাব্য সমাধান করার জন্য বিভিন্ন ধরনের কৌশল নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে কাজ।
সমাধান অনুমান: এই স্তরে শিক্ষার্থী সমস্যার সম্মুখীন হলে তার শুরু করে। অর্থাৎ সমস্যা সমাধানের জন্য কতকগুলি প্রকল্পগঠন এই স্তরের ।
(iii) তথ্য সংগ্রহঃ- ডিউই প্রস্তাবিত সমস্যা সমাধান মূলক পদ্ধতির তৃতীয় জরে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহে উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোন বিশেষ সমস্যা সমাধানের জন্য এই স্তরে যে সব তথ্যের প্রয়োজন তা সমাজ পরিবেশের মধ্য থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
(iv) কর্ম সম্পাদনঃ- এই স্তবে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী সমস্যার প্রকৃত সমাধান করবে।
(v) পরীক্ষণঃ- সর্বশেষ করে শিক্ষার্থী যে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করল তা নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে তার যথার্থতা বিচার করবে। তবেই তার জ্ঞান সম্পূর্ণ হবে।
শিক্ষাগত পরীক্ষা:- ডিউই ১৮৯৬ সালে শিকাগো শহরে একটি পরীক্ষামূলক বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যা Experiment School বা ল্যাবরেটরী স্কুল নামে পরিচিত। এখানে তিনি তাঁর শিক্ষাচিন্তাকে বাস্তবে রূপদেবার চেষ্টা করেন। এই স্কুলে নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম যেমন ছিল না তেমনি কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তকও ছিল না। এখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হত না। এখানে শিক্ষাদানের উপকরণ হিসাবে থাকত কাঠের কাজের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সেলাই ও রান্নার সরঞ্জাম ইত্যাদি। কাজের মাধ্যমে শিক্ষা ছিল এই ধরনের বিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য।
❏ডিউই বিদ্যালয় সম্পর্কে বলেছেন যে বিদ্যালয় হবে সরল বিশুদ্ধ, সমন্বয়িত সমাজ অর্থাৎ Purified, simplified, better balanced society। তাঁর মতে বিদ্যালয় জীবনের প্রস্তুতি জন্য নয়, এটি হবে প্রকৃত জীবন। গৃহে যে সব কাজের সঙ্গে শিশু পরিচিত সেই সব কাজ যথার্থভাবে পরিচালনার মাধ্যমে সে আর একটু ভালোভাবে, আর একটু দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যালয়ে সেগুলি করতে শিখবে। তাঁর মতে শিশুর সামাজিক আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, সংস্কৃতি সব কিছুর সংরক্ষণ ও সঞ্চালন বিদ্যালয়ের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে সংগঠিত হবে।
7.-একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে বিবেকানন্দের মূল্যায়ন করুন।
ভূমিকা (Introduction):- ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর মহান শিক্ষাবিদদের মধ্যে অন্যতম হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি ছিলেন সমাজসংস্কারক, ধর্মনেতা, দেশপ্রেমিক ও শিক্ষাপ্রণেতা। রুশ মনীষী লিও টলস্টয়-এর মতে, ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ হলেন বিবেকানন্দ। সক্রেটিস, রুশো, কান্ট প্রমুখ বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের পাশাপাশি বিবেকানন্দের নাম উল্লেখ্য।
শিক্ষাদর্শন (Educational philosophy):- বিবেকানন্দ ছিলেন ভাববাদী দার্শনিক। তিনি বৈদান্তিক দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে, ব্রহ্ম ও ঈশ্বর হলেন সর্বশক্তির মূল আধার এবং প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ব্রহ্মের শক্তি বর্তমান। তিনি মনে করেন নিজেকে জানতে পারলে জগতের সবকিছু জানা হয়। অর্থাৎ শিক্ষার কাজ হবে আত্মো- পলব্ধি তথা ব্রহ্ম উপলব্ধিতে সহায়তা করা। ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হল ধর্ম ও আত্মা ধ্যাত্মিকতা। তাই তিনি তাঁর শিক্ষাচিন্তায় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের সঙ্গে ভারতের বেদান্তের মিল ঘটাতে পেরেছিলেন। তিনি শিক্ষায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সমাজতান্ত্রিক মতবাদের সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছেন। তিনি পরা ও অপরা উভয় বিদ্যার ওপর জোর দিয়েছেন।
শিক্ষার ধারণা (Concept of education):- জীবনের লক্ষ্যহল পূর্ণতালাভ। প্রতিটি মানুষের মধ্যে রয়েছে পূর্ণতালাভের সম্ভাবনা। বিবেকানন্দের মতে, শিক্ষা হল এই পূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ। তাই তিনি বলেছেন, “Education is the manifestation of the perfection already in man.” বিবেকানন্দের মতে, শিক্ষার কাজ হবে কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ ও বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়া শিশুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকাশের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা। তিনি আরও বলেছেন যে বিশ্বের সমস্ত জ্ঞান মানুষের মনে বা অন্তরে সুপ্ত অবস্থায় আছে। শিক্ষার কাজ হবে আত্মোপলব্ধির মধ্যে দিয়ে এই জ্ঞান সংগ্রহ করা।
❏ শিক্ষার লক্ষ্য (Aim of education):- বিবেকানন্দের মতে, শিক্ষার লক্ষ্যঅনেকগুলি তথ্য পরিবেশন করা নয়। ব্যক্তির অন্তর্নিহিত শক্তিকে সামাজিক পথে পরিচালিত করাই হল শিক্ষার লক্ষ্য। তিনি মন্তব্য করেন যে মানুষ তৈরি করা, চরিত্র গঠন করা এবং বিভিন্ন ভাবকে যথাযথ পরিপাক করাই হল শিক্ষার উদ্দেশ্য। তিনি আরও বলেছেন শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে শিক্ষার্থীকে আত্মনির্ভর করে তোলা যাতে যে জীবন সংগ্রামে সফল হতে পারে। তাঁর মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে। শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, স্বকীয়তা উৎকর্ষতার বিকালে ও আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করা ।
তিনি ছাত্রদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, আত্মোপদনিম্ন শিক্ষার প্রকৃত সক্ষা। এই আত্মোপলব্ধি ঘটলে মানুষের চারিত্রিক গুণাবলির যথাযথ বিকাশ হয়। আত্মবিশ্বাস বাড়ে ও মানুষ মনুষ্যত্বের অধিকারী হয়। শিক্ষার লক্ষ্যের ব্যাপারে তিনি সার্বিক বিকাশের ওপর জোর দিয়েছেন।
❏পাঠক্রম (Cumculum):- বিবেকানন্দের মতে, শিক্ষার কাজ হল চরিত্রগঠন ও ব্যক্তিত্বের সুষম বিকাশ (Character formation and integrated personality development)। শিক্ষার এই লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি রেখে তিনি পাঠক্রমে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী। ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় হিসেবে আধুনিক বিজ্ঞান, ইতিযাস, ভূগোল, দর্শন, সাহিত্য পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। তিনি শিক্ষায় মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেছেন যেহেতু ভারতীয় চিন্তাধারার মূল অংশ সংস্কৃত ভাষায় রচিত, তাই ওই ভাষাকেও পাঠক্রমে রাখতে হবে। কর্মশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা বাস্তব জীবন প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে দিতে হবে। মেয়েদের তিনি ধর্ম, শিক্ষা, বিজ্ঞান, গার্হস্থ্যবিজ্ঞান, সেলাই, বান্না ও স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা দিতে বলেছেন। তিনি শিশুদের ধ্যান, জপ ইত্যাদি শেখানোর কথাও বলেছেন।
❏গণশিক্ষা (Mass education):- বিবেকানন্দের লক্ষ্যছিল জাতীয় পুনর্জাগরণ এবং এই কারণে গণশিক্ষার প্রসার ঘটানো একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর মতে, জনগণের শিক্ষা ছাড়া প্রত্যাশিত আর্থসামাজিক পরিবর্তন আসতে পারে না। তিনি বলেন যে, দেশের পশ্চাদপদতার মূল কারণ হল দারিদ্রদ্র্য, অশিক্ষা ও অজ্ঞতা। তাই তিনি মন্তব্য করেন, “Education is the sole remedy for improving the condition of the poor of the country.”
❏বিবেকানন্দ লোকশিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং লোকশিক্ষার মাধ্যমে হিসেবে যাত্রা, কবিগান, কীর্তন প্রভৃতির পুনরুজ্জীবনের কথা বলেন। তিনি মনে করতেন লোকশিক্ষার জন্য ঘরে ঘরে গীতার পাঠ শুরু করতে হবে। লোকশিক্ষাকে তিনি তাই জাতির সব সমস্যার সমাধান বলে মনে করতেন।
স্বাস্থ্যশিক্ষা (Health education):- প্রকৃত শিক্ষা হল দেহ-মনের সুষম বিকাশ। মনের মূলভিত্তি হল দেহ। একমাত্র সুস্থ দেহে সুস্থ মন থাকতে পারে এবং সুস্থ দেহ, সুস্থ মন, সুষম ব্যক্তিত্ব গড়তে সাহায্য করে। তাই বিবেকানন্দ রোগমুক্ত সুস্থ দেহ গঠনের জন্য খেলাধুলা ও শরীরচর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শরীরম মাধ্যম ধর্ম সাধনম। তাই তিনি গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা শ্রেষ্ঠতর বলে অভিহিত করেছেন।
❏এই কেন্দ্রীকরণের ক্ষমতা যার যত বেশি, তার ধারণ ক্ষমতা তত বেশি। তাই তিনি মনঃসংযোগ বা মনের কেন্দ্রীকরণকে জ্ঞানের প্রকাশদ্বার বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, যোগই একমাত্র মনকে কেন্দ্রীভূত করতে পারে এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত গুণাবলির বিকাশ ঘটে। তাঁর মতে, “There is only method by which to attend knowledge that is called concentration.” তিনি শিক্ষায় সংযম, ব্রহ্মচর্য, শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রভৃতির ওপর জোর দেন। এ ছাড়া তিনি স্বয়ংশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাপদ্ধতির ওপর জোর দেন। 2023
শিক্ষাপদ্ধতি (Method of education):- বিবেকানন্দ শিক্ষায় মনের কেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এর মাধ্যমে মনঃসংযোগ আসে এবং শিক্ষা সহজ হয়।
শিক্ষকের ভূমিকা (Role of teacher):- বিবেকানন্দ শিক্ষায় শিক্ষকের গুরুত্বকে অস্বীকার করেননি। তাঁর মতে, গুরুর সাক্ষাৎ সংস্পর্শ ছাড়া কোনোরূপ শিক্ষা হতে পারে না। তিনি প্রাচীন গুরুকুল ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনের কথা বলেছেন। মানুষের মন হল যাবতীয় জ্ঞানের মূল উৎস। শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত জ্ঞান প্রকাশের জন্য কেবল অনুভাবনের প্রয়োজন। শিক্ষকের কাজ হবে ইতিবাচক অনুভাবন দ্বারা শিক্ষার্থীর জ্ঞানভাণ্ডারের দ্বার উন্মোচন করা। এক্ষেত্রে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সামনে মূর্ত দৃষ্টান্তস্থাপনের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেবেন। শিক্ষক শিক্ষার্থীর ওপর কোনো বিষয় জোর করে চাপিয়ে দেবেন না।
স্ত্রীশিক্ষা (Women education):- বিবেকানন্দ নারীশিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন কারণ মেয়েরা শিক্ষিত না হলে একটি জাতি সংগঠিত হতে পারেনা। তিনি বলেন ভারতীয় নারীর সব সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ হল শিক্ষা।
সমাজসেবা ও শিক্ষা (Social service and education):- স্বামীজি বলেছেন সমাজসেবার আদর্শে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ ও নিয়োজিত করতে হবে। তাদের মধ্যে সেরার মনোভাব না তৈরি হলে শিক্ষা অসমাপ্ত থাকে। তাঁর এই মানবিক ভাবনা সঞ্জীবনী মন্ত্রের মতো কাজ করেছিল ও জনগণের মধ্যে এক জাতীয়তাবোধের জন্ম দিয়েছিল।
❏ উপসংহার (Conclusion):- নিঃসন্দেহে বিবেকানন্দ ছিলেন ভারতবর্ষের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। উপনিবেশিক ভারতবর্ষে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে জাতিগঠনের প্রাথমিক শর্ত হল জাতীয় শিক্ষা ও জনশিক্ষা। তিনি শিক্ষার যে লক্ষণগুলির কথা বলেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আধ্যাত্মিকতা, চরিত্রগঠন, মনুষ্যত্বলাভ ও আত্মনির্ভরতা। তাঁর মতে, শিক্ষার মূলমন্ত্র হল- ব্রহ্মচর্য, শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস।
8.- বর্তমানকালে মনুষ্যত্বে যে সমস্ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে সে গুলি উল্লেখ করো। মনুষ্যত্বের পুনর্জীবনের জন্য শিক্ষা কী কী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে? 4+8
Ans:- মানবতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের অভাব। মানবতা আসে সহানুভূতি থেকে। যত বড় সহানুভূতি তত বড় মানবতা। বর্ণবাদী ও ধর্মীয় গোঁড়ামির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে যা মানবতার জন্য বড় বিপদ। অনেক জায়গায় জাতিগত সহিংসতা মানুষের প্রাণের ব্যাপক ক্ষতি করছে। মানুষ দুর্ভাগ্য গুরুদের প্রভাবে আছে যারা তাদের শেখায় কিভাবে মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে হয়। তাদের সুবিধার্থে ধর্মীয় গ্রন্থের অর্থ বিকৃত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ধর্ম সবচেয়ে বড় অপরাধী হয়ে উঠেছে। সর্বত্র সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে বিশেষ ধর্মের মানুষ। এই পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য করে তোলার জন্য মানুষকে জাতি, ধর্ম ও ধর্মের ঊর্ধ্বে যেতে হবে।
1996-1997 সালে ডেলফি সমীক্ষা এবং সাক্ষাৎকার দ্বারা চিহ্নিত এই মনুষ্যত্বের সমস্যাগুলি হল:-
❏বিশ্বের জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু খাদ্য, পানি, শিক্ষা, আবাসন এবং চিকিৎসা সেবা দ্রুত বাড়ছে না ফলে মনুষ্যত্বের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
❏ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যবধান আরও চরম এবং বিভক্ত হওয়ার ফলে এই সমস্যা দেখা দেই।
❏নতুন এবং পুনরুত্থানকারী রোগ এবং অনাক্রম্য মাইক্রো-অর্গানিজমের হুমকি বাড়ার ফলে এই সমস্যা দেখা যায়।
❏ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে (যেহেতু ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির পরিস্থিতিতে সমস্যাগুলি আরও বিশ্বব্যাপী এবং জটিল হয়ে উঠেছে)।
❏ সন্ত্রাস ক্রমবর্ধমান ধ্বংসাত্মক, প্রসারিত এবং প্রতিরোধ করা কঠিন।
❏জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি পরিবেশগত গুণমান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সাথে প্রতিকূলভাবে মিথস্ক্রিয়া করছে।
❏নারীর অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে।
❏ ধর্মীয়, জাতিগত ও জাতিগত সংঘাত ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে।
❏তথ্য প্রযুক্তি প্রতিশ্রুতি এবং বিপদ উভয়ই দেয়।
❏ সংগঠিত অপরাধ গোষ্ঠীগুলি পরিশীলিত বিশ্বব্যাপী উদ্যোগে পরিণত হচ্ছে।
❏অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক এবং ভয়ঙ্কর উভয় পরিণতি নিয়ে সারা বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়স বাড়ছে।
মনুষ্যত্বের পুনর্জীবনের জন্য শিক্ষার ভূমিকাঃ- মানুষের দুটি সত্তা- একটি তার জীবসত্তা, অপরটি মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব। শিক্ষা মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশে সহায়তা করে। আবার মানুষের জীবসত্তাকে অস্বীকার করা যায় না। জীবসত্তার প্রয়োজন মিটিয়ে তবে মনুষ্যত্বের বিকাশ হয়। এ বিকাশে শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষার কাজ জ্ঞান সৃষ্টি বা বিতরণ করা নয়; মূল্যবোধ সৃষ্টি করা।
❏কাজ, অবসর, এবং বেকারত্ব পরিবর্তন হচ্ছে।
মানুষের জীবনকে একটি দোতলা ঘরের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। জীবসত্তা সেই ঘরের নিচের তলা, আর মানবসতা বা মনুষ্যত্ব ওপরের তলা। জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই আমাদের মানবসত্তার ঘরে নিয়ে যেতে পারে। অবশ্য জীবসত্তার ঘরেও সে কাজ করে; ক্ষুৎপিপাসার ব্যাপারটি মানবিক করে তোলা তার অন্যতম কাজ। কিন্তু তার আসল কাজ হচ্ছে মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। অন্য কথায়, শিক্ষার যেমন প্রয়োজনের দিক আছে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় দিকও আছে। আর অপ্রয়োজনের দিকই তার শ্রেষ্ঠ দিক। সে শেখায় কী করে জীবনকে উপভোগ করতে হয়, কী করে মনের মালিক হয়ে অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করা যায়।
নিম্নে মনুষ্যত্ব বিকাশে শিক্ষার ভূমিকা গুলি উল্লেখ করা হলো নীতিনির্ধারণে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা।
❏বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সম্ভাবনা প্রসারিত করে।
❏কর্তৃত্ববাদী শাসনকে গণতন্ত্রে রূপান্তর করা
❏বৈচিত্র্য এবং ভাগ করা নৈতিক মূল্যবোধকে উৎসাহিত করা।
❏জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানো।
❏বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিকশিত কৌশল অবলম্বন করা।
❏শক্তির বিকল্প উৎসের উন্নয়ন করা।
❏তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এর অভিন্নতার বিশ্বায়ন করা।
❏বায়োটেকনোলজিতে ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি ঘটানো।
❏নৈতিক বাজার অর্থনীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা।
❏নারী ও অন্যান্য গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি করা।
9. – ভাববাদের সংজ্ঞা দিন। ভাববাদের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করুন। শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়কে ভাববাদ কিভাবে প্রভাবিত করে? What is meant by Idealism?3+3+6
Ans: ভাববাদ (Idealism):- পাশ্চাত্য দার্শনিক মতবাদগুলির মধ্যে প্রাচীনতম মতবাদ হল ভাববাদ। বস্তুত এটি একটি বিশিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষাতত্ত্বের ভিত্তিরচনা বিশেষ করে শিক্ষার লক্ষ্যনির্ণয়ে ভাববাদী দার্শনিকদের গুরুত্ব অসীম।
ভাববাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ Idealism’, এর মূলেই আছে Ideas বা ভাব। অর্থাৎ, যে তত্ত্ব Ideas বা ভাবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, সেটি ভাববাদ বা idealism নামে পরিচিত। ভাববানী মতবাদে বিশ্বাসী দার্শনিকরা মানুষ এবং বিশ্বরয়াগুকে এক ভাবসুলভ সত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এঁদের মতে, জড় জগৎ ছাড়াও আরও একটা জগৎ আছে যাকে বলা হয় ভাবজগৎ বা আধ্যাত্মিক জগৎ। এই জগতের অধীশ্বর হল সর্বজনীন মনের অধিকারী ঈশ্বর। মানুষের জ্ঞান হল সর্বজনীন মনের অংশ মাত্র। মানবসত্তার লক্ষ্যহল এই ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা। ঈশ্বর যেমন চিরন্তন সত্য তেমনই জীবনের মূল্যবোধগুলো চিরন্তন সত্য।
❏ভাববাদের বৈশিষ্ট্য গুলি:-
1.ভাববাদী দার্শনিকরা মানুষ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে এক ভাবমূলক সত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই মত অনুযায়ী দৃশ্যমান জড় জগৎ ছাড়াও আরও একটি জগৎ আছে, তা হল আধ্যাত্মিক জগৎ। জড় জগৎ অপেক্ষা আধ্যাত্মিক জগৎ অধিকতর সত্য বা বাস্তব। দৃশ্যমান জগৎ অস্থায়ী, পরিবর্তনশীল ও মিথ্যা। আমাদের মন ও আত্মা জড় জগতের সৃষ্টিকর্তা।
2.আধ্যাত্মিক জগৎ হল প্রকৃত সত্য এবং অবিনশ্বর। আধ্যাত্মিক জগৎ শাশ্বত ও নিতা। আদর্শ, মূল্যবোধ ইত্যাদি নিয়েই এই আধ্যাত্মিক জগৎ। এই জগতের অধিকর্তা হলেন সর্বজনীন মনের অধিকারী ভগবান বা ব্রহ্ম বা ঈশ্বর। ব্রহ্ম বা ঈশ্বর হলেন চিরন্তন সত্য। মানুষের মন বা আত্মা হল এই সর্বজনীন মনের বা আত্মার অংশমাত্র। ব্যক্তি বা জীবাত্মা যখন ব্রহ্ম বা পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হতে পারে, জীবাত্মা ও পরমাত্মার সঙ্গে একাত্মতা উপলব্ধি লাভ করতে পারে তখন তার মোক্ষ লাভ হয়।
3. ভাববাদীরা মনে করেন যে, বহিঃপ্রকৃতির চেয়ে মানুষের মনই বেশি বিবেচনাযোগ্য। কারণ মূল সত্তার স্থান মানুষের মনেই, বহির্বিশ্বে নয়। কাজেই তাকে চিনতে হলে মন দিয়ে চেনার সাধনা করতে হবে। বাইরে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
4. ভাববাদীদের মতে, বিশ্ব এক প্রাণময় সত্তা যার শরীর ও আত্মা বা মন আছে। ভাববাদীরা মানুষের মন বা আত্মাকে শরীর থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের মতে শরীর বা দেহ মরণশীল, তাই মিথ্যা। কিন্তু আত্মা সত্য কারণ আত্মা অবিনশ্বর।
5. প্রকৃতিবাদীরা জৈবিক সত্তাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ভাববাদীদের কাছে তার বিশেষ মূল্য নেই। মানুষের চিন্ময় সত্তা হল তার প্রকৃত সত্তা যা হল আধ্যাত্মিকতা। মানুষের চিন্ময় আধ্যাত্মিক সত্তা তার একটি অতিরিক্ত গুণ নয়, এটি তার মূল স্বভাব ও সত্তা। শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়কে কিভাবে ভাববাদ প্রভাবিত করে।
❏ভাববাদ ও শিক্ষার লক্ষ্য:- ভাববাদ মানুষের আত্মউৎকর্ষণ এবং আত্মউন্মেষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ভাববাদী দার্শনিকেরা মনে করেন, মানুষের ব্যক্তিত্বের সুষ্ঠু বিকাশের মাধ্যমেই আত্মপলব্ধি বা Selfrealization-ই হল শিক্ষার মূল লক্ষ্য। ভাববাদী দার্শনিকরা মনে করেন, শিক্ষার মাধ্যমে যে সকল সম্ভাবনা রয়েছে তার বিকাশ ঘটবে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “Education is the manifestation of perfection already in man”, শিক্ষার লক্ষ্যভাববাদী দর্শনে, সর্বজনীন যে সত্তা বা মূলা ও নীতিবোধ তার অভিমুখী।
ভাববাদ ও শিক্ষার পাঠক্রম:- ধারণা ও আদর্শের মধ্যে থেকে পাঠক্রমের গঠনের প্রতিই ভাববাদীরা দিকনির্দেশ করেছেন। ভাববাদী দর্শন যেহেতু কতকগুলি নির্দিষ্ট চিরন্তন আদর্শের অভিমুখে শিক্ষাকে পরিচালিত করতে চায়, তাই তারা আদর্শ ও ভাবের উপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ভাববাদীরা পাঠক্রমে তিনটি কাম্যবস্তুকে গুরুত্ব দিয়েছেন-
ক) বৌদ্ধিক (Intellectual):- বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য ভাষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, গনিত, ভূগোল প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা প্রদান
খ) নান্দনিক (Aesthetic):- নান্দনিক বিকাশের জন্য থাকবে চারুকলা, কবিতা, সঙ্গিত, অঙ্কন প্রভৃতি।
গ) নৈতিক (Moral):- নৈতিক বিকাশের জন্য পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হবে ধর্মনীতি, দর্শনশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়।
ভাববাদ ও শিক্ষণ পদ্ধতি:- শিক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রে ভাববাদী দর্শনের প্রভাব অকিঞ্চিৎকর। এখানে তাদের কোন উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। শিক্ষার লক্ষ্যের ক্ষেত্রে অনেক টয় আদর্শের নির্দেশ দিলেও ফিরাবে সেই আইনি বস্তুতে অগায়িত করা যাবে তার সরতোও তারবাদীদের হতে শিক্ষার সাক্ষাযেহেতু, শিশুর অন্তর্নিহিত সত্তার পরিপূর্ণ বিভাগ। তাই তাঁরা শিক্ষাপদ্ধতির ক্ষেত্রে আত্মণক্রিয়তার নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমন, পোস্টালৎসি নীতি ধর্ম শিক্ষার উপরে আত্মপক্রিয়ায়াকে যাতে লাগিয়েছেন, অপরপক্ষে ড্রয়েবেল বেলা-উপহার ও আটকে অবলম্বন করে আত্মউশ্লেষণের পথে আত্মলক্রিয়তায় নীতিকে গ্রহন করেছেন।
ভাববাস ও শৃঙ্গলা:- ভাববাদী দার্শনিকগণ অবাধ শৃঙ্গলার পক্ষপাতী নন, তাঁর মাধ্যমে আত্মপলব্ধি সম্ভব। তাই কঠোর নিষ্ঠা ও নিয়মানুবর্তিতায় শৃঙ্খলে তাদের বাঁধিয়ে যান। অনেক ভাবী আত্মনিগ্রহের মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কথা বলেছেন। কারন বিশৃঙ্খল মানসিক পরিমন্ডলের মধ্যে আত্মপলব্ধি অসম্ভব। আবার অনেক ভাববাদী, শিক্ষকের ভূমিকাতে এক্ষেত্রে প্রধান করে দেখেছেন। তাঁদের মতে, আচরণবিভিহ যে আদর্শ ছাত্রদের সামনে উপস্থাপিত হবে, তাই ছাত্রদের সমস্ত কার্যাবলীতে নিয়ন্ত্রণ করতে। ফ্রয়েতেল-এর মов, “Соля over the child is to be exercised through a knowledge of his interests and expression of love and sympathy”, তবে যাই হোক কিছু ক্ষেত্রে স্বাধীনতার অনুমোদন দিলেও, ভাববাদী দার্শনিকরা কঠোর শৃঙ্গলাতেই বিশ্বাসী ছিলেন।
ভাববাদ ও শিক্ষকের ধারনা:- ভাববাদী দার্শনিকদের মতে, সার্থক শিক্ষক হবেন তিনি, যার আত্মপলব্ধি পূর্ণ হয়েছে। তিনি হবেন আদর্শপরায়ণ, চরিত্রবান এবং উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। শিক্ষক তার ব্যাক্তিত্বের প্রভাবে শিক্ষার্থীকে উদ্বুদ্ধ করবে। তাঁর কাজ শুধু জ্ঞান বিতরণ করা নয়, নিজের জীবনের যে উপলব্ধি তিনি লাভ করেছেন শিক্ষার্থীর জীবনেও যাতে তাকে সর্বত্র সঞ্চারিত করতে পারেন, তার জন্য চেষ্টা করে যাওয়া। তাঁকে শিক্ষার্থীর মনে গভীর ছাপ রেখে যেতে হবে। সম্ভবত ভাবাদর্শকে সমান রেখে তিনিই শিক্ষার্থীদের পরিচালক, বন্ধু ও পথপ্রদর্শকের (Friend, Philosopher and Guide) কাজ করে যাবেন।
❏পরিশেষে বলা যেতে পারে, ভাববাদীরা শিক্ষাক্ষেত্রে সুউচ্চ ও মহৎ আদর্শের পরিকল্পনা করছেন। ব্যাক্তিত্বের বিকাশের মাধ্যমে এই মূল্যবোধ অর্জনের উপরে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। শিক্ষাকে সংকীর্ণতার সীমা থেকে বিশ্বজনীনতার ব্যাপক ক্ষেত্রে পরিচালিত করতে চেয়েছেন আর বিশ্বাত্মার সঙ্গে মানবাত্মার মিলন ঘাটিয়ে মানুষের জীবনকে পূর্ণতার পথে নিয়ে যেতে চেয়েছেন।
10.- শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম এবং শিক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রে পেস্তালজির অবদান আলোচনা করো।
উত্তর—পোলৎসি শিক্ষার মাধ্যমেই উপযুক্ত মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন যতক্ষণ না পর্যন্ত মানুষকে প্রকৃত মানুষরূপে (as true man) গড়ে তোলা যাচ্ছে, অর্থাৎ তার মধ্যে মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণতা আসছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি যেমন সুখী হতে পারে না তেমনি সমাজকেও সুখী করতে পারে না। এই জন্য তিনি স্বাভাবিক, সুসমন্বিত এবং উন্নয়নমূলক শিক্ষা (Natural, Harmonious, Progressive Education)-র ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাগুলি বিকশিত করতে চেয়েছিলেন। সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য অতি প্রয়োজনীয় গুণাবলি, যেমন-ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা অন্যের মঙ্গল কামনা প্রভৃতি তিনি শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত করতে চেয়েছিলেন।
❏পেস্তালৎসির মতানুসারে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্যগুলি নীচে আলোচনা করা হল-
(1)শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত ক্ষমতার বিকাশসাধন (Development of inner power or leamers): পেছালৎসির মতে, মানুষের মধ্যে তিন প্রকার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে, যথা-দৈহিক, মানসিক এবং নৈতিক (Physical, Mental and Moral)। শিক্ষার প্রথম লক্ষ্যহল শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার সমন্বিত ও স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশে সহায়তা করা।
(2) মানবীয় গুণাবলির বিকাশসাধন (Development of human qualities):- পেস্তালৎসিত সময় সমাজবদ্ধ মানুষের মধ্যে মানবীয় গুণাবলি, যেমন-ভালোবাসা, সহযোগিতা, ওয়াস অনুকৃতি, দয়াশীলতা, সমাজসেবা প্রমুখ গুণাবলির অভাব ছিল। এই জন্য তিনি উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সকল দিক পরিপূর্ণ- রূপে মেলে ধরতে চেয়েছেন।
(3) মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা (Making a man self-dependent):- তৎকালীন সময়ে পেঞ্চালৎসির পারিপার্শ্বিক পরিবেশে, মানুষজন অত্যন্ত পরিমাণে আর্থিক দূরবস্থা ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিনযাপন করত। এর প্রধান কারণ ছিল অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন, যাতে তারা নিজেদের ভরণপোষণ এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারে। এই উদ্দেশ্যে তিনি বৃত্তিমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
(4) সামাজিক উন্নয়ন (Social progress):- পেস্তালৎসির মতে, সামাজিক প্রগতি নির্ভর করে বাক্তির উন্নয়ন ও প্রগতির ওপর। তাই তিনি শিক্ষার্থীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পরিপূর্ণ বিকাশসাধন করতে চেয়েছেন, কারণ তিনি জানতেন ব্যক্তির উন্নতি হলেই সমষ্টির উন্নতি ঘটবে।
(5) ধর্ম ও নৈতিকতার বিকাশ (Development of religiosity and morality): পেস্তালৎসি বিশ্বাস করতেন যে, ধর্ম এবং নৈতিকতা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। মানুষ তার ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, ভালোমন্দ পরিপূর্ণরূপে বিচার করতে শেখে। এই জন্য তিনি শিক্ষার মাধ্যমে ধর্মীয় চেতনা ও নৈতিকতা বোধ জাগ্রত করতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার একটি অন্যতম লক্ষ্যহল শিক্ষার্থীর ধর্মীয়বোধ ও নৈতিকতা জাগ্রত করা।
❏পাঠক্রম (Curriculum): পোলৎসি মূলত বিদ্যালয় শিক্ষার (3-13 বছর) পাঠক্রমের ওপর আলোকপাত করেছেন। অর্থাৎ তাঁর মতে শিক্ষার্থীর অভ্যন্তরীণ সুপ্ত সম্ভাবনা সর্বাগ্রে বিকশিত করতে হবে। এইজন্য শিক্ষার্থীকে খেলাধুলা ও চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ করে দিতে হবে। তিনি ভাষাশিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, কারণ উপযুক্ত ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী মনের ভাব পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ করতে সমর্থ হয়। তাঁর মতে ছবি আঁকা এবং সংগীত শিক্ষার্থীদের অনুভূতি প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তাই তিনি বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে এগুলির অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেন। তিনি দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। তাই তিনি বৃত্তিমুখী শিক্ষাকে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। যেহেতু তিনি ধর্ম এবং নৈতিকতাকে মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত করেছেন, তাই শিক্ষার পাঠক্রমে একদম প্রারম্ভিক অবস্থা থেকেই ধর্ম, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন যে শিক্ষা শিশুকে প্রকৃত মানুষ রূপে গড়ে তুলতে পারে না, সেই শিক্ষা হল অসম্পূর্ণ। পেস্তালৎসির প্রস্তাবিত পাঠক্রমে লেখা পড়া ও গণিত স্থান পেয়েছিল। এ ছাড়াও পাঠক্রমে ভূগোল, ইতিহাস, প্রকৃতি পরিচয়, অঙ্কন, সংগীত, শরীরচর্চা, কৃষিকাজ প্রভৃতি প্রয়োজনীয় বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি শিক্ষার্থীদের মনে বহির্জগৎ সম্পর্কে কৌতূহল জাগ্রত করার জন্য পাঠক্রমে প্রকৃতি পরিচয় (Nature Study)- এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের জৈবিক বিকাশে সহায়তা করার জন্য নিয়মিত দেহচর্চাকেও শিক্ষার পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
❏শিক্ষাদান পদ্ধতি (Method of Teaching):- পেস্তালজী পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি (observation method) কে শিক্ষাদান পদ্ধতি হিসাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মৌখিক শিক্ষার উপর কোন গুরুত্ব না দিয়ে বস্তুভিত্তিক পাঠদান (object lesson)- এর উপর তিনি জোর দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে শিশু শিখবে মূর্ত বস্তু (concrete object) পর্যবেক্ষণ করে। তাছাড়া শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে শিশু বয়স অনুযায়ী। সহজ থেকে ক্রমশ কঠিন (from simple to difficult)। আবার শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককে ভাগ করে তিনি শিক্ষা দেবার কথা বলেছেন। Morf-এর মতে পোলজী প্রবর্তিত শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ
(a) শিক্ষাদানের ভিত্তি হবে পর্যবেক্ষণ অথবা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ।
(b) পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ভাষা বা বিষয়বস্তু সর্বদা সম্পর্কযুক্ত হবে।
(c) শিখনের জন্য সময়, বিচারকরণ ও সমালোচনার জন্য সময় কখনও এক নয়।
(d) যে কোনও শাখার কোনও বিষয় শিক্ষাদানের সময় সরলতম বিষয় থেকে ক্রমশ জটিল বিষয়ের দিকে অগ্রসর হতে হবে এবং শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক দিকটির প্রতিও নজর রাখতে হবে।
(e) শিক্ষাদানের সময় খেয়াল রাখতে হবে শুধুমাত্র জ্ঞানের বিকাশসাধন নয়, শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক ক্ষমতার বিকাশ ও শ্রীবৃদ্ধি সাধনে সাহায্য করা। 2023
(f) শিক্ষাদানের সময় শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানতে পারে।
(g) শিক্ষাদানের সময় বিকাশমূলক দিকের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। (ছ) শিক্ষক/শিক্ষিকা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত দিকের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ দেবেন।
(h) জ্ঞানের সঙ্গে ক্ষমতার এবং শিখনের সঙ্গে দক্ষতার সংযোগসাধন হওয়া দরকার।
❏পেস্তালজীর শিক্ষাদান পদ্ধতির অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সিলেবারিজ (Syllabaries)-এর প্রবর্তন। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে শিশু জটিল শব্দগুলি সহজ ও সরল করে উচ্চারণ করতে সক্ষম হবে। তাঁর মতে প্রকৃত জীবনাদর্শ গড়ে তুলতে হলে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে শিক্ষা দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “A man who has only Word Wisdom is less susceptable to truth than a savage”। তিনি যেসব শিক্ষাদান পদ্ধতির কথা বলেছেন তার মধ্যে পাঠ্যবস্তুর বিশ্লেষণ, ইন্দ্রিয় পরিমার্জনার শিক্ষা, মনোবিদ্যা সাতশিক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ।
11. পৃথকভাবে সংকীর্ণ অর্থে এবং ব্যাপক অর্থে শিক্ষার সংজ্ঞা দিন। দর্শন এবং শিক্ষা কীভাবে সম্পর্কিত? কিভাবে দর্শন তার শিক্ষার ক্ষেত্রে রাখতে পারে? ৬+৬+৬
উত্তর:- সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা:- শিক্ষার দুটি অর্থের মধ্যে অন্যতম হলো সংকীর্ণ অর্থ। সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা বলতে বোঝায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় বা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ কর্তৃক যে জ্ঞান বা পাঠ শিক্ষার্থীরা লাভ করে থাকে। সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা হল শিশুর শূন্যমনে ক্রমশ জ্ঞানের সঞ্চার। শিক্ষক বা পুস্তক হলো জ্ঞান ভান্ডার আর সেই জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে স্বর্ণরূপে জ্ঞান শূন্য মনে সঞ্চিত হয়ে থাকে।
❏শিক্ষক বা পুস্তক হলো জ্ঞানের খনি, সেই খনি বা উৎস থেকে মনের মাধ্যমে জ্ঞানের স্রোতে শিশুর শূন্য মন ভরে ওঠে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পাঠক্রমকে সামনে রেখে শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি দ্বারা পাঠক্রমের বিষয়গুলি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চালনের মাধ্যমে ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা লাভের প্রক্রিয়াকে সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা বলে।
❏এস এস ম্যাকেঞ্জির মতে সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা বলতে ক্ষমতার বিকাশ ও চর্চা করার যে কোনো সচেতন প্রয়াসকে বোঝায়।
❏ব্যাপক অর্থে শিক্ষা:- ব্যাপক অর্থানুযায়ী, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যঅত্যন্ত বিস্তৃত। এই ধারণানুযায়ী শিক্ষাকে ব্যক্তির জীবনব্যাপী বিকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে শিক্ষা বলতে নিয়ন্ত্রিত, অনিয়ন্ত্রিত, বিধিমুক্ত, সমস্ত প্রকার শিক্ষার কথা বোঝানো হয়েছে। এখানে শিক্ষা বলতে 3R (Reading, Writing, Arithmetic) এবং 3H (Head, Heart, Hand) উভয়কে বুঝিয়েছেন।
ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হলো- ‘Two Way Communication, অর্থাৎ শিক্ষা প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর সক্রিয়তার সুযোগ রয়েছে। এই মত অনুযায়ী শিক্ষকের কাজ শুধু শিক্ষাদান এবং নির্দেশদান নয়। শিক্ষক এখানে শিক্ষার্থীর বন্ধু, সহায়ক, পরিচালক। ব্যাপক অর্থে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর দেহ, মন ও আত্মার সার্বিক বিকাশ ঘটানো। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা মানুষের সারা জীবন ধরে চলতে থাকে।
দর্শনশাস্ত্র (Philosophy) – জীবনের মূল উৎস ও উদ্দেশ্য খুঁজে বের করাই হলো দর্শন। দর্শন মানে দেখা অর্থাৎ সত্যের সন্ধান ও সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করা। আবার দর্শন এর অর্থ হলো জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা।
শিক্ষা (Education)-শিক্ষা হলো জীবনব্যাপী ক্রমবিকাশের একটি নিরন্তন প্রক্রিয়া যা অভিজ্ঞতার পুনর্গঠনের মাধ্যমে মানুষকে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের সক্ষম করে তোলে। উপরের উল্লেখিত দর্শন শিক্ষার অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দর্শন নির্ধারণ করে জীবনের উদ্দেশ্য কি কি করণীয় এবং কি কি করনীয় নয়। আর শিক্ষা হলো সেই উপায় বা হাতিয়ার যার দ্বারা দর্শন নির্ধারিত জীবনের উদ্দেশ্য গুলি কে বাস্তবায়িত করা যায়। এই অর্থে দর্শন ও শিক্ষা পরস্পর সম্পর্কিত এবং দুটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছে। অর্থাৎ শিক্ষা যেমন দর্শনের উপর নির্ভরশীল তেমনই দর্শনও শিক্ষার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাই বলা যায় দর্শন হলো ভিত্তি এবং শিক্ষা হলো উপরিকাঠামো।
❏দার্শনিক ধারণা প্রকাশের ব্যবহারিক মাধ্যম। দর্শন ধারণা দেয় এবং শিক্ষা দর্শন দ্বারা প্রদত্ত এই ধারণাগুলি তৈরি করে। 7. দর্শন ছাড়া শিক্ষা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। তাই শিক্ষা ও দর্শন উভয়ই একে অপরের উপর নির্ভরশীল।
❏‘দর্শন ব্যতীত শিক্ষা অন্ধ এবং শিক্ষা ব্যতীত দর্শন অকার্যকর”
দর্শন এবং শিক্ষা একই মুদ্রার দুই পিঠের মত। প্রথমটি হল জীবনের মননশীল দিক, আর পরেরটি হল সক্রিয় দিক। দর্শন হল প্রজ্ঞা আর শিক্ষা হল সেই জ্ঞানকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রেরণ করে।
❏তাই নিয়ে দর্শন ও শিক্ষার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অন্য ভাবে ব্যাখ্যা করা হলোঃ-
1. শিক্ষা এবং দর্শন উভয়ই গতিশীল:- - এর অর্থ হল উভয়ই স্থির নয় এবং সর্বদা পরিবর্তনশীল। শিক্ষা একদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে বিকশিত করে এবং সমাজের পরিবর্তিত চাহিদার সাথে মানানসই জ্ঞানকে প্রভাবিত করে। একই দিকে দর্শন ধারনা, দার্শনিকদের সর্বদা পরিবর্তনশীল মতামত, বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিভিন্ন দার্শনিক ধারণা বিশ্লেষণের একটি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে। আবার শিক্ষার অর্থ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে জয়িতার দার্শনিক ভিত্তি শক্তিশালী হয় ।
2. শিক্ষা হল দর্শনের গতিশীল দিক:- এর মানে হল শিক্ষা হল দর্শনের ব্যবহারিক দিক কারণ প্রতিটি দার্শনিক চিন্তা শিক্ষার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় এবং দার্শনিকদের জ্ঞান, বিশ্বাস এবং প্রজ্ঞার এই আবিষ্কারগুলি শিক্ষার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রেরণ করা হয়।
3. শিক্ষা দর্শনের উপর নির্ভরশীল :-কারণ দর্শন আমাদের শিক্ষার প্রতি কেমন অনুভব করি তা প্রভাবিত করে এবং শিক্ষা হল একটি
4.দার্শনিকের তত্ত্বের প্রচার ও প্রসার:- শিক্ষার মাধ্যমেই দার্শনিক তত্ত্ব প্রচার ও প্রসার ঘটে। শিক্ষার মাধ্যমেই দার্শনিক তত্ত্বের ।
5.শিক্ষা এবং দর্শন উভয়ই তত্ত্বের সাথে জড়িত এবং দর্শন একজন ছাত্রকে বুদ্ধিমান, প্রশস্ত মনের এবং জ্ঞানের জন্য ক্ষুধার্ত করে তোলে।
শিক্ষাক্ষেত্রে দর্শনের অবদান:- শিক্ষা একটি জটিল সামাজিক প্রক্রিয়া। কতগুলি পরিকল্পিত পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এই শিক্ষা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াগুলির উপর দর্শনের ভূমিকা আলোচনার মধ্য দিয়েই শিক্ষার ওপর দর্শনের শ্রেষ্ঠ অবদান বিষয়টি অনুধাবন করা যায়। নিম্নে তা আলোচনা করা হলোঃ-
1.দর্শন ও শিক্ষার লক্ষ্য:- নির্দিষ্ট লক্ষ্যব্যতীত শিক্ষা কার্যকরী হয় না। তাই প্রত্যেক শিক্ষাব্যবস্থারই একটা উদ্দেশ্য থাকে। বাস্তব জীবনকে ভিত্তি করেই শিক্ষার লক্ষ্যস্থির হয়। দর্শন এই লক্ষ্যগুলি স্থির করতে শিক্ষাকে সাহায্য করে। আবার এই লক্ষ্যগুলি কি করে শিক্ষার্থীর জীবনে বাস্তবায়িত হবে তারও ইঙ্গিত দেয় দর্শন।
2. দর্শন ও পাঠক্রম :- শিক্ষার পাঠক্রম তৈরি করা তথা পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রেও দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। পাঠ্যক্রমে কোন কোন বিষয় থাকবে তা নির্ধারণে দর্শনের ভূমিকা সুবিদিত। যেমন মহাত্মা গান্ধী প্রবর্তিত বুনিয়াদি শিক্ষার পাঠক্রম তাঁর জীবনদর্শন দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত।
3.দর্শন ও শিক্ষাদান পদ্ধতি:- শিক্ষন পদ্ধতি হল, যে কৌশলে সাহায্যে শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের নিকট উপস্থাপিত করা হয়। আর এই শিক্ষার পদ্ধতিতেও দর্শন সবিশেষ প্রভাবিত হয়েছে। সেই জন্য বিভিন্ন দার্শনিকগণ শিক্ষাদান যাতে সার্থক হয় তার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতির কথা বলেছেন। যেমন ভাববাদী দর্শন আলোচনা পদ্ধতি।
4.দর্শন ও শৃঙ্খলা- শৃঙ্খলা রক্ষা শিক্ষার একটি অপরিহার্য অঙ্গ। কিভাবে শৃঙ্খলা রক্ষা করা হলে সেক্ষেত্রে দর্শনের বিশেষ ভূমিকা দেখা যায়। যেমন প্রকৃতিবাদীরা মনে করেন প্রকৃতির দন্তবিধান এর মাধ্যমে প্রকৃত শৃঙ্খলা বোধ সৃষ্টি হয়। “আগুনে হাত দিলে হাত পোড়ে- এই শিক্ষা শিশু আগুনে হাত দিয়েই শিখবে।
5. দর্শন ও শিক্ষক:- শিক্ষক হলেন শিক্ষার্থীর গুরু। তাই প্রকৃত শিক্ষক হতে গেলে তার কি কি গুন থাকা দরকার এবং ছাত্রের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য কতটুকু ইত্যাদি দর্শনশাস্ত্র নির্ণয় করার চেষ্টা করে।
6. দর্শন ও পাঠ্যপুস্তক:- যথার্থ পাঠ্যপুস্তক নির্ধারণের দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। পাঠ্যপুস্তক তৈরি করার সময় তার উদ্দেশ্য, মান, নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন হয় এমনকি পুস্তকে যথেষ্ট ছবি, উদাহরণ থাকবে কিনা, কি ধরনের ছবি থাকা। উচিত। এই সমস্ত বিষয়ে দর্শন সাহায্য করে থাকে।
❏উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছেযে, দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা বিভিন্ন অংশের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। শিক্ষা যতদিন উদ্দেশ্যমুখি বিজ্ঞান হিসেবে বিবেচিত হবে ততদিন তাকে দর্শনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। সুতরাং দর্শনের প্রভাব বা গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
উত্তর-শিক্ষার লক্ষ্য:-Aimless life is like a rudderless ship’ অর্থাৎ লক্ষাহীন জীবন নোঙরহীন নৌকার ন্যায়। শিক্ষা একটি অবিরাম জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। আর শিক্ষার লক্ষ্যহল শিক্ষার প্রক্রিয়ার দিকনির্দেশ প্রদানকারী। শিক্ষার লক্ষ্যহল শিশুদের ভালবাসা, সহযোগিতা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং সম্প্রীতির মানব সম্প্রদায় তৈরির জন্য কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানব ব্যক্তিতে পরিণত করা। জ্ঞান, দক্ষতা এবং মনোভাব অর্জন করাকে শিক্ষার লক্ষ্যবলে। এটি নিজের পরিবেশে সঠিকভাবে সামঞ্জস্য করতে সহায়তা করে। এটি জীবনের মূল্যবান সম্পদ, যা ব্যক্তিকে জীবনের বিপর্যয় এবং সমস্যাগুলি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে।
12.- শিক্ষার লক্ষ্যবলতে কি বোঝেন? শিক্ষার লক্ষ্যনির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করুন। বিভিন্ন দর্শন অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্যআলোচনা করুন। 2+4+12
❏শিক্ষার লক্ষ্যনির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা:- মানব জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ নিঃসন্দেহে শিক্ষা। এই শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া আমরা। জানি লক্ষ্যহীন কোন কাজ যেমন সফলতা পেতে পারে না তেমনি শিক্ষাব্যবস্থাও নির্দিষ্ট লক্ষ্যছাড়া এগিয়ে যেতে পারে না। সেই জন্য শিক্ষার ক্ষেত্রে সঠিক লক্ষ্যনির্ধারণ করা প্রয়োজন। যথা
1.শিক্ষার বাস্তবায়ন:- শিক্ষাকে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করতে হলে গৃহীত কর্মসূচি, উপাদান, সম্পদ ও পরিবেশ কেমন হবে তা নির্দিষ্ট করতে শিক্ষার লক্ষ্যর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
2. প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা:- পাঠের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শিক্ষা সংক্রান্ত নানা কর্মসূচির করা হয়। যেমন পাঠক্রম, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার উপাদান, শৃঙ্খলা, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি এই সকল বিষয় এবং কর্মসূচি শিক্ষার লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।
3. অর্থ সময় ও শ্রম সাশ্রয়:- শিক্ষার লক্ষ্যসম্পর্কে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যদি সচেতন হয় তাহলে অতি সহজে সফলতা পাওয়া যায়। ফলে সময় অর্থ এবং শ্রমের অপচয় হয়।
4.সচেতনতা গঠন:- শিক্ষার লক্ষ্যশিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন করে তোলে। ফলে শিক্ষকের সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তি আপন দায়িত্ব এবং কর্তব্য পরিপূর্ণ রূপে পালন করতে পারে।
5. মূল্যায়নের সহায়তা:- শিক্ষার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যসামনে রেখে পাঠদান ও মূল্যায়ন করা হয়। একমাত্র মূল্যায়নের মাধ্যমে পাঠের উদ্দেশ্য, সফলতা নির্ণয় করে তবেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার লক্ষ্যসঠিক দিশা এবং মানদন্ড প্রদান করে।
বিভিন্ন দর্শন অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্যআলোচনা করুন:- পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দার্শনিক বহু হাজার হাজার বছর ধরে এই জগৎ, সংসার, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উদ্ভব প্রকৃতি ও বিবর্তনের কারণ খোঁজার চেষ্টায় নিমগ্ন থেকেছেন। তাই দার্শনিকদের সেইসব প্রয়াস ও কৌতূহলে ফলশ্রুতি স্বরূপ দর্শনশাস্ত্র সমৃদ্ধতর হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি দার্শনিকগণ শিক্ষার লক্ষ্যও প্রকৃতি প্রসঙ্গে অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছেন।
❏সেইজন্য বিভিন্ন যুগে যেসব দর্শন শিক্ষার লক্ষ্যসম্পর্কে মতামত প্রসন করেছেন তা আলোচনা করা হলো।
❏শিক্ষার লক্ষ্যও ভাববাদী দর্শন ভাববাদী শিক্ষা দার্শনিকগণ মনে করেন যে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্যহল আত্মউপলব্ধি বা self realisation। এই আত্মোপলব্ধির জন্য প্রয়োজন ব্যক্তির আত্মবিকাশ। যেসব সুপ্ত শক্তি ব্যক্তির মধ্যে রয়েছে তার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনে হলো শিক্ষার লক্ষ্য। ভাববাদ বিশ্বাস করে যে বিশ্ব এক পরমসত্তার প্রকাশ। এই পরমসত্তাকে বা পরমাত্মা বলে অভিহিত করা হয়েছে। তাই মানব জীবনের লক্ষ্যহলো জীবাত্মার মধ্যে পরমাত্মার উপলব্ধি ঘটানো এবং শিক্ষার লক্ষ্যও তাই। ভাববাদীদের মতে মানুষ মূলত আধ্যাত্বিক জীব। মানুষের উন্নততর জীবন হলো আধ্যাত্বিক জীবন। শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সেই ভাবময় সত্তা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। ভাববাদীদের মতে, শিক্ষার লক্ষ্যহল মনুষত্ব লাভ, জীবনকে সবদিক থেকে উদ্বোধিত করা, প্রাণকে সম্পূর্ণ জাগানো এবং আপনাকে বিকশিত করা। ভাববাদীদের মতে মানুষ হল অনন্ত ঐশ্বর্য্যের অধিকারী। তার মতে প্রত্যেক জীবনের লক্ষ্যনিজের পরিপূর্ণতম সত্তাকে জানা এবং তাকে লাভ করা। তাই ভাববাদীদের মতে শিক্ষার লক্ষ্যহল মানুষের অন্তর্নিহিত গুণ সম্পর্কে তাকে সচেতন করে তোলা।
❏শিক্ষার লক্ষ্যও প্রকৃতিবাদ দর্শন প্রকৃতিবাদী দার্শনিকেরা আত্মপ্রকাশনে সহায়তাকেশিক্ষার অন্যতম লক্ষ্যহিসেবে বিবেচিত করেছেন। শিশুর সহজাত প্রবৃত্তিগুলির উন্নতিকরণ, ভবিষ্যত জীবনের প্রস্তুতি শিশুকে সমসুযোগের পথে অগ্রসর করা- এসবই হলো প্রকৃতিবাদ অনুসারে শিক্ষার লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে রুশো বলেছেন যে, শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বীয় স্বভাবধর্ম অনুসারে শিশুর আত্মবিকাশ।
❏প্রকৃতিবিদদের মতে, ব্যক্তিত্বের নিখুঁত বিকাশ শিক্ষার সর্বোচ্চ লক্ষ্য। “মানব জীবনের সঠিক লক্ষ্যহল ব্যক্তির পরিপূর্ণতা। এমনকি প্রকৃতিবাদ এর মতে শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে আত্ম সংরক্ষণ ও আত্মপ্রকাশের সাহায্য করা।
❏শিক্ষার লক্ষ্যপ্রয়োগবাদী দর্শন—প্রয়োগবাদ আধুনিক শিক্ষাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। শিক্ষার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উপরের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগবাদী দর্শনের বিশেষ কতগুলি লক্ষ্যরয়েছে। সেগুলি হল-
1. প্রয়োগবাদী দর্শনের মতে শিক্ষার লক্ষ্যবা উদ্দেশ্য হলো অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মূল্যবোধ সৃষ্টি করা।প্রকৃতিবাদী ম্যাকডুগাল এর মতে শিক্ষার লক্ষ্যহচ্ছে আমাদের প্রকৃতির উদ্যমকে ঊর্ধ্বগামী করা।
2.সমাজের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনশীল শিক্ষালাভ।
3. স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য শিক্ষার্থীকে অধিক শিক্ষালাভের প্রতি গুরুত্ব দান।
4. পরিবেশে অভিযোজন এর উপর জোর দেওয়া।
5. সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ গঠনের প্রস্তুতি শেখানো শিক্ষার লক্ষ্যও বস্তুবাদ বা বাস্তববাদ বাস্তববাদীরা শিক্ষার লক্ষ্যনির্ণয় আরোপ করেছেন। তাই সাধারণভাবে বাস্তববাদীদের মতে শিক্ষার লক্ষ্যগুলি হলো-
2.সামাজিক দক্ষতা দান করা:-
1.শিক্ষার্থীর সমগ্র ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন করা।
2.শিক্ষার্থীকে পরিবেশের সঙ্গে সংগতি বিধানের সক্ষম করে তোলা।ব্যক্তিগত লক্ষ্যও সামাজিক লক্ষ্যসমন্বয়ে উপর গুরুত্ব
3.সমাজ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান আহরণ করা।
4.শিক্ষার্থীকে বিশ্বসমাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা।
5.চরিত্রে গঠন ও পেশাগত দক্ষতার বিকাশ সাধন করা।
6.তথ্য ও জ্ঞান আহরণ করা।
যে কোন দুটি প্রশ্নের উত্তরদিন। Answer any two questions: 12x2=24
13.—শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম এবং শিখন পদ্ধতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রাচ্য দর্শনের মূল্যায়ন।
Ans:- দর্শন ও শিক্ষা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। দর্শনশাস্ত্র বিশেষভাবে শিক্ষাকে নানানভাবে প্রভাবিত করেছে। দর্শন ও শিক্ষার পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়, যখন আমরা দেখি বিভিন্ন দার্শনিক মতাদর্শ বর্তমান শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম, পদ্ধতি ইত্যাদিকে কত গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
বস্তুত শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর নৈতিকতা জাগ্রত হয়, চরিত্র গড়ে ওঠে এবং সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। আর এই সকল বিকাশের পথ নির্দেশ করে নীতিশাস্ত্র, সৌন্দর্যতত্ত্ব ইত্যাদি দর্শনতত্ত্বের শাখা। ভারতীয় শিক্ষার বিভিন্ন যুগে ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা, বৌদ্ধ শিক্ষা, মুসলিম শিক্ষা যথাক্রমে বেদান্তদর্শন, বৌদ্ধদর্শন ও ইসলামীয় দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এমন একটি জানের ক্ষেত্র যেখানে প্রভাবের দিকগুলি পৃথকভাবে আলোচনা করি
শিক্ষা ও দর্শনের পারস্পরিক সম্পর্ক আলোচনার সময় আমরা দেখেছি, শিক্ষাবিজ্ঞান দর্শনশাস্ত্রের প্রভাবই সবথেকে বেশি। এই সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হবে, যদি আমরা দর্শনশাস্ত্রের প্রত্যক্ষ।
❏শিক্ষার লক্ষানির্ণয়ে দর্শন (Philosophy on the aim of Education):- মানবজীবনের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক নিবিড়। তাই জীবনের লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতি রেখেই শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়। শিক্ষার লক্ষ্যসবসময় একটি জীবনাদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, প্রত্যেক শিক্ষার লক্ষ্যই সমকালীন দার্শনিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়। আর সেটাই স্বাভাবিক। দার্শনিক মতবাদ জীবন জয়ের পথে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জীবন জয়ের এই সংগ্রামে সমাজে এক বিশেষ ধরনের মূল্যবোধ (System of values) গড়ে ওঠে। এই মূল্যবোধগুলি ব্যক্তিজীবনের আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়, আর তখন সেগুলি পরিণত হয় শিক্ষার উদ্দেশ্যে (Aim or Objective of education) সেই কালের সেই সমাজের। স্বভাবতই মূল্যবোধের পরিবর্তনে শিক্ষার উদ্দেশ্যও পরিবর্তিত হয় কালের পটভূমিতে।
❏. শিক্ষার পাঠক্রমে দর্শনের প্রভাব (Influence of Philosophy Curriculum):- পাঠক্রম শিক্ষার উদ্দেশ্য পথ পরিপূরণের পাঠক্রম সংক্রান্ত আলোচনা প্রসঙ্গে ব্রিগস (Briggs) বলেন, পাঠক্রমের ক্ষেত্রেই সত্যকার দার্শনিক নেতার প্রয়োজন। কারণ তিনি সুচিন্তিতভাবে উপযুক্ত বিষয়বস্তু নির্বাচনে পরামর্শ দিতে পারেন। বিষয়বস্তু নির্ণয় ও বিন্যাসকরণে দর্শনের প্রভাব অপরিসীম। ব্রিগস-এর কথায়, “its is here that education seriously needs leaders-leaders who hold a sound comprehensive philosophy of which they can convince others and who can direct its consistent application to the formulations of appropriate curricula,” শিক্ষার প্রবর্তনশীল উদ্দেশ্যের মতো পাঠক্রমও পরিবর্তনশীল। শিক্ষার আদর্শের মতো তাইওমির দিও নয় দেশ কাল ও ব্যক্তিভেদে তারও পরিবর্তন হয়-সমকালীন দার্শনিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়। প্রাচীন ভারতে হিন্দু, বৌদ্ধ উভয় শিক্ষাব্যবস্থারই লক্ষ্যছিল আত্মোপলব্ধি। স্বভাবতই বেদাভ্যাস, রহ্মচর্য পালন, আত্মসংযম ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে পাঠক্রম রচিত হত। আধুনিক শিক্ষাক্রমে প্রকৃতিবাদ ও প্রয়োগবাদের সমন্বিত প্রভাবে চাহিদাভিত্তিক কর্মকেন্দ্রিক, অভিজ্ঞতাভিত্তিক সমন্বয়ী পাঠক্রমের প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রাচীন ভাববাদী পাঠক্রমের অতিমাত্রায় পুথিনির্ভরতা ও ভাষাভিত্তিকতার প্রতিক্রিয়া রুপেই সক্রিয়তাভিত্তিক পাঠক্রমের উদ্ভব হয়েছে।
❏ভারতীয় দর্শনের আলোচনা পদ্ধতি (Method of Indian Philosophy): ভারতীয় দর্শনে বিবিধের মধ্যে মহান মিলন প্রতিফলিত হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন দর্শন সম্প্রদায় যেন একই দর্শন-পরিবারের সদস্য, যাদের মধ্যে অনৈক্য থাকলেও মিলও আছে। ভারতীয় কোন দশৰন সম্প্রদায়ই অপরাপর সম্প্রদায়ের অভিমতকে মর্যাদা না দিয়ে প্রতিষ্ঠালাভ করতে পারেনি। পারস্পরিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও এক সম্প্রদায়কে অপর সম্প্রদায়ের মতবাদ শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে জানতে হয়েছে, কেননা, বিপক্ষীয়দের মতবাদ সম্পর্কে সুগভীর জ্ঞান না থাকলে তাকে খণ্ডন করাও যায় না। পরমত খণ্ডনের জন্যই শ্রদ্ধার সঙ্গে পরমত পাঠের প্রয়োজন হয় এবং স্বমত প্রতিষ্ঠার পূর্বে সর্বাগ্রে প্রয়োজন পরমত খণ্ডন। অপরের মতবাদের প্রতি এ প্রকার শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মনোভাব থেকেই ভারতীয় দর্শনে এক উদার ও ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি (Catholic outlook) প্রকাশ পেয়েছে, এবং দর্শন-আলোচনা পদ্ধতি এক বিশেষ খাতে প্রবাহিত হয়েছে।
❏ভারতীয় দর্শন আলোচনায় ত্রিস্তর লক্ষ্যকরা যায়ঃ (১) পূর্বপক্ষ, (২) খণ্ডন ও (৩) উত্তরপক্ষ বা স্বমত প্রতিষ্ঠা।
❏স্বমত প্রতিষ্ঠার পূর্বে প্রতিপক্ষীর মত ব্যক্ত করা হচ্ছে ‘পূর্বপক্ষ,
❏প্রতিপক্ষীর মতবাদের দোষ-ত্রুটি নির্দেশ হচ্ছে ‘খণ্ডন’ এবং
❏সর্বশেষে যুক্তিসহ নিজমত প্রতিপাদন হচ্ছে উত্তরপক্ষ’ বা ‘সিদ্ধান্ত’।
❏ভারতীয় দর্শনের এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই প্রত্যেকটি সম্প্রদায় হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যপূর্ণ।
14- শিক্ষার লক্ষ্যের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করো। 12
উত্তর- শিক্ষার আদিমপর্বে আদিম মনুষ্য সমাজে শিক্ষার কোনো সচেতন প্রয়াস ছিল না। শিক্ষা ছিল অনিস্থিত। জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার তাগিদে এবং আত্মসংরক্ষণের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত জীবন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে মানুষ আপনা আপনি কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করত। তাই ছিল তার শিক্ষা। দল হিসাবে মানুষ যখন বাস করতে আরম্ভ করল, তখন দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সুষ্ঠু’ অভিযোজনের প্রয়োজনে শিক্ষার লক্ষ্যহল ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করা, যাতে করে দলের সঙ্গে সার্থক সংগতি বিধানের মাধ্যমে বেঁচে থাকা যায়। তখন শিক্ষা ধীরে ধীরে সচেতনভাবে লক্ষ্যমুখী হল।
❏প্রাচীন ভারতে শিক্ষা ছিল ধর্মনিয়ন্ত্রিত। বৈদিক দর্শন এবং হিন্দু ধর্মের উপলব্ধি হচ্ছে পরমাত্মা অবিনশ্বর এবং অসীম। ব্যক্তি সেই পরামাত্মার সসীম অংশ এবং নম্বর। সক্ষম জগৎ পরম ব্রহ্মের বিচিত্র প্রকাশ। ‘সর্বং খলু ইদং ব্রশ্ন’। আত্মোপলব্ধি এবং ব্যক্তিত্বের উন্নয়নের মাধ্যমে নিজের অন্তরে এই ‘পরমাত্মা’ বা ব্রহ্মের উপলব্ধি এবং সমগ্র বিশ্বজগতের পরম বৈচিত্র্যের মধ্যে সেই এক-কে অনুভব করাই ছিল শিক্ষার পরম লক্ষ্য। বলা বাহুল্য, এই শিক্ষা ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
❏পাশ্চাত্যে বিভিন্ন নগররাষ্ট্রে শিক্ষার লক্ষ্যের বিভিন্নতা ছিল। গ্রিস দেশের নগররাষ্ট্রে স্পার্টায় ব্যক্তিস্বাধীনতার কোনো মূল্য ছিল না। এই রাষ্ট্র প্রায়ই বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হত। আত্মরক্ষার তাগিদে সমগ্রজাতিকে যোদ্ধাজাতি রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। শিক্ষা ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত। শিক্ষার লক্ষ্যছিল ব্যক্তির দৈহিক শক্তি, সাহস, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য। শিক্ষায় ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার কোনো স্থান ছিল না। সমাজ কল্যাণের কাছে ব্যক্তি কল্যাণকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। এতে জ্ঞানচর্চা ও সৌন্দর্য চর্চার বিশেষ সুযোগ ছিল না।
❏পাশের নগররাষ্ট্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বার্থকে সমাজের দাবির ওপর স্থান দেওয়া হয়েছে। ব্যাক্তির দেহ মনের সুসযন্ত্রণা বিকাশসাধনকে শিক্ষার লক্ষ্যবলে ধরা হয়েছে। তখন সোফিন্ট নামে একদল শিক্ষকের আবির্ভাব ঘটল। তাঁরা বললেন, বাক্তি মানুষই হবে সকল বিষয়ের মাপকাঠি (‘Man is the measure of all things’)। বাক্তির আত্মোন্নতির বাইরে কোনো শাশ্বত মূল্যবোধ থাকতে পারে না। তাঁরা ভাই সমাজের প্রতি দায়িত্বকে প্রায় অস্বীকার করে ব্যক্তিকল্যাণকেই শিক্ষার লক্ষ্যবলে গ্রহণ করলেন। সক্রেটিস, ডেটো, অ্যারিস্টটল প্রমুখ গ্রিক মনীষীগণ সোফিন্টদের এই উন্ন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে সমর্থন করতে পারেন।। সক্রেটিন বললেন ‘নিজেকে জানো’ (Know thyself)। এই জানা এবং আঙু জিজ্ঞাসার মাধ্যমে সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান করাই হবে শিক্ষার লক্ষ্য। অর্থাৎ শুধু আত্মোন্নতি নয়, এমন আত্মোপ্রতি যার ফলে সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান করা যায়। প্লেটো ব্যক্তির সমস্ত ক্ষমতার সর্বোত্তম প্রকাশকে শিক্ষার লক্ষ্য বলে চিহ্নিত করে ছিলেন যাতে সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজবিকাশ সংহত হয়।
❏প্রাচীন জোমান সমাজ ছিল কৃষিভিত্তিক। প্রাচীন রোমকগণ গ্রিকদের মতো চিন্তাশীল, জ্ঞানপিপাসু ও সৌন্দর্যের পূজারি ছিল না। তাঁদের চিন্তাধারা ছিল একেবারে বস্তুতান্ত্রিক। ব্যবহারিক জগতে বাস্তব সাফল্যলাভের মাধ্যমে আদর্শ নাগরিক হয়ে ওঠার গুণাবলি অর্জনই ছিল রোমক শিক্ষার আদর্শ।
❏মধ্যযুগে শিক্ষাব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে ধর্মযাজক সম্প্রদায়ের কুক্ষিগত হল। ধর্ম অনুশাসিত শৃঙ্খলার লক্ষ্যহল সর্বাত্মক শৃঙ্খলা। বলা হল ইন্দ্রিয় সুখ বিসর্জন, চিত্তবৃত্তিনিরোধ, কঠোর কৃচ্ছসাধনের মধ্য দিয়ে অনাগত অনন্ত জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এক কথায় ধর্মের কঠোর অনুশাসনে মানবধর্মের অবলুপ্তি ঘটল। শিক্ষাক্ষেত্রে অনুশাসন, অবদমন প্রাধান্য পেল।
❏মানুষের জীবনে সর্বক্ষেত্রে যাজকশ্রেণির আধিপত্যের বিরুদ্ধে, জীবনধর্মের সর্বব্যাপী এই অবদমনের বিরুদ্ধে মানুষ বিদ্রোহ করল রেনেসাঁ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এই নব জাগরণের ফলে যে শিক্ষা-মতবাদের উদ্ভব হল তার নাম মানবতাবাদ (Humanism)। এই মতবাদ অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্যহল ব্যক্তিকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দেওয়া যাতে সে সর্বতোমুখী ও স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশের মাধ্যমে সমকালীন সমাজজীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। পরবর্তীকালে অবশ্য মানবতাবাদী এই শিক্ষা একেবারে কৃত্রিম, ভাষাসবর্ষ, গতানুগতিক, প্রথাগত, রোমান বাগ্মীদের বাকভঙ্গি অনুকরণের ব্যর্থ প্রয়াসে পরিণত হল। ইউরোপের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানবতাবাদ কৃত্রিমতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।
❏এই কৃত্রিম শিক্ষার বিরুদ্ধে সতেরো শতকে বেকন, কমেনিয়াস প্রমুখ মনীষীদের নেতৃত্বে শিক্ষায় বাস্তববাদ (Realism) আন্দোলন দেখা দিল। বাস্তববাদীরা বললেন সকল দুর্নীতির মূলে অজ্ঞানতা। তাই শিক্ষার মাধ্যমে খণ্ড খণ্ড জ্ঞানকে সুসংহত করে বিশ্বজ্ঞানের বিন্যাস ও প্রচার করতে হবে। বলা হল ইন্দ্রিয় পত্যক্ষণের মাধ্যমে বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতা অর্জনই হল শিক্ষার লক্ষ্য।
❏ আঠারো শতকে সর্বপ্রথম বাক্তিকেন্দ্রিক, শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রকৃত উদ্বোধন হল। শিশুর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, প্রক্ষোভ, প্রয়োজন ও সামর্থ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার বিরুদ্ধে ও শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর ওপর সামাজিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন ফরাসি চিন্তানায়ক ও দার্শনিক রুশো (Rousscau)। তিনি বললেন, “প্রকৃতির স্রষ্টার হাত থেকে যা কিছু আসে তা সব সৎ এবং মঙ্গলময়: কিন্তু মানুষের হাতে পড়ে তাদের বিকৃতি ঘটে” (“Everything is good as it comes from the hands of the Author of nature; but everything degenerates in the hands of man.”)। তাই বয়স্ক পরিকল্পিত কৃত্রিম জ্ঞানের বোঝা বাইরে থেকে শিশুমনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। কৃত্রিমতাবর্জিত নিঃসর্গ পরিবেশে পরিপূর্ণ শিশুসুলভ জীবনযাপনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ জীবন অভিজ্ঞতা অবলম্বন করে শিশু। প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশই হল প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য। এইভাবে শিক্ষাজগতে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রতিষ্ঠা ঘটল।
❏উত্তরসূরি রুশের উত্তরসূরি পেস্টালৎসি (Pestaloziu) শিক্ষকে মনোবিজ্ঞান সমম্মত করার প্রয়াসী হয়ে বললেন, শিশুর সহজাত শক্তি সম্ভাবনার সামগ্রিক স্বাভাবিক আত্মপ্রকাশ এবং সম্পূর্ণতা লাভই শিক্ষার চরম লক্ষ্য।
❏শিক্ষাবিদ হাবার্ট (Herbart) ঘোষণা করলে যে, চরিত্র গঠনই শিক্ষার চরম আদর্শ।
অধ্যাত্মবাদী ফ্রয়েবেল (Froebel)- এর মতে স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে শিশুর আত্মবিকাশ এবং তার মাধ্যমে নিজ অন্তরে আগে থেকেই বর্তমান সুপ্ত পরমাত্মার উপলব্ধি বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে দ্রষ্টার অস্তিত্বকে অনুভব করাই শিক্ষার চম লক্ষ্যবলে গণ্য করা উচিত।
❏হার্বাট স্পেনসার (Herbert Spencer) বললেন, ‘ভবিষ্যতে পরিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুতি সাধনই শিক্ষার লক্ষ্যহওয়া উচিত। ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের কাজে লাগে না এমন শিক্ষা শিক্ষাই নয়। তাঁর মতে শিক্ষা হল বাক্তিগত বিষয়। এতে রাষ্ট্র ও সমাজের খবরদারি ঠিক নয়। শিশুর কচি প্রবণতা, আগ্রহকে পূর্বের মতো অবহেলা না করে আত্মসংরক্ষণ, ভবিষ্যতে সুষ্ঠু জীবিকা অর্জন, সন্তান পালন, যোগ্য নাগরিকতা অর্জন, সুষ্ঠু অবসর বিনোদনের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ জীবন যাপনের জন্য সার্থকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তিনি আরও বললেন এর প্রতিটির জন্য বিজ্ঞানের জ্ঞান থাকা জরুরি। বলা হয়ে থাকে শিক্ষাক্ষেত্রে জীবনানুগ বিজ্ঞান শিক্ষার কথা তিনিই প্রথম বলেছেন। স্পেনসারের হাত ধরে উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান স্বীকৃতি লাভ করল।
❏বিংশ শতাব্দীর শিক্ষাধারা প্রধানত সমন্বয়ধর্মী। শিশুর ব্যক্তিসত্তার বিকাশ এবং সামাজিক আচরণ দক্ষতা অর্জনের মধ্যে একটা সামঞ্জস্যস্থাপনের চেষ্টা আধুনিক শিক্ষার এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই সমন্বয়ের চেষ্টায় ব্রতী হয়েছেন প্রয়োগবাদী আমেরিকান শিক্ষাবিদ জন ডিউই (John Dewey)। তিনি শিক্ষা ও জীবনের মধ্যে, বিদ্যালয় ও সমাজের মধ্যে ঘনিষ্ঠ। সংযোগ স্থাপনে প্রয়াসী হয়েছেন।
উত্তর- ভারতীয় দর্শন ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি এই দুই দর্শনের মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য ভিত্তিতে এই দুই দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা করা হল। সাদৃশ্য:- উভয় দর্শনের মধ্যে যেসব সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় সেগুলি হল- (iii) আত্মনিরীক্ষণঃ উভয় দর্শনে আত্মনিরীক্ষণ বা আত্মবিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সক্রেটিস যেমন বলেছিলেন, ‘Grothiscauton’ অর্থাৎ Know thyself অর্থাৎ নিজেকে জানা। তেমনি আমাদের দেশে উপনিষদের ঋষিগণ উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারন করেছিলেন ‘আত্মানম বিদ্ধি’। 2023
❏শিক্ষার লক্ষ্যসম্পর্কে এই ঐতিহাসিক আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষার লক্ষ্যযুগে যুগে দেশে দেশে বিভিন্ন শিক্ষাবিদদের দ্বারা বিভিন্ন শিক্ষাদর্শন অনুযায়ী বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। শিক্ষার বহুল প্রচলিত কয়েকটি লক্ষ্যের উল্লেখ করলে এই পরিবর্তনশীলতার ধারণাটি আরও স্পষ্ট হবে।
15.প্রশ্ন পাশ্চাত্য দর্শন ও ভারতীয় দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা করো। 12
মন সম্পর্কিত চিন্তাভাবনাঃ- উভয়প্রকার দর্শনে আত্মতত্ত্বের মনোবিশ্লেষণ যথোচিত মর্যাদা পেয়েছে। পরমাণুবাদঃ উভয় দর্শনে বস্তু বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পরমাণুবাদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।) পরিবর্তনশীলতাঃ দর্শনের উভয় শাখাতেই পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে সদর্থক মত পোষণ করা হয়েছে।) উদ্দেশ্যগতঃ উভয় দর্শন শাখার উদ্দেশ্য হল মানুষকে প্রকৃত তত্ত্বানুসন্ধানী, জিজ্ঞাসু ও মননশীল করে তোলা এবং সমন্বয়ী অধিকারী করে গড়ে তোলা। স্থানকাল ও কার্যকারণ সম্পর্কঃ দর্শনের দুটি শাখাতেই স্থান কাল ও কার্যকারণ বিষয়ক নানা সমস্যাকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছেসত্য, শিব ও সুন্দরকে প্রাধান্যঃ দর্শনের উভয় শাখাতেই সত্য, শিব ও সুন্দর (Truth, Godness and Beauty)-কে পর্যাপ্ত দেওয়া হয়েছে। জ্ঞানতত্ত্বঃ দর্শনের দুটি শাখাতেই জ্ঞানতত্ত্বকে যথেষ্ট প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। (xii) মিষ্টিকঃ উভয় দর্শনে Mysticism রহস্যবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আত্মতত্ত্ব, স্রষ্টার অস্তিত্ব সমস্ত ধ্যানধারনার উৎস হল Mysticism |
(iv) মূল্যবোধকে প্রাধান্য ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শন উভয়ে বেশ কিছু মূল্যবোধ বা value-কে প্রাধান্য দিয়েছে।
(viiiদৃষ্টিভঙ্গির
(ix)I
(x) গুরুত্ব
(xi) অর্থাৎ
(xii) জীবনের জাতেন উভয় দর্শনেই জীবনের করতেন এবং মানুষের অরয়েলকে গুরুত্ব দেওয়া হে গুঙ্গানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ উভয় দর্শনেই প্রতিটি তথ্য ও তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
(xv) স্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে প্রাধান্য। পাশ্চাত্য ও অরতীয় উভয় দর্শনে ছান্দিক পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কারণ উভয় দর্শন মনে করে চিন্তাভাবনা বস্তু জগৎ, সংস্কৃতি ইত্যাদি দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মাধ্যমে বিবর্তিত রয়েছে।
বৈসাদৃশ্যঃ ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে যেমন পূর্বোক্ত সাদৃশ্য গুলি বর্তমান, তেমনি এই দুই দর্শনের মতো দেশ কিছু বৈসাদৃশ্যও দেখা যায়। যথাঃ
(1) বৈচিত্রোর দিক থেকে:- পাশ্চাত্য দর্শনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন বৈচিত্রা দেখা যায়, প্রাচ্য দর্শনে কিন্তু সেই পরিমাণ বৈচিত্র্য দেখা যায় না।
(2) দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য:- পাশ্চাত্য দর্শনে যেখানে বহিঃজগতের বিশ্লেষণ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের রূপ প্রাধান্য পেয়েছে। সেখানে ভারতীয় দর্শনে মানুষের অন্তর্গত বিশ্লেষণ বেশী গুরুত্ব পেয়েছে।
(3)ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা:- ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার দিক থেকেও উভয় দর্শনে পার্থক্য দেখা যায়। যেমন পাশ্চাত্য দর্শন অনেক বেশী ব্যক্তি মানুষ কেন্দ্রিক, কিন্তু ভারতীয় দর্শনে ব্যক্তি মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি।
(4)যুক্তিবাদ:- পাশ্চাত্য দর্শন মানুষের যুক্তি-বুদ্ধি, বিচার-বিশ্লেষণ ইত্যাদির উপর অনেক বেশী গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে যুক্তি বিচার বিশ্লেষণকে সেই অনুযায়ী প্রাধান্য দেওয়া হয়নি।
(5)ভারতীয় দর্শন শাখা ভিত্তিকঃ ভারতীয় দর্শনে বিভিন্ন শাখা পরিলক্ষিত হয় কিন্তু পাশ্চাত্য দর্শনে সেই পরিমান শাখার অস্তিত্ব দেখা যায় না।
(6)দার্শনিক কেন্দ্রিকতা: পাশ্চাত্য দর্শন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তি দার্শনিককে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন, আমরা বলি হেগেলিও সর্বভাববাদ (Absolute Idealism) বা Lock-এর অভিজ্ঞতাবাদ কিন্তু ভারতীয় দর্শনে এই রূপ কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা দেখা যায় না। (vii) স্বাধীনতাঃ পাশ্চাত্য দর্শনে স্বাধীনতা অর্জন সাপেক্ষ কিন্তু ভারতীয় দর্শন মতে প্রতিটি ব্যক্তিই স্বরূপত স্বাধীন। (viii) জ্ঞানতত্ত্বঃ জ্ঞানতত্বকে দর্শনের উন্নয় শাখাতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেমন। পাশ্চাত্য জ্ঞান তত্ত্বে ইন্দ্রিয় বিষয় সন্নিকর্য জ্ঞানার্জনের প্রথম পদক্ষেপ বলে চিহ্নিত। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে জ্ঞানলাভপ্রক্রিয়া ইন্দ্রিয় নির্ভর। ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে মন, মনের থেকে বুদ্ধি ও বুদ্ধির উপর আত্মজ্ঞানের অধিষ্ঠান ইত্যাদি ভারতীয় দর্শনে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে।
16.- রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা বিবৃত করুন। এই প্রসঙ্গে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যউদ্দেশ্য সম্পর্কে লেখ। -11
1861 সালের ৪ মে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের জন্ম। তাঁর বিদ্যালয় ছিল প্রধানত গৃহপরিবেশ। তবুও তাঁকে কিছু সময়ের জন্য বিদ্যালয়ে যেতে হয়েছিল। সেখানে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয় তা অত্যন্ত নেতিবাচক যা সারাজীবন তিনি ভোলেন নি, আর যার প্রতিক্রিয়ার ফসল হল শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ যেমন ভাববাদী ছিলেন অপরদিকে তিনি তেমনি প্রকৃতিবাদী ছিলেন, যা তাঁর শিক্ষাচিন্তায় প্রতিপালিত হয়।
উত্তর- উনিশ শতকের অন্তিম লগ্নে যে মহামানব জ্ঞানের আলোর দীপ্তিকে জ্বালিয়ে রাখার জন্য আত্মোৎসর্গ করলেন, তিনি হলেন আমাদের জাতীয় জীবনের প্রধান জ্যোতিষ্ক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যে, শিলে, সমাজ সংস্কারে মানবজীবনের প্রতিটি অলিন্দে তার অবদান রয়েছে।
A. শিক্ষার সংজ্ঞা (Defination Education) অধীন্দ্রনাদের হতে শিক্ষা হল, বিশ্বরকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধানের খারা মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
B. শিক্ষার লক্ষ্য(Aim) তিনি সমসাময়িক গতানুগতিক শিক্ষাকে বিশেষভাবে সমালোচনা করেছেন। কারণ তার মধ্যে আমাদের দেশের রীতি-নীতি, আদর্শ, কোনো কিছুকে স্থান দেওয়া হয়নি। ভারতবর্গ চিরদিনই এইসব নৈতিক গুণাবলির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তাই রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার যে সকল লক্ষ্যের কথা বলেছেন সেগুলি হল:-
(1) ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন। রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষার লক্ষ্যহল শিশুর ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন।।
(2) ধর্মীয় ভাব জাগ্রত করা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয়ভাব জাগ্রত করা, যাতে সে পরম সত্ত্বাকে উপলব্ধি করতে পারে।
(3) নৈতিক ও চারিত্রিক বিকাশ। ভারতীয় আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক ও চারিত্রিক গুণগুলির বিকাশ সাধন করা।
(4) বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করা: রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার একটি অন্যতম লক্ষ্যহল, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করা।
(5) সামাজিক বিকাশসাধন: সামাজিক বিকাশ সাধনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে স্বার্থকভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করা।
C. পাঠ্যক্রম (Curriculum): রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষাচিন্তায় পাঠ্যক্রমের বাগক সংজ্ঞাকেই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন, পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সামনে পূর্ণ রূপটি তুলে ধরতে হবে। পাঠ্যক্রম হবে সংস্কৃতির বাহক। পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, এতে ‘মানব আত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়াছে।“ আর পাঠ্যক্রম রচনার জন্য সেইসব বিষয়কে গ্রহণ করার কথা বলেছেন, যেগুলির মধ্যে দিয়ে য় মানব সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করা সম্ভব হবে। এইজন্য তিনি তাঁর পাঠ্যক্রমের ভিতর ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সঙ্গীত, নৃত্য, পল্লি উন্নয়নমূলক কাজ এবং অন্যান্য সামাজিক কাজকে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। তিনি তিনি মাতৃভাষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন, তিনি ইংরেজি শিক্ষার বিশেষ পক্ষপাতী ছিলেন না। ভাষা শিক্ষার জন্য এবং ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতির জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘রামায়ণ ও ‘মহাভারত’-কে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন।
D. শিক্ষণ পদ্ধতি (Teaching Method): রবীন্দ্রনাথের গতানুতিক শিক্ষণ পদ্ধতিকে সমালোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ পাঠদানের ক্ষেত্রে ভ্রমণ, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, গল্পের ছলে পাঠ দান এবং প্রত্যক্ষ কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেন। তিনি বলেছেন, যে কোনো আদর্শ শিক্ষণ পদ্ধতিই তিনটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করবে। এই নীতিগুলি নিম্নরূপ-
(1)স্বাধীনতা: স্বাধীনতা বলতে রবীন্দ্রনাথ স্বেচ্ছাচারের অধিকারকে বোঝাননি। তাঁর শিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে কাজ করার। তাঁর বিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের যেমন কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনের কথা বলেছেন, তেমনি দেহ-মনের বিকাশের জন্য স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করেছেন। 200
(2)সৃজনাত্মক আত্মপ্রকাশের সুযোগ তাঁর মতে, স্বাধীনভাব থেকেই সৃজন প্রতিভার বিকাশ পাবে, এবং তার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী নিজেকে বিকশিত করবে। তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষণ পদ্ধতিতে গান্ধিজির মতো সৃজনাত্মক কাজের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
শিক্ষত শিক্ষার্থীর সম্পর্ক (Relation Between Teacher and Leamer) রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষক হবেন প্রাণবন্ত মানুষ। শিশুর মত্যে সারলা নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীর মনোবাক্যে বিচরণ করবেন। শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। এককথায় একটি অনন্দময় পরিবেশে পারস্পরিক মত বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শিক্ষার কাজ এগিয়ে চলবে।
(3) প্রকৃতির সঙ্গে সক্রিয় সংযোগঃ সবশেষে তিনি প্রভৃতি ও সমাজের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন। শিশুকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে শিক্ষা দিতে হবে এবং শিক্ষার মাধ্যমে যাতে সমাজ পরিবেশের সঙ্গে আত্মিক সূত্র স্থাপন হয় তার ব্যবস্থা করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, শিক্ষার মাধ্যমে যদি বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ না ঘটে সে শিক্ষার কোনো মূল্য নেই।
G. রবীন্দ্রনাথের ব্যবহারিক শিক্ষা (Practical Education):- রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিবাদে বিশ্বাস করলেও তিনি মূলত ছিলেন ভাববাদী। তাই তিনি স্বাভাবিকভাবে ভাবরাজ্যেই বাস করতেন, কিন্তু আশ্চর্যের কথা তাঁর চিন্তা বাস্তব জগতকে হাড়িয়ে যায়নি। শ্রীনিকেতন হল তাঁর বাস্তব শিক্ষাচিন্তার মূর্ত প্রতীক। এখানে গতানুগতিক বিষয়ের সাথে হাতের কাজ, কুটিরশিল্প, গ্রামোন্নয়নমূলক কাজ স্থান গেয়েছে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যে ব্যবহারিক দিকগুলির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তাঁর শিক্ষা ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তা হল-
F. শৃঙ্খলা (Dicipline):- রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে, শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দিলে তারা আপনা থেকে শৃঙ্খলিত হয়ে পড়বে। তবে একথাও ঠিক স্বাধীনতা কখনও স্বেচ্ছাচারে পরিণত হবে না।
(1)কর্মমুখী শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ বিশেষত কর্মমুখী শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষপাতি ছিলেন। এই ধরনের শিক্ষার প্রভাবে শিক্ষার্থীরা কর্ম জগতে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। তেমনি বৈচিত্র্যময় কর্মজগতের সংস্পর্শে এসে তারা নিজেদের যোগ্যতা ও পছন্দ অনুযায়ী বৃত্তি নির্বাচনের সুযোগ পাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে শ্রমের প্রতি মর্যাদা বোধ গড়ে উঠবে।
(2) গ্রামোন্নয়ন: গ্রামোন্নয়ন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা পরিকল্পনায় একটি বিশেষ স্থান পেয়েছে। শিক্ষার সুফল যাতে সরাসরিভাবে গ্রামবাসীরা পেতে পারে সেই উদ্দেশ্যেই তিনি শান্তিনিকেতনে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত গ্রামোন্নয়নের দিকে লক্ষ্যরেখেই রবীন্দ্রনাথ গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করেছিলেন।
(3) অর্থনৈতিক উন্নয়নঃ তিনি মনে করতেন শিক্ষায় শুধু বৌদ্ধিক চর্চারই স্থান থাকবে না, তার সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নকেও জাগিয়ে দিতে হবে।
❏বিশ্বভারতী: তাঁর নিজের শৈশব রবীন্দ্রনাথ গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধিতা চিরদিন করে গেছেন। অভিজ্ঞতা থেকে এই ধারণা তাঁর মনে দৃঢ়বদ্ধ হয়েছিল। তাই তাঁর শিক্ষাচিন্তাকে প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োগ করার জন্য 1901 সালে তিনি শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেছেন- “আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল যে, এখানকার এই প্রভাতের আলো, শ্যামল প্রান্তর, গাছপালা যেন শিশুদের চিত্ত স্পর্শ করতে পারে। কারণ, প্রকৃতির সাহচর্যে তরুণ চিত্তে আনন্দসঞ্চারের দরকার আছে। এই উদ্দেশ্যে আমি আকাশ আলোর অন্তশায়ী উদার প্রান্তরে এই শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেছিলুম।“ রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতীয় আশ্রমিক শিক্ষার ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে এই বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। প্রাচীন আশ্রমিক শিক্ষার সব বৈশিষ্ট্যই এর মধ্যে তিনি সংযোজিত করেছিলেন। তিনি এখানে ব্রহ্মচর্যের তপস্যার কথা বলেছেন শিক্ষার্থীদের জন্য। জীবনযাপনের রীতিতে সরল ভারতীয় জীবনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই ব্যবস্থার মধ্যে শিক্ষার্থীদের মনের উদারতা আসবে। তাই তিনি বলেছেন- আয়োজনের কিছু অভার থাকাই ভালো। অভ্যস্ত হওয়া চাই স্বল্পে......। তা ছাড়া গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি, এখানে প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে। তিনি বলেছেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়েই শিক্ষা হতে পারে। শিক্ষার্থী যেমন শ্রদ্ধার সঙ্গে জ্ঞান আহরণ করবে, তেমনি শিক্ষকও শ্রদ্ধার সঙ্গে জ্ঞান বিতরণ করবেন। তিনি বলেছেন, “শ্রদ্ধার সঙ্গে দান করলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা সম্ভব হয়। যেখানে সেই শ্রদ্ধার সম্পর্ক নেই, সেখানে আদান-প্রদানের সম্বন্ধ কলুষিত হইয়া উঠে।“
❏পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের এই বিদ্যালয়কে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয় 1921 সালে। বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যের কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন- “প্রথমে আমি শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপন করে এই উদ্দেশ্যে ছেলেদের এখানে এনেছিলুম যে বিশ্বপ্রকৃতির উদারক্ষেত্রে আমি এদের মুক্তি দেব। কিন্তু ক্রমশ আমার মনে হল যে, মানুষে মানুষে যে ভীষণ ব্যবধান আছে, তাকে অপসারিত করে মানুষকে সর্বমানবের বিরাট লোকে মুক্তি দিতে হবে। তিনি বিশ্বভারতীতে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের চেষ্টাই করেছেন। তিনি বলেছেন “যে আত্মীয়তা বিশ্বে বিস্তৃত হবার যোগ্য, সেই আত্মীয়তার আসন এখানে পাতর সম্রাবিশ্বং ভবতোকনীড়ম।‘
❏রবীন্দ্রনাথ আশ্রমিক শিক্ষার মধ্যে যেসব বৈশিষ্ট্যগুলি বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়, সেগুলি উল্লেখ করলে, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তায় শিক্ষালয়ের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণাটি উপলব্ধি করা যাবে।
[1] তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অবাধ স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেছেন। শিক্ষার্থীদের নিজেদের ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ানোর ও খেলাধুলা করার সুযোগ দেওয়া হত আশ্রম বিদ্যালয়ে। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় এক হাস্যকর কাহিনির অবতারণা করে এই স্বাধীনতার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। এক অভিজ্ঞ শিক্ষক পড়াতে এলেন এবং কয়েকদিন সব দেখেশুনে রবীন্দ্রনাথকে বললেন ছেলেরা গাছে চড়ে, চেঁচিয়ে কথা কয়, দৌড়ায়, এ তো ভালো নয়।“ রবীন্দ্রনাথ বললেন- “দেখুন, আপনার বয়সে তো কখনও তারা গাছে চড়বে না। এখন একটু চড়তে দিন না। গাছ যখন ডালপালা মেলেছে তখন সে মানুষকে ডাক দিচ্ছে। ওঁরা ওতে চড়ে থাকলেই বা।“
[2] রবীন্দ্রনাথের আশ্রম বিদ্যালয়ের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল উন্মুক্ত প্রান্তরে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে মনের চর্চা করার কথা তিনি তাঁর শিক্ষাতত্ত্বে বলেছেন এবং তাই প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োগ করেছিলেন শান্তিনিকেতনে। শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বন্ধ করে রাখার পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না।
[3] এই বিদ্যালয়ে শিশুদের সৃজনমূলক কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের সহপাঠ্যক্রমিক কাজের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নানা ধরনের উৎসব পালন করারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব হবে, এই বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের ছিল। valle
[4] এই স্থান ছিল না। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও সামর্থ্য বিচারে তা নির্ধারণ করা হত।বিদ্যালয়ে গতানুগতিক সময়তালিকার বিশেষ মানবতা বলতে কি বোঝেন। শিক্ষায় কিভাবে
17.- প্রাচীন শৃঙ্খলাবোধের ধারণা সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি? আপনি কি এটা এখনো প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন? আপনার উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দিন।
উত্তর- ‘Discipline’ শব্দটি মূলত ল্যাটিন শব্দ ‘Disciplina’ থেকে এসেছে। যার অর্থ হল শিক্ষাদান এবং প্রশিক্ষণের পরিস্থিতি। আবার অনেকের মতে ইংরেজি ‘Discipline শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘Discipulus’ থেকে এসেছে। যার অর্থ হল শিক্ষার্থী (Pupil)। অর্থাৎ, শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বলতে মূলত শিক্ষার্থীর শৃঙ্খলাকে বোঝানো হয়। শিক্ষার্থী শিক্ষকের দ্বারা নির্দেশিত পথ অনুসরণ করবে, শিক্ষালয়ের তার শিক্ষককে শ্রদ্ধা করবে, নিয়মকানুন মেনে চলবে এবং সফল জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলিগুলি নিজের মধ্যে গড়ে তুলবে।
❏অন্যমতে, শৃঙ্খলা শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Discipline’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Disciplina’ থেকে। যার অর্থ হল কিছু শেখার প্রক্রিয়া (the process of learning something)। Disciple’ বা ‘শিক্ষার্থী’ কথাটি শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। চূড়ান্তভাবে Discipline শব্দটির অর্থ হল আত্ম-চাবুকাঘাতের মাধ্যমে ব্যক্তির নিজস্ব রিপুদমন করা (Mortificaton by scourging oneself) প্রাচীনকালে শৃঙ্খলা বলতে দমন-পীড়ন শাসনব্যবস্থাকে বোঝানো হত। সেই সময় বিদ্যালয়গুলিতে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নিষ্ঠুর বা নির্যাতনমূলক কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল যা কমেনিয়াস (Comenius), রজার (Roger) প্রমুখ মনীষীরা তীব্র প্রতিবাদ করেন। তারা স্বাধীনতার আনন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ততার ভেতর দিয়ে শৃঙ্খলা রক্ষার কথা বলেন।
❏আমি এখনও এই ধারণাকে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি না তার কারণ হল:-. এখানে শিক্ষকদের ধারণা ছিল শান্তি না দিলে শিক্ষার্থীরা খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাবিদগণ এই প্রকার শৃঙ্খলা বিরোধী ছিলেন। সেই কারণে প্রাচীন শৃঙ্খলাবোধের ধারণ্য প্রাসঙ্গিক নয়।)
1.এক্ষেত্রে ব্যক্তি বা শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তার মধ্যে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হয়।
2.কারণ প্রাচীন ধারণা অনুযায়ী শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ নেতিবাচক ছিল। কিন্তু আধুনিক ধারণা অনুযায়ী শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ। তাই প্রাচীন শৃঙ্খলাবোধের ধারণার প্রাসঙ্গিকতা হৰাস পাই।
3.পুরাতন ধারণায় মনে করা হয় শৃঙ্খলা আছে দমন-পীড়ন ও শাস্তির মাধ্যমে। নয়া আধুনিক সমাজে অপ্রাসঙ্গিক।
মডিউল-২ (শিক্ষার ইতিহাস)
18x1=18 যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও
যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও
1.- ব্রাহ্মণ শিক্ষার বৈশিষ্ট্য গুলি বর্ণনা করো। 12x2-24
Ans:- ব্রাহ্মহ্মণ্য শিক্ষা ছিল বৈদিক শিক্ষার একটু উন্নত রূপ। এই শিক্ষার সঙ্গে জীবনের যোগ ছিল ঘনিষ্ঠ। নীচে ব্রাহ্মণ্য যুগের শিক্ষার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হল-
1) ধর্মভিত্তিক শিক্ষা: ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এই শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মের মাধ্যমে সামাজিক রীতিনীতি, ন্যায়-অন্যায় প্রভৃতি বিষয় শিক্ষার্থীদের শেখানো হত।
(2) চরিত্রগঠন: ব্রাহ্মণ্য শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হত। শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান, ন্যায়নীতি, সততা, ধৈর্য, কর্মদক্ষতা প্রভৃতি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হত। 2023
(3) ব্যক্তিত্বের বিকাশ: ব্রাহ্মণ্য যুগের শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ববিকাশের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হত। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সুব্যক্তিত্বের অধিকারী করে গড়ে তোলাই ছিল এই শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য।
(4) আত্মনিয়ন্ত্রণ: ব্রাহ্মণ্য শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের গুরুগৃহে দীনদরিদ্রের জীবন কাটাতে হত, বিভিন্ন ধরনের ভোগদ্রব্য বর্জন করতে হত। আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গুরুর কাছে তারা প্রকৃত জীবনের অর্থ উপলব্ধি করত।
(5) সামাজিক বিকাশ: শিক্ষা শেষে সমাজজীবনে ফিরে শিক্ষার্থী যাতে গৃহ ও সমাজজীবনের বিভিন্ন সমস্যার সঠিকভাবে সমাধান করতে পারে, সেজন্য গুরুগৃহে সামাজিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
(6) নৈতিক বিকাশ: ব্রাহ্মণ্য শিক্ষায় নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হত। সততা, ন্যায়, ধৈর্য প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হত।
(7) বিশ্লেষণ ক্ষমতার বিকাশ: ব্রাহ্মণ্য তিব্যবস্থায় আলোচনা, বিতর্ক প্রভৃতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো ।
(8) উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য:- আত্মোপলদ্ধি এবং পুনর্জন্ম থেকে মুক্তিই ছিল ব্রাহ্মণ্য যুগের শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
(9) শিক্ষারম্ভ ও শিক্ষাশেষের অনুষ্ঠান:- ব্রাহ্মণ্য যুগে শিক্ষা শুরু হত উপনয়ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আর শেষ হত সমাবর্তনের মধ্য
(10) পাঠক্রম: ব্রাহ্মণ্য যুগে পরাবিদ্যা ও অপরাবিদ্যা উভয়ই ছিল পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত।
(11) শিখন মাধ্যম: বৈদিক শিক্ষাদানে প্রধান পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হত শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন। (12) গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক: ব্রাহ্মণ্য যুগে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের সম্পর্কের মতো।
❏ সূচনাকাল: ব্রাহ্মণ্য শিক্ষায় ব্রাহ্মণরা গুরুগৃহে শিক্ষা শুরু করত আট বছর বয়সে, ক্ষত্রিয়রা এগারো বছর বয়সে এবং বৈশ্যরা বারো বছর বয়সে। প্রত্যেকের ক্ষেত্রে উপনয়নের মাধ্যমে শিক্ষার সূচনা হত। শূদ্রদের শিক্ষাধিকার ছিল না।
(13) শিক্ষাপদ্ধতি: শিক্ষাপদ্ধতি হিসেবে প্রধানত ব্যবহার হত আবৃত্তি, ভর্ত, আলোচনা ইত্যাদি।
(14) শৃঙ্খলা পরায়ণতা:- শিক্ষায় আলোচিত আদর্শ ও পদ্ধতির পরিপ্রেক্ষিতে নিয়মানুবর্তিতার কোনো সমস্যাই ছিল না। ব্রহ্মচর্যের সাহায্যে অন্তর ও বাইরে জীবনবিধি আয়ত করাই ছিল এই শিক্ষার লক্ষ্য। সুতরাং, বৈধদিক ব্রাহ্মণ্য যুগে শিক্ষা ও নিয়মানুবর্তিতা ছিল সমার্থক।
(15) অবৈতনিক শিক্ষা: ব্রাহ্মণ্য শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের থেকে কোনো প্রকার অর্থ বা বেতন গ্রহণ করা হত না। ফলে বহু দরিদ্র শিক্ষার্থী পঠনপাঠনের সুযোগ পেত।
(16) প্রাকৃতিক পরিবেশে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা:- ব্রাহ্মণা শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদেরকে প্রাকৃতিক পরিবেশে শিক্ষাদান করা হত। প্রাকৃতিক পরিবেশে পঠনপাঠন শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে খুব উপযোগী।
2- মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে হান্টার কমিশনের সুপারিশ গুলি আলোচনা করুন। আধুনিক শিক্ষায় তা কতটা প্রয়োগযোগ্য।
উত্তরঃ- হান্টার কমিশন প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি মাধ্যমিক শিক্ষার পুনর্গঠন সম্পর্কেও কতকগুলি সুপারিশ করেন। নীচে হান্টার কমিশনের কয়েকটি গুরত্বপূর্ণ সুপারিশ উল্লেখ করা হল-
(1) মাধ্যমিক শিক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি প্রচেষ্টা:
2.বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলির পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতি জেলায় সরকারি অর্থে এবং উদ্যোগে একটি করে আদর্শ বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
3.মাধ্যমিক শিক্ষার দায়িত্ব ধীরে ধীরে বেসরকারি কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার ওপর ন্যস্ত করতে হবে।
4.মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলির উন্নতির জন্য অধিক পরিমাণে সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
5.সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলির মতো বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিকেও সমান মর্যাদা দান করতে হবে।
6.অনগ্রসর অঞ্চলের জন্য সরকারি উদ্যোগে মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
7.বেসরকারি প্রচেষ্টায় যাতে আরও বেশি সংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়, তার জন্য স্থানীয় পরিচালন সমিতিগুলিকে নিজেদের বিদ্যালয়গুলিতে বেতন নির্ধারণের স্বাধীনতা দিতে হবে।
(2) পাঠক্রমে A কোর্সও B কোর্সের প্রবর্তন: কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠক্রমকে A কোর্স এবং ৪ কোর্স এই দু- ভাগে ভাগ করার সুপারিশ করেন। A কোর্সের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের প্রস্তুতির জন্য তত্ত্বমূলক শিক্ষা গ্রহণ করবে। আর ৪ কোর্সের শিক্ষার্থীরা ব্যাবহারিক বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহণ করবে। অবশ্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একই সাধারণ শিক্ষা লাভ করবে। তারপর তারা A কোর্স এবং B কোর্স গ্রহণ করবার সুযোগ পাবে। যেসব শিক্ষার্থী A কোর্স নেবে, তাদের কলেজীয় শিক্ষা পাবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রান্স পরীক্ষা হবে।
(3) নিম্নমাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষাকে স্বীকৃতিদান। কমিশন নিম্নমাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা অনুসারে ইংরেজি অথবা শিক্ষার্থীর মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যম কী হবে সে বিষয়ে হান্টার কমিশন কোনো সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেনি। এর ফলে সেখানে ইংরেজিকেই শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফলে নিম্নমাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা কোনো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষেই সম্ভবপর হয়নি।
কমিশন এ কোর্সের আশা করেছিলেন, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ও কোর্স তথা ব্যাবহারিক শিক্ষা বেছে নেবে। বাস্তবে কিন্তু তা ঘটেনি। অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রতিই আকৃষ্ট হয়েছিল।
(4) শিক্ষক-শিক্ষণ: কমিশন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্নাতক শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সরকারের কাছে এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করে। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়-শিক্ষণ বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা না থাকলে কোনো ব্যক্তিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা যাবে না। শিক্ষক নিয়োগ করার আগে, শিক্ষাতত্ত্ব ও শিক্ষগতত্ত্ব সম্পর্কে পরীক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আধুনিক শিক্ষায় তা কতটা প্রয়োগযোগ্য
(১) মাধ্যমিক স্তরে দ্বিমুখী শিক্ষার কথা বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে সাহিত্যধর্মী পাঠ্যসূচীই চালু রইল, তার সঙ্গে কিছু কারিগরী শিক্ষার ব্যবস্থা করা হল।
(২) বাস্তব ক্ষেত্রে যে উদ্দেশ্যে ‘বি’ কোর্সটির প্রবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল তা কার্যকরী হয়নি। কিছু কিছু সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নামে মাত্র একটা ‘বি কোর্স রাখা হয়েছিল।
(৩) মাধ্যমিক শিক্ষায় ভাষার মাধ্যম কি হবে, নিয়ে হান্টার কমিশনের সুপারিশ ছিল অনেকটা দ্বিধা সঙ্কোচগ্রস্ত।
(৪) এমন কি নিম্নতর মাধ্যমিক স্তরেও মাতৃভাষা যে শিক্ষার মাধ্যম হবে এ বিষয়ে কমিশনের কোন সুস্পষ্ট মন্তব্য ছিল na
(৫) মাধ্যমিক শিক্ষার আলোচনা অসম্পূর্ণ ছিল। কারণ হল, বৃত্তিশিক্ষা বিষয়ক আলোচনার অভাব। কমিশনের রিপোর্টে মাধ্যমিক শিক্ষাকে বৃত্তিমুখীন করার নির্দেশ দিয়ে তারপর বৃত্তিশিক্ষার অন্যান্য স্তরগুলি সম্বন্ধে নীরব থাকায় বৃত্তিমুখীনতা সম্পকৰীয় প্রস্তাবগুলি ব্যর্থ হতে বাধ্য ছিল।
(৬) মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে কমিশনের নূতন কথা হল শিক্ষা বিস্তারকে দ্বিধাবিভক্ত করার প্রস্তাব। এ প্রস্তাব প্রয়োজনীয় হলেও তখনকার পরিস্থিতিতে সাফল্যমণ্ডিত হতে পারেনি।
(৭) কমিশন পরিকল্পিত মাধ্যমিক শিক্ষার আর একটি বড় কথা ছিল, সরকার ও সাধারণের সহযোগিতা। এ শিক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণের প্রচেষ্টা বাড়লেও বিদেশী সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার ভাব জেগে উঠেনি।
(৮) শিক্ষার মাধ্যমরূপে মধ্যশিক্ষার স্তর পর্যন্ত অগ্রসর হতে দিলেও সম্পূর্ণ মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার আদর্শ গৃহীত হওয়ার দিন তখনও সুদূর ছিল।
3. – গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় কি? রাধাকৃষ্ণন কমিশনের গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বিশেষ সুপারিশ গুলি বিবৃত করুন।2+10
উত্তরঃ- গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়-রাধাকৃষ্ণন কমিশনের রিপোর্টে একটি বিশেষ দিক ছিল- গ্রামীণ শিক্ষা সম্বন্ধে একটি নতুন চেতনা। ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক জীবনে গ্রামের গুরুত্ব দেখিয়ে কমিশন বলেন যে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা গ্রামজীবনের সঙ্গে আদৌ সম্পৃক্ত নয়। কমিশন মনে করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলির মাধ্যমে আমাদের দেশে যে উচ্চশিক্ষা ব্যরথা প্রচলিত আছে, তা কেবলমাত্র শহরাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থরক্ষা করতে পারে এবং সমাজের বিশেষ এক শ্রেণির বিত্তবান মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারে। অন্যদিকে পল্লিময় ভারতের সামগ্রিক উন্নতি করতে হলে সর্বাগ্রে পল্লি উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দিয়ে গ্রামগুলিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে। এজন্য গ্রামাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার বিস্তার একান্তভাবে প্রয়োজন। গ্রামে কোনো সুযোগসুবিধা না থাকাতে, উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রামের মানুষ শহরে এসে ভিড় করে। ফলে কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীদের হারিয়ে গ্রামগুলি নিঃস্ব হয়ে উঠেছে। গ্রামের মানুষ যাতে গ্রামে বসবাস করতে করতেই নিম্নস্তরের শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ওর পর্যন্ত শিক্ষা পেতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন।
❏রাধাকৃষ্ণন কমিশনের গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সুপারিশ গুলি হল। গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় সংগঠন: গ্রামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক রূপটি নিম্নরূপ প্রাখমিত স্তরে ৮ বছরের বুনিয়াদি শিক্ষা। পরবর্তী ৩ বছর কলেজীয় শিক্ষা। প্রাথমিক স্তরঃ কমিশন নতুন করে প্রাথমিক স্তর সম্পর্কে আলোচনা করেননি। কারণ ইতিপুর্বেই বুনিয়াদি শিক্ষার পরিকল্পনা গৃহীত
❏সবশেষে দু-বছর উত্তর-কলেজীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা। সমস্ত স্তরেই শিক্ষা হবে গ্রামকেন্দ্রিক এবং সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকেন্দ্রিক মাধ্যমিক স্তরঃ কমিশন মাধ্যমিক স্কুলগুলিকে আবাসিক করার কথা বলেছেন এবং প্রত্যেকটি মাধ্যমিক স্কুলকে কেন্দ্র করে যাতে একটি আদর্শ পল্লি গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। এই ধরনের গ্রামের পরিকল্পনা ও সংগঠনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা আধুনিক উন্নত ধরনের গ্রাম গঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবে এবং আদর্শ জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হবে।
❏আবাসিক বিদ্যালয়ের জন্য ৩০-৬০ একর জমি নির্দিষ্ট থাকবে। এর মধ্যে বিদ্যালয় গৃহ শিক্ষকদের বাসগৃহ, খেলার মাঠ, কর্মশালা, কৃষিক্ষেত্র, পশুচারণ ক্ষেত্র, ছাত্রাবাস ইত্যাদি থাকবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০ জনের বেশি হবে না।
❏শতকরা ৫০ ভাগ আলোচনা হবে তাত্ত্বিক এবং বাকি ৫০ ভাগ হবে হাতেকলমে শিক্ষা। বিদ্যালয় এলাকাটি একটি আদর্শ পল্লির মতো পরিকল্পিত হবে।
❏কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তর। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য হবে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা শেষ হলে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা হবে। গ্রামীণ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বৈশিষ্ট্য।
❏কয়েকটি আবাসিক স্নাতক স্তরের কলেজের কেন্দ্রে থাকবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুবিধ বিষয় শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সব বিষয় শিক্ষা দেওয়া হবে যার সঙ্গে গ্রামের যোগসূত্র আছে।
❏গ্রামীণ কলেজীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পাঠক্রমে বৌদ্ধিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সার্থক সমন্বয় ঘটাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে গ্রামীণ শিল্প, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার সুযোগ থাকবে। পাঠক্রমের প্রধান বিষয়গুলি হবে দর্শন, ভাষা, সাহিত্য, পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, রসায়ন, সমাজবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, অর্থশাস্ত্র, কৃষিবিজ্ঞান ইত্যাদি। গ্রামীণ শিক্ষাব্যকথা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দ্বারা ভারাক্রান্ত হবে না।
❏গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কর্মসূচি: (১) বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকার অন্তর্গত মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজগুলির অনুমোদন দান,
(২) সম্পূর্ণ আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, ।
(৩) গ্রামীণ সমাজ-সংস্কৃতি, শিল্প এবং অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পাঠক্রম রচনা করা ।
(৪) গ্রাম্য জীবনের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা, সমাজবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার ব্যবস্থা করা হবে।
(৫) গ্রামের শিক্ষিত ব্যক্তিদের সাহায্যে গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহ করা। কমিশন উপলব্ধি করেছেন যে, বুনিয়াদি শিক্ষার পাঠ্যসূচি সাফল্যের সঙ্গে রূপায়িত করতে পারলে, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোকে সার্থক করে তোলা সহজ হবে। আর এই প্রক্রিয়ায় গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আর্থিক ব্যয়ভারও লাঘব হবে।
অর্থঃ গ্রামীণ শিক্ষা-পরিকল্পনাকে রূপ দিতে যে অর্থের প্রয়োজন, সে সম্পর্কে প্রশ্ন উঠবে। মাধ্যমিক ও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ক্ষেত্র স্বাধীন ভারতে সম্প্রসারিত হবেই। কেন্দ্রীয় সরকার কয়েকটি সুসংগঠিত গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবে। উপযুক্ত শিক্ষকদের জন্য শিক্ষক শিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। ভবিষ্যৎ ভারতের উন্নয়নের জন্য কেন্দ্র সরকারকে শিক্ষাখাতে বাজেটে ব্যয় বাড়াতে হবে, তার সঙ্গে রাজ্য সরকারকে সাহায্য করতে হবে।
উত্তরঃ- আধুনিককালে প্রথাবহির্ভূত শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হল বয়স্ক শিক্ষা। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বয়স্ক বলতে এখানে ১৪-৩৫-এর মধ্যবর্তী বয়সের বয়স্ক ব্যক্তিদের কথা বোঝানো হয়েছে। ভারতবর্ষ সহ পৃথিবীর অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এমন অনেক লোক আছে যারা নিরক্ষর। লিখতে পড়তে জানে না। প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ পায়নি। জ্ঞানের এদের কাছে রুদ্ধ। আবার পৃথিবীতে এমন অনেক লোক আছে যারা বিদ্যালয়ে বাধ্য হয়ে বা স্বেচ্ছায় সামান্যতম শিক্ষালাভ করে আর অগ্রসর হতে পারেনি।
❏কিন্তু গ্রামীণ উচ্চশিক্ষা সম্বন্ধে কমিশনের সুপারিশ খণ্ডিত করে Rural Higher Education Committee গ্রামীণ উচ্চশিক্ষার জন্য একটি স্থায়ী কমিটি গড়ার প্রস্তাব করেন। ১৯৫৬ সালে গঠিত হয় উপদেষ্টা চরিত্রের National Council of Rural Higher Education। এই কাউন্সিল গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে কয়েকটি নির্দিষ্ট
4.প্রশ্ন বয়স্ক শিক্ষা বলতে কী বোঝো? বয়স্ক শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য গুলি কি? 2+10
এরা পরবর্তীকালে কলকারখানায়, খেত-খামারের কাজে নিযুক্ত হয়েছে। সুযোগের অভাবে এদের অর্জিত বিদ্যা অকেজো হয়ে গেছে। অর্থাৎ তারা সব কিছু ভুলে গেছে। এরা প্রায় নিরক্ষরের পর্যায়ে নেমে গেছে। অথচ সামান্য নির্দেশনা বা পরামর্শ দিলে বা সামান্য অনুশীলনের সুযোগ পেলে এরা নিজের চেষ্টায় অনেক কিছু জেনে নিতে পারবে। এই সমস্ত নিরক্ষর বা স্বল্প শিক্ষিত বয়স্কদের শিক্ষাদানের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে শিক্ষাকর্মসূচি গৃহীত হয়েছে তা বয়স্ক শিক্ষা নামে পরিচিত।
Earnest Barker-এর মতে, বয়স্ক শিক্ষা হল এমন এক শিক্ষা যা আংশিক সময়ের ভিত্তিতে দেওয়া হয়, যে শিক্ষা যুগ্যভাবে সম্পন্ন হয়। যাতে একজন জীবিকা নির্বাহের সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারে।
বয়স্ক শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য গুলি কি?
বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে, গণতন্ত্রের ভিতকে দৃঢ় করতে ভারতের সব জনগণকে শিক্ষার আলো দেখাতে হবে। স্বাধীনতার পরে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে মোহনলাল সাক্সেনার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি যেসকল লক্ষ্যের কথা বলেছে তা হল
(১) আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা:- বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কাজের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তোলা এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে।
(২) কুসংস্কার দূর করা: বয়স্কশিক্ষার মাধ্যমে তাদের মনের বিভিন্ন অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করা।
(৩) পরিবার পরিকল্পনা শিক্ষা: পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।
(৪) দৈহিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিক্ষাদান: সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য বিশেষ শিক্ষাদান আবশ্যিক
(৫) সহযোগিতার মনোভাব গঠন বয়স্ক শিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ জনগণের মধ্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব গঠন করা।
(৬) গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব গঠন। গণতন্ত্রের প্রতি বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে শ্রদ্ধাশীল মনোভাব গঠন করা এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
(৭) 3R: পঠন (Reading), লিখন (Writing) ও সাধারণ গণিতের (Arithmetic) (3R) উপর অধিক জ্ঞান লাভে উৎসাহিত করা।
(৮) হস্তশিল্পে দক্ষতা অর্জন হস্তশিল্পে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বয়স্ক ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো।
(৯) শিক্ষার গতিশীলতা বজায়। শিক্ষাকে গতিশীল রাখতে গ্রন্থাগার, বিতর্ক সভা, আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন শিক্ষা কমিটিগুলোর সাহায্য নিতে হবে।
(১০) সহযোগী মনোভাব তৈরি শিক্ষার মাধ্যমে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগী মনোভাব তৈরি হবে। সহযোগী জ্ঞানই গ্রহণীয় ও বর্জনীয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায়। স্বর্গের পথ আলোকিত করে।
(১১) ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া: ভারতের ইতিহাস, ভূগোল, কৃষি, বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব গঠন করা।
(১২) সংস্কৃতির উন্নয়ন বয়স্ক ব্যক্তিদের গান, আবৃত্তি, নৃত্য, নাটক প্রভৃতির মাধ্যমে আনন্দ দেওয়া ও সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটানো।
(১৩) নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ বয়স্ক ব্যক্তিদের বিভিন্ন আলোচনা, পড়া ও লেখার মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। প্রশ্ন ইসলামী শিক্ষার লক্ষ্য, স্তর সমূহ এবং পাঠক্রম বর্ণনা করুন। for 4
আরবি ভাষায় ইসলাম বলতে বোঝায় আনুগত্য ও দাসত্ব। আল্লাহ র প্রতি আনুগত্য ও দাসত্ব স্বীকার করে নেওয়া এই ধর্মের লক্ষ্যবলে এর নাম হয়েছে ইসলাম। ইসলাম শব্দটি ‘আসলাম’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত। যার অর্থ হল শান্তি। ইসলামের অনুসরণকারীদের বলা হয় মুসলমান যারা ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। ঈশ্বরের সঙ্গে শান্তি স্থাপন (peace with God) করার অর্থ হল মানুষের সেবা করা। ইসলামে নির্জাস হল শান্তি, ইসলাম শান্তির ধর্ম। কোরান ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ বা হলিবুক মনে করা হয়। কোরানে ৪০ (চল্লিশ) হাজারেরও বেশি শব্দ অন্তর্গত। ‘কুর (Qur) মানে পড়া এবং “অন’ (an) মানে সবসময়। অর্থাৎ কোরান সবসময় পড়তে হবে।
পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্ম বিশ্বাসগুলির মধ্যে ইসলাম নবীনতম ধর্ম। খ্রিস্ট জন্মের 600 বছর পর ইসলামের আবির্ভাব। হজরত মহমম্মদ ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ইসলামের প্রফেট। 570 খ্রিস্টাব্দে প্রফেট মহমাদ বর্তমান সৌদি আরবের মক্কায় জন্যগ্রহণ করেন। ইসলামি দর্শনের লক্ষ্য (Aims of Islamic Philosophy): ইসলামি দর্শনে সত্যকে জানার একমাত্র উপায় হল
জ্ঞানার্জন ও তার প্রসারণ- The acquisition of ‘ilm’ (Knowledge) is the only road to the apprehension of truth। তাই জ্ঞান আহরণকে ইসলাম দর্শনে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যদ্রষ্টা মোহম্মদ বলেছেন-জ্ঞান আহরণ কর, কারণ ঈশ্বরের পথে যিনি জ্ঞান আহরণ করেন তিনি পুণ্যের কাজ করেন। যিনি জ্ঞানের কথা বলেন, তিনিও ঈশ্বরের গুণগান করেন। যিনি জ্ঞান অন্বেষণ করেন, তিনি ঈশ্বরের সেবা করেন।
❏জ্ঞানের শক্তিতেই ঈশ্বরের সেবক মহত্ত্বের শীর্ষে পৌঁছোয়—পরজগতে পরম শান্তি লাভ করে।
একটি ইমারত যেমন কতগুলি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে তেমনি ইসলামিক দর্শনের ইমারত পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই স্তন্তগুলি ভেঙে দিলে ইসলামিক দর্শনের ইমারতই ধ্বংস হয়ে যাবে। আসলে ইসলামের বুনিয়াদ পাঁচটি বিশ্বাসের উপর স্থাপিত, তা হল
❏স্তরসমূহ:-
1) কালেমা (Kalema) 2)নামাজ (নামাজ) 3)রোজা (Roza) 4)হজ (Haj) 5)জাকাত (Jakat :-কুরআন-এ এই পাঁচটি বিশ্বাসকে ফরজ (Forz) বা অবশ্য কর্তব্য অথবা আল্লাহর পাঁচটি অনুশাসন বলা হয়।
1)কালেমা: ইসলামি জীবনের প্রধান ঝন্ত তালেমা। কালেমা পড়েই মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাসকে পরিপূর্ণ করে তুলতে হবে। ইসলাম মতাদর্শে কোনো ব্যক্তি কালেমাতে সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস না করলে তাকে মুসলমান বলা যাবে না। কালেমার অন্তর্ভুক্ত হল-কালেমা তাইব, কালেমা শাহাদাত, কালেমা তৌহিক, কালেমা তামজিদ, কালেমা রোদ্দেকোফর।
2)নামাজ:- দ্বিতীয় ফরজ নামাজের নির্জাস হল ভক্তি আর আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ। নামাজের প্রধান লক্ষ্যহল আল্লাহর পরিসমাপ্তি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনার বিষয় হল
3) রোজা: ইসলামের তৃতীয় ফরজ রোজা। রমজান মাস হল আত্মার শুদ্ধিকরণের জন্য বার্ষিক প্রশিক্ষণ কোর্স। যে এই কোর্সটি সম্পন্ন করে, আকার এবং সততার সঙ্গে সে স্বর্গরাজ্যে সদস্য হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। বছরে এক মাস উপবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
4) হজ (Haj):- হজ ইসলামের চতুর্থ স্তন্ত হল হজ। এটি চতুর্থ ফরজ। কাবাশরিফ প্রদক্ষিণ করাকে হজ বলা হয়। হজ এই শিক্ষা দেয় যে।আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা ও ভক্তির প্রকাশ।
5) আল্লাহর উপর মানুষের নির্ভরশীলতা।
নামাজ অনুযায়ী মানুষকে পাপ চিন্তা ও পাপকর্ম থেকে বিরত রাখে।
6)জাকাত ইসলামের পঞ্চম অনুশাসন জাকাত। ধনীশালী লোকদের সম্পদের শতকরা আড়াই ভাগ ঈদের আগে দান বিতরণ করাকেই জাকাত বলা হয়। জাকাতের প্রধান লক্ষ্যদরিদ্র এবং সর্বহারাদের সাহায্যের জন্য ধনীশীলদের সম্পদ বণ্টন করা। মানবজাতির হিতের জন্য পৌরনীতি, সামাজিক ও আর্থিক ভিত্তি হল জাকাত। জাকাত মুসলমানদের জন্য কোরবানি ও আত্মত্যাগের শক্তি সৃষ্টি করে এবং কৃপণতা, স্বার্থপরতা ও সম্পদের পূজার দোষগুলি দূর করে দেয়।
ইসলামি দর্শনে পাঠক্রম (Curriculum in Islamic Philosophy) ইসলামিক শিক্ষা মক্তব ও মাদ্রাসায় সংগঠিত করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মক্তব এবং উচ্চশিক্ষার জন্য মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়। এই বিদ্যালয়গুলি গৃহস্থ বাড়িতে, মসজিদে ভূস্বামী বা অভিজাতদের দানে পরিচালিত হত।
ধর্ম নিয়ন্ত্রিত ইসলামিক শিক্ষায় ধর্মশিক্ষা ছিল আবশ্যিক। আরবি ছিল অবশ্য পাঠ্য। আবুল ফজলের বর্ণনা অনুসারে ঐশ্লামিক পাঠ্য বিষয়গুলি ছিল তিন ধরনের-
1.ইলাহি অর্থাৎ ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধীয়
2.বিয়াজ অর্থাৎ গণিত জ্যোতির্বিজ্ঞান, সংগীত, চিকিৎসা; এবং
3.তাবিকি অর্থাৎ প্রকৃতিবিজ্ঞান।
❏মক্তবে বিদ্যার্থীদের পঠনপাঠন লিখন এবং প্রাথমিক গণিত শিক্ষা দেওয়া হত। শিক্ষা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে পঠনপাঠনের (Reading) উপরে বেশি গুরুত্ব ওয়া হত।মক্তবে বিদ্যার্থীদের কোরানের আয়াতাস (Ayats) সস্মরণ করা বাধ্যতামূলক ছিল। এ ছাড়া আরবি, পারসিকাখা এবং ধর্মশাস্ত্র (Scripts) কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
❏মাদ্রাসাতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা দেওয়া হত। মাদ্রাসাতে ধর্মতত্ত্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়গুলি পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ধর্মতত্ত্ব সংক্রান্ত শিক্ষার বিষয়গুলি ছিল-ভোরাদ শিক্ষা, মোহম্যদের উপদেশাবলি (Preachings), অনুশাসনগুলি (Commandments), ইসলামি আইন ও ইতিহাস।
Ans:- ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজি শিক্ষা, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা এবং নারীশিক্ষা প্রসার ও উন্নয়নের জন্য ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ ইশ্য ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক গঠিত বোর্ড অব কন্ট্রোল-এর স্যার চার্লস উড একটি শিক্ষাপ্রস্তাব প্রণয়ন করেন ও তা সরকারের কাছে উপস্থাপন করেন; চার্লস উড়ের নাম অনুসারে এই শিক্ষা প্রস্তাবকে বলা হয় ‘উডের শিক্ষাপ্রস্তাব বা উডের ডেসপ্যাচ’। উডের ডেসপ্যাচের মূল বক্তব্য ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং মূল লক্ষ্যছিল ভারতে ইংরেজি ও নারী শিক্ষার উন্নয়ন। উডের ডেসপ্যাচ রচনায় সদস্য ছিলেন মাত্র ১ জন, অর্থাৎ চার্লস উড নিজেই। 2023
ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল আরবি সাহিত্য, ব্যাকরণ, ইতিহাস, দর্শন, গণিত, ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও কৃষিবিদ্যা।
5. মানবতার আদর্শ প্রয়োগ হতে পারে? 2+10-
উত্তর- মানবতা হচ্ছে- মানুষের ধর্ম। মানবতা হচ্ছে মানুষের বৈশিষ্ট। মানুষের জন্য ভালবাসা, মানুষের জন্য সমবেদনা, স্নেহ মমতার নামই মানবতা। নিঃস্বার্থভাবে কল্যাণকর কাজে অংশীদার হওয়ার নাম মানবতা।
❏যে-বোধে উদ্দীপ্ত হয়ে মানুষ অন্য মানুষের বা জীবের সেবা করে, তার নাম মানবতাবোধ। মানবতাবোধ মানুষের ধর্ম মানুষের গুণ। হিন্দু ধর্মে বলা হয়েছে, ঈশ্বর আত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন, তাই জীবকে ভালবাসলে ঈশ্বরকেই ভালবাসা হয়। তাই মানবতাবোধ ধর্মেরও অঙ্গ।
শিক্ষায় মানবতার আদর্শ প্রয়োগ:- মানবতাবাদ শিক্ষা তত্ত্বের সাথে জড়িত। এটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে যা সমস্তই স্ব- বাস্তবতার দিকে পরিচালিত করে। স্ব-বাস্তবায়ন হল যখন আমাদের সমস্ত চাহিদা পূরণ হয়, আমি সর্বোত্তম হয়ে ওঠেন। যদিও মাসলো এবং মানবতাবাদীরা বিশ্বাস করেন না যে বেশিরভাগ মানুষ আত্ম-বাস্তবায়নে পৌঁছেছেন, তাদের বিশ্বাস হল যে আমরা সর্বদা এটির সন্ধানে থাকি এবং আমরা যত কাছে থাকি, ততই আমরা শিখতে পারি। এই শেখার ফলে যে মানবতার আদর্শ সৃষ্টি হয় তা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। যথা-
1.শিক্ষকরা বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের শেখার লক্ষ্যনির্ধারণে সাহায্য করতে পারেন এবং তারপরে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য পথ ডিজাইন করতে সহায়তা করতে পারেন। ছাত্ররা তাদের শেখার দায়িত্বে থাকে, এবং শিক্ষকরা তাদের সঠিক পথে চালিত করতে সাহায্য করতে পারেন।
2.বিভিন্ন ধরণের সাইকোথেরাপি আবির্ভূত হয়েছে যা মানবতাবাদের নীতির মধ্যে নিহিত। এর মধ্যে রয়েছে ক্লায়েন্ট- কেন্দ্রিক থেরাপি, অস্তিত্বশীল থেরাপি, এবং Gestalt থেরাপি। 2023
3.অন্যান্য শিক্ষাবিদদের সাথে সহযোগিতা করার মাধ্যমে এই বোধ শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়।
4.শিক্ষার্থীদের নতুন জিনিস আবিষ্কার করার মাধ্যমে এই বোধ সঞ্চার হয় শিক্ষাক্ষেত্রে
5.মানবতাবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সম্প্রদায় এবং সমাজের উন্নতি। ব্যক্তিদের সুস্থ এবং সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য, এমন সমাজের বিকাশ করা যা ব্যক্তিগত মঙ্গলকে উৎসাহিত করে এবং সামাজিক সহায়তা প্রদান করে।
6. আপনি যা অর্জন করতে চান তার জন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশ করতে হবে।
7.নিজের নিজস্ব বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ বিবেচনা করতে হবে।
৪. নিজেকে এবং অন্যদের গ্রহণ করতে শিখুন
9. শুধু লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে অভিজ্ঞতা উপভোগ করার দিকে মনোনিবেশ করার মাধ্যমে মানবতাবোধ শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব
10. নতুন নতুন জিনিস শেখার এই বোধ সঞ্চার হয়। প্রত্যেকে একটি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে হবে যা মানবতাবোধ সৃষ্টি করবে। এই বোধ সহযোগিতা ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব।
দুটি প্রশ্নের উত্তরদিন। Answer any two questions briefly: শিক্ষার নৈতিক লক্ষ্যসম্পর্কে লিখুন।
এমন অভিজ্ঞতাগুলি অনুসরণ করতে হবে, যা নিজেকে আনন্দ দেয় এবং দক্ষতা বিকাশ করে
Ans:- “Aimless lite is like a rudderless ship” অর্থাৎ “লক্ষ্যহীন জীবন নোঙরহীন নৌকার ন্যায়”। শিক্ষা
যেহেতু জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া এবং জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত সেহেতু শিক্ষারও লক্ষ্যথাকা উচিত। আবার স্থান, কাল, পরিকাঠামো, অবস্থা ভেদে শিক্ষার লক্ষ্যপরিবর্তিত হয় বলে শিক্ষার লক্ষ্যএকের পরিবর্তে একাধিক। মানুষের জীবন যেমন বৈচিত্র্যময় ও পরিবর্তনশীল শিক্ষার লক্ষ্যও তেমনি সমানভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পরিবর্তনশীল।
❏শিক্ষার লক্ষ্যকে সাধারণভাবে দুটিভাগে ভাগ করা যায়-একটি হল চরমলক্ষ্যবা Ultimate aim’ অপরটি হল আপাত লক্ষ্যবা ‘Proximate aim’। প্রাচীন ভারতে শিক্ষার লক্ষ্যহিসাবে বলা হত ‘সা বিদ্যা ইয়া বিমুক্তয়ে’। অর্থাৎ ‘সেই বিদ্যা যা মানুষকে মুক্তি দেয়’। ইহা আপাত লক্ষ্যহিসাবে চিহ্নিত। অপরদিকে শিক্ষার চরম লক্ষ্যহিসাবে মনে করা হত একটি ব্যক্তির সর্বাঙ্গীণ বিকাশসাধনকে অর্থাৎ “The Ultimate aim of education is the harmonious development of all the powers of an individual.”
❏কিন্তু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার লক্ষ্যের পরিবর্তনশীলতা পরিলক্ষিত হয়। আবার শিক্ষার লক্ষ্যের অভিব্যক্তিও দেখা যায়। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশে শিক্ষার লক্ষ্যপরিবর্তিত হতে হতে আধুনিক শিক্ষার বহুমুখী লক্ষ্যের উদ্ভব হতে দেখা যায়।
(১) শিক্ষার নৈতিক লক্ষ্য- অধিকাংশ শিক্ষাবিদগণ মনে করেন যে, যথার্থ শিক্ষার প্রভাবে মানুষ নৈতিক মানসম্পন্ন হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। অর্থাৎ শিক্ষাই তাকে শেখায় উচিত অনুচিত, ন্যায় অন্যায়, সত্য মিথ্যা, ঠিক বেঠিক, সম্বন্ধে যথার্থ ধারণা লাভ করতে অর্থাৎ মানুষের নৈতিকবোধের বিকাশসাধনে সাহায্য করে শিক্ষা। শিক্ষা মানুষকে নৈতিক গুণসমৃদ্ধ করে উপযুক্ত নাগরিক হিসাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে এবং জীবনসংগ্রামে সঠিক পথের হদিশ দেখায়। সুতরাং শিক্ষার দ্বারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপযুক্ত মূল্যবোধের বিকাশসাধন করতে পারলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী কোনওপ্রকার অসুবিধার সম্মুখীন হবে না। সেইসঙ্গে শিক্ষার প্রভাবে শিক্ষার্থী সহজে ভাল ও মন্দের পৃথকীকরণে সক্ষম হবে। তার চরিত্র সুগঠিত হবে এবং সে উন্নতমানের আচরণধারার অধিকারী হবে। অর্থাৎ শিক্ষার লক্ষ্যহিসাবে নৈতিক বিকাশকে প্রাধান্য দিলে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের মূল ভিত্তি যে সুদৃঢ় হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
6.- প্রকৃতিবাদ এবং পাঠক্রম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত লিখুন।
উত্তর- ব্যক্তি মানুষের মনস্তত্ব, ব্যক্তির বৈষম্যমূলক বৈশিষ্ট্য ভাববাদী দর্শনে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। এরই প্রতিবাদ স্বরূপ জড়বাদ বা বস্তুবাদী দর্শনের উদ্ভব হয়েছে। শিক্ষাবিদ Comenious এই জড়বাদী বা বস্তুবাদী চিন্তাভাবনা শিক্ষার বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। এই ভাবনার বিবর্তনের ফলেই উদ্ভব হয়েছে প্রকৃতিবাদ বা Naturalism এর। প্রকৃতিবাদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে Rusk বলেছেন, “Naturalim is a philosophical position adapted by those who approach from purely scientific point of view.” প্রকৃতিবাদী দর্শন দ্বারা যে সমস্ত দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে রুশো ছিলেন চরমপন্থী। আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা ভাবনা ও শিক্ষা কর্মে বিভিন্নভাবে প্রকৃতির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রকৃতিবাদ ও পাঠক্রম (Curiculum) – সাধারণভাবে প্রকৃতিবাদীরা শিশু কেন্দ্রিকতার নীতিতে বিশ্বাসী। তাই পাঠক্রম রচনার ক্ষেত্রে তাদের প্রথম সিদ্ধান্ত হল পাঠক্রম হবে শিশুকেন্দ্রিক ও জীবনকেন্দ্রিক। শিশুর চাহিদা, সামর্থ্য, আগ্রহ, মনোভাব প্রভৃতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে পাঠক্রম রচিত হবে। শিশুর জীবন বিকাশের বিভিন্ন স্তরের জন্য পৃথক পৃথক পাঠক্রমের কথা বলা হয়েছে। জীবনের বিভিন্ন তরে শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে বিষয়বস্তু নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতিবাদীদের মতে, পাঠক্রম হল Instrument for the development of complete life অর্থাৎ, পরিপূর্ণ জীবন বিকাশের হাতিয়ার। প্রকৃতিবাদীরা শিশুর বর্তমান জীবনের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। তাই পাঠক্রমে সেই সমস্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন যেগুলি শিশুর ব্যাক্তিগাত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের উন্নয়নে কাজে লাগে। প্রকৃতিবাদীদের মতে, বয়ঃসন্ধিকালের (adolescence) আগে কোনো বিষয়কেন্দ্রিক (Subject Education) শিক্ষা শিশুকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তখন শুধু দৈহিক কার্যাবলি বা শরীরচর্চা, প্রকৃতিপাঠ ও ইন্ডিয় প্রশিক্ষণ প্রভৃতিদের ওপর জোর দেওয়া হবে। বিষয়কেন্দ্রিক পাঠক্রম শুরু হবে বয়ঃসন্ধিকালের পর। প্রকৃতিবাদীরা প্রকৃতিকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন এবং প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান অধিকতর কার্যকারী বলে মনে করেন। এ ছাড়া বিজ্ঞান মানুষের বাস্তব জীবনের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই প্রকৃতিবাদীরা পাঠক্রমে বিজ্ঞান (প্রকৃতিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, রসায়ন, জ্যামিতি, গণিত) চর্চায় অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রকৃতিবাদীরা ভূগোল, কৃষিবিজ্ঞান, প্রকৃতি পাঠ (Nature Study), জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়গুলি পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার স্বপক্ষে মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে ভূগোল, কৃষিকাজ, জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার জন্য পুস্তক পাঠ করার দরকার নেই। প্রকৃতি থেকে শিক্ষার্থী এই বিষয়গুলি সম্পর্কে শিক্ষাগ্রহণ করবে। প্রকৃতিবাদীগণ দৈহিক বিকাশের জন্য ব্যায়াম, খেলাধুলা, স্বাস্থ্যশিক্ষার পাশাপাশি ইন্দ্রিয় প্রশিক্ষণ (Sense training)-এর ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁরা পাঠ্যক্রমে সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসকে অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছেন, কারণ এটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক এবং অতীত অভিজ্ঞতা হল বর্তমানের অন্যতম ভিত্তি। শিশু ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞান আরোহণ করবে। কিন্তু কাব্যে অথবা সাহিত্যে হারিয়ে যাক তা তাঁরা চান না। প্রকৃতিবাদীদের মতে, আবেগ, বিনোদনমূলক, সাংস্কৃতিক বিষয় সবার শেষে পাঠক্রমে থাকবে। তাঁদের মতে পাঠক্রমে নৈতিক, আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই।
7.- ধ্যানমূলক অনুমান সম্পর্কে টীকা লিখুন।
উত্তর-অনুমান কোনও কিছুকে পর্যবেক্ষণ না করে, তার সঙ্গে অনিবার্যভাবে সম্পর্কিত কোনও চিহ্নের মাধ্যমে বস্তুটির সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার পদ্ধতিকেই অনুমান বলা হয়।
উদাহরণ: ‘পাহাড়ে আগুন জ্বলছে, কারণ ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। আর যেখানে ধোঁয়া দেখা যায়, সেখানেই আগুন আছে।‘ পাহাড়ে ধোঁয়া প্রত্যক্ষণের মাধ্যমেই পাহাড়ে আগুনের অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে চিরন্তন সম্পর্কের পূর্বর্জিত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে সহজেই এটি অনুমান করা যায়।
❏বি এন শীল বলেছেন প্রত্যক্ষণ বা প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নয়, বরং যখন কোনও চিহ্ন দেখে যান্ত্রিকভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় যে এই বস্তুটি এই গুণাবলির অধিকারী, সেই প্রক্রিয়াকেই অনুমান বলা হয়।
❏অনুমানের উপাদান: অনুমানের তিনটি পদ এবং তিনটি ধাপ আছে। পক্ষ হলো অপ্রধান পদ, সাধ্য হলো প্রধান পদ এবং সাধন হলো মধ্য পদ।
❏অনুমানের তিনটি ধাপ আছে। প্রথম ধাপে পক্ষের (পাহাড়) হেতুটি (ধোঁয়া) অনুধাবন, দ্বিতীয় ধাপে হেতু ও সাধ্যের (ধোঁয়া ও আগুনের) মধ্যে চিরন্তন সম্পর্কটির অনুসরণ এবং তৃতীয় বা শেষ ধাপে পক্ষের (পাহাড়) সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সাধ্যের (আগুন) বিষয়ে জ্ঞান অর্জন।
❏অনুমানের ভিত্তি: অনুমানের দুটি শর্ত আছে। অনুমানের ক্ষেত্রে পক্ষের (পাহাড়) সম্পর্কিত সাধ্য (আগুন) সম্বন্ধে জ্ঞান, হেতু (ধোঁয়া) সম্পর্কে আমাদের পূর্বার্জিত জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে, যা কিনা একদিকে পক্ষের সাথে যুক্ত এবং অন্যদিকে সাধ্যের সঙ্গে সদা সম্পর্কিত। অনুমান করা হয় পাহাড়ে আগুন আছে, কারণ একথা জানা যে ধোঁয় থাকলেই আগুন থাকে অতএব, এ থেকে বোঝা যায় অনুমানের দুটি শর্ত আছে। প্রথমটি হলো পক্ষ বা অপ্রধান পদের (পাহাড়) হেতুটি বা মধ্যা পদটি সম্পর্কে জ্ঞান। দ্বিতীয় শর্তটি হলো মধ্য ও প্রধান পদের মধ্যে অনিবাহ অনুগামিতার সম্পর্ক।
8. ফ্রয়েবেল প্রস্তাবিত উপহারও কাজ সম্পর্কে লিখুন।
অনুমাদের ন্যায়সংগত রোগকে ব্যারি বলা হয়। আমি দুই প্রকার মান ও প্রধান পদের মধ্যে একটি অপরিবর্তনীয় ও নিশের সম্পর্ক হলো ব্যাপ্তি। প্রথম শ্রেণিবিভাজন অনুযায়ী অনুমান দুই প্রকার স্বার্থানুমান এবং পরাধীনুমান।
উত্তর- ফ্রয়েবেল শিক্ষাক্ষেত্রে যে নতুন ধারণার কথা বলেন তা কিন্ডারগার্টেন নামে পরিচিত। কিন্ডারগার্টেন একটি আমীন পক্ষ, যার অর্থ হল দিও উদ্যান (children’s garden) তিনি বিশ্বাস করতেন যে বিদ্যালয় হল একটি উদ্যান, শিক্ষক হলেন মালি, আর শিক্ষার্থীরা হল চারাগাছ। বাগানের থালির ন্যায় শিক্ষক ও চারাগাছের ন্যায় শিক্ষার্থীদের বড় হয়ে ওঠার জন্য যাবতীয় ব্যাবস্থা করেন। কিন্ডারগার্টেনের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
(iv) উপহার ও বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষা:- ফ্রয়েবেল শিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত বস্তুগুলির নাম দিয়েছেন উপহার এবং কাজগুলির নাম দিয়েছেন বৃত্তি। বস্তুগুলির মাধ্যমে তিনি জগতের নিয়মকানুন সাংকেতিকভাবে শিশুর কাছে পরিবেশন করতে চেয়েছেন।
উপহার-১: এই প্রকার উপহারে ছয় রঙের উলের গোলা যার মধ্যে তিনটি প্রাথমিক রং লাল, নীল ও হলুন এবং গৌণ রং কমলা, সবুজ ও বেগুনী। শিশুদের বৃত্তি বা কাজ হল উলের গোলাগুলিকে খেলাচ্ছলে ঘোরানো, পাকানো। এর ফলে শিশু বং, দ্রব্য, গতি, দিক ও ইন্দ্রিয় সঞ্চালন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে।
(৪) উপহার ও পেশা :-শিশুদের যথার্থ সক্রিয় করে তোলার জন্য ফ্রয়েবেল তাদের বেশ কিছু উপহার প্রদানের প্রস্তাব করেন। আর বৃত্তি বা পেশা হল উপহার অনুযায়ী তাদের সক্রিয়তা। ফ্রয়েবেল সাত প্রকার উপহারের কথা বলেছেন।
উপহার-২: এক্ষেত্রে উপহার হিসাবে কাঠের গোলক, ঘনক, বেলন ইত্যাদিকে বোঝানো হয়। শিশু এগুলি নিয়ে খেলতে খেলতে জাড়া ও গতিজাড্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে।
উপহার-৩: এটি হল একটি বড় ঘনক যেটি আটটি ছোট ঘনকের সমন্বয়ে গঠিত। এটি থেকে সে দরজা, জানালা, সেতু সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করবে। শিশু এখান থেকে যোগ, বিয়োগ সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানলাভ করতে সক্ষম হবে। বড় ঘনক ঘোট আটটি প্রিজমের।
উপহার-৪ এই উপহার হল একটি সমন্বয়ে গঠিত। ইহা শিশুকে বিভিন্ন আকৃতির গৃহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে সাহায্য করবে। -৩ এর ন্যায়। এটি হল একটি বড় ঘনক
উপহার-৫ ইহা অনেকটা উপহারযেটি ২৭টি ছোট ঘনকের সমন্বয়ে গঠিত। এক্ষেত্রে শিশু উপহার-৩, উপহারও এবং উপহার-৫ এর সাহায্যে বিভিন্ন সুন্দর আকৃতি তৈরী করতে সক্ষম হবে।
উপহার-৬: এটি অনেকটা উপহার-৪ এর অনুরূপ। এটি হল একটি বড় ঘনক যেটি সম্পূর্ণ ১৮টি এবং ৯টি ছোট ব্লকের সমন্বয়ে তৈরি। ইহা শিশুকে সংখ্যা শিখতে সাহায্য করবে।
9- আধুনিক সময়েও শিক্ষার ভাববাদী লক্ষ্যগুরুত্বপূর্ণ কেন।
উত্তর- ভাববাদ শিক্ষার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগ উভয় দিকের উপর প্রভাব বিস্তার করে। ভাববাদী শিক্ষা দার্শনিকরা মনে করেন শিক্ষার প্রধান লক্ষ্যহল আত্ম উপলব্ধি (Self Realization) করা। শিক্ষা শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকে শিক্ষা দিতে হবে, তবেই সমাজের উন্নতি হবে। ভাববাদী শিক্ষাদর্শন ব্যক্তির বিকাশের সাথে সাথে সমাজের কল্যাণের উপর সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে শিক্ষার লক্ষ্যহবে এই চরম আদর্শকে (Absolute Ideal) লাভ করা। যে আদর্শ হল স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নীতি সম্পন্ন। তাই ভাববাদীদের মতে শিক্ষার লক্ষ্যগুলি হল ভাববাদ ও শিক্ষার লক্ষ্য। ভাববাদ শিক্ষার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগ উভয় দিকের উপর প্রভাব বিস্তার করে।
ভাববামী শিক্ষা দার্শনিকরা মনে করেন শিক্ষার প্রধান লক্ষ্যহল আত্ম উপলব্ধি (Self Realization) করা। শিক্ষা শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকে শিক্ষা দিতে হবে, তবেই সমাজের উন্নতি হবে। ভাববাদী শিক্ষাদর্শন ব্যক্তির বিকাশের সাথে সাথে সমাজের কল্যাণের উপর সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে শিক্ষার লক্ষ্যহবে এই চরম আদর্শকে (Absolute ideall লাভ করা। যে আদর্শ হল স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নীতি সম্পন্ন। তাই ভাববাদীদের মতে শিক্ষার লক্ষ্যগুলি হল-
উন্নতি- মানুষ উন্নত কৃষ্টির ষ্টো। কৃষ্টির উন্নতি সাধন শিক্ষার বারাই সম্ভব। গণত আদর্শ গঠন সম্পর্কে কয়েকটি দিকের উল্লেখ করা হলো-
1.আত্মপলব্ধি-শুদ্ধ জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের দ্বারা এই আত্মউপলব্ধি হয়ে থাকে।
2. ব্যক্তিত্বের উন্নতি সাধন মানুষের জীবন দুর্লভ ও মূল্যবান। এটি ঈশ্বরের সৃষ্টি। তাই ব্যক্তির আত্মবিকাশ সাধনই হল প্রধান কর্তব্য।
3.সার্বজনীন শিক্ষা প্রত্যেকটা মানুষই ঈশ্বরের সন্তান। তাই সমাজের প্রত্যেকটা মানুষের জন্য শিক্ষা চাই। তবেই সমাজের উন্নতি সম্ভব।–
4.নৈতিক বোধের উন্মেষ নৈতিক বোধ আমাদের ভালো-মন্দ বিচার করতে শেখায়। শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর মধ্যে নৈতিক চেতনা সৃষ্টি করতে হবে। যাতে তারা খারাপ বিষয় ত্যাগ করে ভালোবিষয় গ্রহণ করতে পারে।
5. সৃজনশক্তির বিকাশ-কোন জীবই পরিবেশকে নিষ্ক্রিয় ভাবে গ্রহণ করেনা। মানুষ তার প্রয়োজনে পরিবেশকে নিজের সৃজনীশক্তি দিয়ে পরিবর্তিত করতে পারে। তাই নতুন আবিষ্কার ও সৃজনীশক্তির বিকাশ হল শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য।
6. কৃষ্টির
10- শিক্ষার গণতান্ত্রিক আদর্শ সম্পর্কে টীকা লিখুন। Write a note on democratic ideals of education. –
উত্তর- প্রাচীন গ্রিসের নগর-রাষ্ট্রগুলি ছিল গণতন্ত্রের ধারণার উৎসস্থল। গণতন্ত্রের গ্রিক প্রতিশব্দের অর্থ ছিল এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে জনগণ শাসনকার্য চালাত। ভারতে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দে মানুষের সৌভ্রাতৃত্ব বোধই ছিল আর্য গণতন্ত্রের ভিত্তি।
❏ ব্যুৎপত্তিগত ভাবে গণতন্ত্র Democracy শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে ‘ডিমোস’ এবং ‘ক্রেটিয়া’। প্রথমটির অর্থ জনগণ এবং দ্বিতীয় শব্দটির অর্থ ক্ষমতা। অতএব গণতন্ত্র হলো জনগণের ক্ষমতা। কিন্তু আধুনিক যুগে গণতন্ত্র শুধুমাত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে বোঝায় না, বরং একটি নির্দিষ্ট জীবনধারাকে বোঝায়। প্রতিটি ব্যক্তির মর্যাদা এবং সমাজের জন্য সদস্যদের সঙ্গে তার স্বেচ্ছায় জীবন ভাগ করে নেওয়ার প্রতি বিশ্বাস রেখেই গণতন্ত্রের ধারণা গড়ে উঠেছে।
❏ন্যায়:- শিক্ষাক্ষেত্রে ন্যায় বলতে বোঝায়, প্রতিটি ব্যক্তি শিক্ষার মাধ্যমে উন্নয়ন, বিকাশ ও প্রগতির সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। এর ফলে সে আমাদের সংবিধানে গৃহীত ধারণাসমূহের মূল নীতিগুলিকে অনুধাবন করতে পারবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ন্যায় দানের জন্য দেশের যে কোনও নাগরিকের সন্তানদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার উন্মুক্ত রাখতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অবস্থান, সমাজ, জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে কোনও রকম বৈষম্য করা চলবে না।
❏শিক্ষাক্ষেত্রে মুক্তি বা স্বাধীনতা প্রাচীন শিক্ষাবিদ পেস্তালৎসি শিক্ষার লক্ষ্যহিসেবে নির্ভরতা থেকে মুক্তি এবং আত্মনির্ভরতা অর্জনের কথাই বুঝিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, মানুষকে মুক্ত করা প্রয়োজন এবং শিক্ষায় উদ্দীপনা জোগানোর মাধ্যমে তার মধ্যে স্বনির্ভরতার বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট পরিমাণে শিক্ষাগত স্বাধীনতা দিতে হবে। বাইরের যে সমস্ত প্রভাব তাদের সত্যদর্শন বা সত্যবাদিতার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, সেগুলি থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত করতে হবে। শিক্ষা কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের তাদের স্বাধীনতাকে ব্যবহার করতে উৎসাহিত করবে।
❏শিক্ষাক্ষেত্রে সাম্য: শিশুর অন্তনিহিত ক্ষমতা বা সামর্থোর সার্বিক বিকাশ ঘটানোর জন্য তাকে যথেষ্ট পরিমাণ সুযোগ- সুবিধা দেওয়া আবশ্যিক। এই উদ্দেশপূরণের জন্য শিক্ষাগত সুযোগ-সুবিধার সমতা অত্যন্ত প্রয়োজন। ব্যক্তিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাগত বিকাশের জন্য পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে প্রত্যেকের শিক্ষার গুণগত মানের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ১৯৬৬ সালের শিক্ষা কমিশন যথাযথ ভাবেই উল্লেখ করেছে। ‘শিক্ষার অন্যতম সামাজিক লক্ষ্যহলো অনগ্রসর বা পশ্চাদপদ শ্রেণি বা ব্যক্তিদের অবস্থার উন্নতির উদ্দেশ্যে শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানো।
❏শিক্ষাক্ষেত্রে সৌভ্রাতৃত্ব বোধ বা মৈত্রী কোনও দেশের প্রতিটি ব্যক্তি একই জাতীয়তার অংশীদার। এই অর্থে তারা সকলেই পরস্পরের ভাই বা বোন। তাই তাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনও জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা লিঙ্গের ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। সৌভ্রাতৃত্ব বোধ জনগণের মধ্যে সংহতি বা সমন্বয় গড়ে তোলে।
❏সর্বজনীন সৌভ্রাতৃত্ব গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে এর মৌলিক তাৎপর্য বর্তমান। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং এমনকি অ-শিক্ষক কর্মীবৃন্দের মধ্যে ভালোবাসা, সহানুভূতি, বোঝাপড়া এবং স্বজন বোধের বন্ধন থাকা প্রয়োজন। শিক্ষার মাধ্যমে দেশের ভাবী নাগরিকদের মধ্যে ‘আমরা’ বোধ এবং জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে।
11. শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তর্জাতিকতাবাদের বিকাশ ঘটাতে শিক্ষা কি ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে?
উত্তর- আধুনিক যুগে শিক্ষার ভূমিকা ব্যাপক হারে প্রসার লাভ করেছে। এই প্রসার লাভের অন্যতম একটি ক্ষেত্র হল আন্তর্জাতিকতাবোধ। যেখানে শিক্ষা গুরুত্ব সহকারে তার ইতিবাচক ভূমিকা প্রতিনিয়ত পালন করে চলেছে। এই ভূমিকাগুলির মধ্যে কিছু অন্যতম ভূমিকা সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনার চেষ্টা করা হল।
(1) আধুনিকীকরণ (Modernisation): যুগ বা কালের বা সময়ের পরিবর্তনের একটি অন্যতম হাতিয়ার হল শিক্ষা। কারণ একমাত্র শিক্ষাই পারে সমাজকে সময় উপযোগী করে তুলতে। যার একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত হল আধুনিকীকরণ (Modernisation)। অর্থাৎ, আধুনিক যুগের সঙ্গে পরিবর্তন সাধন। এই পরিবর্তনে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, অগ্রণী ভূমিকা পালন করে শিক্ষা।
(2) পাশ্চাত্যকরণ (Westermisation): আন্তর্জাতিকতার অন্যতম একটি করতে প্রয়োজন শিক্ষার। অর্থাৎ শিক্ষার মাধ্যমেই পাশ্চাত্যকরণ ঘটবে এবং কর্ম উপাদান হল পাশ্চাত্যকরণ। পাশ্চাত্যের ভাবধারাকে গ্রহণ পাশ্চাত্যকরণ ঘটলে আন্তর্জাতিকতাবাদের লক্ষ্যসাধিত হবে।
(3)বিশ্বায়ন (Globalisation): বিশ্বায়ন হল আন্তর্জাতিকতাবাদের মূল উপাদান। সেখানে ‘I feeling’, ‘We feeling’ ছাড়া ‘Universal feeling গুরুত্ব পায়। বিশ্বজুড়ে সকল রাষ্ট্রের মধ্যে দ্রব্য ও সেবার আদানপ্রদান হল আন্তর্জাতিক স্তরে এই বিশ্বায়নেরই উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এখানে শিক্ষার ভূমিকা সর্বাগ্রে।
(4) নগরায়ণ (Urbanisation): আধুনিকীকরণ হোক, পাশ্চাত্যকরণ হোক, বিশ্বায়ন হোক, এদের সবকেই একটি স্থান থেকে আন্তর্জাতিক স্থানে পৌঁছোতে হয়। সেটি হল নগর। অর্থাৎ নগরায়ণ ছাড়া পাশ্চাত্যকরণ, আধুনিকীকরণ, বিশ্বায়ন কোনোটিই সম্ভব নয়। এই নগরায়ণ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত জ্ঞান ও শিক্ষা। অর্থাৎ এখানেও শিক্ষার ভূমিকা লক্ষণীয়।
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতিভাত হয় যে আন্তর্জাতিকতাবোধের উন্মেষের ক্ষেত্রেই শুধু নয়, তা বজায় রাখা এবং বিশ্বজনীন সকল বিশ্ববাসীর মধ্যে আন্তর্জাতিকতার সুফল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম।
11. উডের ডেসপ্যাচ এ উল্লেখিত Grant-in-aid, শিক্ষক শিখন এবং উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত প্রস্তাব গুলি লিখুন।- 4+4+4
উডের ডেসপ্যাচকে বলা হয় ভারতীয় শিক্ষার ‘ম্যাগনাকার্টা’ বা ‘শিক্ষা অধিকার সনদ’। উডের ডেসপ্যাচ ১৮৫৪ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, লর্ড ডালহৌসির (Lord Dalhousie) কাছে উপস্থাপন করা হয়।
❏উডের ডেসপ্যাচ গৃহীত হয় ১৮৫৪ সালের ১৯ জুলাই। এই শিক্ষাপ্রস্তাবে চার্লস উন্ড ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুষ্ঠু বিকাশের লক্ষ্যে এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৮৫৪ সালে প্রণীত ও গৃহীত হওয়া উডের ডেসপ্যাচ (Wood’s despatch) ভারতের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, এই বিষযে কোনো সন্দেহ নেই; কারণ পরবর্তীকালে ভারতের শিক্ষা ক্ষেত্রে তথা শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থানায় যত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে সবকিছুর মূলে উডের ডেসপ্যাচের কিছু না কিছু প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
❏ উচ্চশিক্ষা: ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতে উচ্চশিক্ষা পরিবেশন ও পরিচালনার জন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়নি। তাই উডের ডেসপ্যাচের দ্বিতীয় মূল্যবান প্রস্তাব ছিল ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। কাউন্সিল অব এডুকেশন (Council of Education) ১৮৪৫ সালে সর্বপ্রথম ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু সেই প্রস্তাব তখন অগ্রাহ্য করা হয়। তাই উডের ডেসপ্যাচে প্রস্তাব করা হয় যে, ভারতবর্ষে কলকাতা, বোম্বে, ও মাদ্রাজের স্থানে যেখানে যেখানে যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে সেখানে সেখানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় (University of London)-এর অনুকরণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা:- সার্থক শিক্ষাদানের জন্য যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের একান্ত অভাব সম্বন্ধেও চার্লস উডের ডেসপ্যাচে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়। সার্থক শিক্ষাদানের উপযোগী শিক্ষক প্রস্তুত করার জন্য উডের ডেসপ্যাচে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষকদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করে দক্ষতা বৃদ্ধির পাঁচ প্রদেশে বিভিন্ন ধরনের ‘নর্মাল স্কুল’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণার্থীদের বৃত্তির ব্যবস্থার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ডেসপ্যাচ অনুযায়ী প্রশিক্ষণ শেষে সনদ প্রদান এবং চাকুরীতে নিয়োগদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। উল্লেখ্য, উডের ডেসপ্যাচ বাস্তবায়ন ধারাবাহিকতায় ১৯০৬ সালের ৬ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ।
Grant in aid:- ভারতে ব্রিটিশ সরকারের নিম্নগামী পরিস্রবন নীতির ফলে শিক্ষার খাতে বরাদ্দ টাকার অধিকাংশই কলেজ স্থাপনার জন্য ব্যয় করা হতো; যে মারণে মাধ্যমিক শিক্ষা ভীষণভাবে অবহেলিত হয়েছিল। প্রচুর সরকারি অর্থ বায় করে এতদিন কলেজ শিক্ষার মাধ্যমে যে উচ্চশিক্ষা দিয়ে আসা হয়েছে তাতে সমাজের উচ্চস্তর থেকে আগত মুষ্টিমেয় ছাত্র উপকৃত হয়েছে। তাই উডের ডেসপ্যাচে সুপারিশ করা হয় যে, মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হোক যাতে সমাজের সকল স্তরের ছেলেমেয়োরা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় উডের ডেসপ্যাচে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের কথা বলা হলেও মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের স্বপক্ষেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের আর্থিক সমস্যার সমাধানকল্পে উডের ডেসপ্যাচ অনুদান প্রদানের সুপারিশ করে, তবে সরকারি অনুদান পাবার জন্য সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যোগ্য হবে না।
❏সরকারি অনুদান পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় উডের ডেসপ্যাচে। যেসব শর্ত পূরণ করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনুদানের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে যেসব হলো:--
❏ধর্মনিরপেক্ষভাবে সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করবে, অবশ্য যদি কোথাও ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় তা উপেক্ষা করা হবে;
❏সরকারি অনুদান বা গ্রান্ট ইন এইড (Grant in Aid) প্রথায় দেশের সকল শ্রেণির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কমবেশি উপকৃত হয়েছিল। তবে মিশনারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছিল।
স্থানীয় পরিচালনার ব্যবস্থা থাকবে,
❏সরকারি পরিদর্শনের অধিকার স্বীকার করবে ও পরিদর্শকের নির্দেশ মেনে চলবে।
❏শিক্ষার্থীদের (অভিভাবকদেয়) কাছ থেকে সামান্য বেতন নিবে।
12.- মুদালিয়ার কমিশনের প্রস্তাবিত গঠনগত সংস্কার উল্লেখ করুন। প্রযুক্তি শিক্ষার প্রস্তাব গুলি উল্লেখ করুন।-8+4
Ans:- ১৯৪৮ সালের বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের মতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পূর্বশর্ত হল মাধ্যমিক শিক্ষার পুনর্গঠন। স্বাধীনতার পর সর্বভারতীয় ভিত্তিতে মাধ্যমিক শিক্ষার সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ড প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে ব্যাপক অনুসন্ধান ও প্রচলিত ব্যবস্থার উপযোগিতা বিচারের জন্য একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন।
(১) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের স্বার্থে এবং জাতীয় স্তরে বৃত্তিমূলক চাহিদা পরিতৃপ্তির উদ্দেশ্যে কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষার সময়কাল বিস্তৃত করার সুপারিশ করে এবং এর ফলে বিদ্যালয় শিক্ষার সম্পূর্ণ সময়কাল হয় ১২ বছরের।
এই প্রস্তাব অনুসারে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. লক্ষ্মণস্বামী মুদালিয়ারের নেতৃত্বে একটি মাধ্যমিক শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় ১৯৫২ সালে। মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সবদিক বিচার করে এই কমিশন ১৯৫৩ সালে তার রিপোর্ট পেশ করে। মুদালিয়ার কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামোগত সংস্কার সাধনের জন্য নিম্নলিখিত সংস্কার সাধনের সুপারিশ করে-
(২) পরবর্তীকালে কমিশন বিদ্যালয় শিক্ষার সময়কাল স্থির করে ১১ বছরের জন্য এবং একে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করে। যথা- প্রাথমিক শিক্ষা বা নিম্ন বুনিয়াদী শিক্ষা (৫ বছরের), উচ্চ বুনিয়াদি শিক্ষা বা নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষা (৩ বছরের) এবং উচ্চতর মাধ্যমিক শিক্ষা (৩ বছরের)।
(৩) উপরোক্ত ১১ বছরের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হওয়ার পূর্বে প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষা কাঠামোর অন্তর্গত ২ বছরের ইন্টারমিডিয়েট স্তর কমিশন এক-এক বছরে (১+১) ভেঙে প্রথম বর্ষে মাধ্যমিক স্তরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং দ্বিতীয় বর্ষটিকে প্রচলিত স্নাতক স্তরের (২বছরের) সঙ্গে যুক্ত করে স্নাতক স্তরের শিক্ষাকে তিনটি বছরে ব্যাপত করেছে। অর্থাৎ, মুদালিয়র কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত মাধ্যমিক শিক্ষার সংগঠনটি হয় এইরূপ- ৫+৩+৩=১১ বছর।
(৪) কমিশন সমস্ত দশম শ্রেণির বিদ্যালয়গুলো একাদশ শ্রেণি যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত দশম শ্রেণির পর এক বছরের প্রাক- বিশ্ববিদ্যালয় কোর্সের (Pre-University Course) সুপারিশ করে। বলা হয়, দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর এক বছরের প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় বা PU স্তরে অধ্যয়ন করে তবে শিক্ষার্থীরা তিন বছরের স্নাতক স্তরে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে। ফলে মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামোটি হল নিম্নরূপ:
(৫) বৃত্তি বা পেশাগত শিক্ষার কলেজগুলিতে এক বছরের প্রাক-বৃত্তিমূলক কোর্স চালু করতে হবে।
(৬) শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের পছন্দ, আগ্রহ ও সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়, তার জন্য বহুমুখী বিদ্যালয় (Multipurpose School) স্থাপন করতে হবে।
(৭) বহুমুখী বিদ্যালয়গুলির সঙ্গে কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। শিল্পসমৃদ্ধ এলাকায় পলিটেকনিক অথবা প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি স্থাপন করতে হবে।
(৮) কমিশন প্রতিটি রাজ্য সরকারকে গ্রামীণ বিদ্যালয় স্থাপনের পরামর্শ দেয়। এ ছাড়া মহাবিদ্যালয় গুলিতে কৃষিবিদ্যা, পশু পালন, কুটির শিল্প প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য সুপারিশ করে।
(৯) মাধ্যমিক শিক্ষার কোর্স নির্ধারণ, পাঠ্যসূচি সংগঠন ইত্যাদি ক্ষেত্রে All India Council of Technical Education (AICTE)-এর মতো সংস্থা গুলোর সহযোগিতা নেওয়ার কথা বলেছেন কমিশন। এই শিক্ষার ব্যয়সংকুলানের জন্য কমিশন শিল্প শিক্ষা কর বসানোর কথা বলেছে।
(১০) শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য উপযুক্ত সংখ্যক বিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। (১১) মেয়েদের জন্য পৃথক বিদ্যালয় ও প্রয়োজনে তাদের উপযুক্ত পাঠ্য বিষয় পড়ানোর ব্যবস্থা করার কথা বলেছে। যেমন- গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা ইত্যাদি।
(১২) যেসব ব্যক্তি বদলির চাকরি করেন তাদের জন্য গ্রামাঞ্চলে আবাসিক বিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে।
(১৩) কিছু কিছু আংশিক দিবা বিদ্যালয় গড়ে তোলার সুপারিশ করে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সকাল আটটা থেকে সন্ধে পর্যন্ত কাটাবে। বিদ্যালয়গুলিতে দিনের খাবারের ব্যবস্থা থাকবে।
(১৪) ছেলেমেয়ে উভয়েই যাতে সমান সুযোগ পায় তার জন্য সহশিক্ষা স্কুলের সুপারিশ করেছে সুবিধা থাকবে। যেখানে মেয়েদের উপযুক্ত সুযোগ সুবিধা থাকবে।
(১৫) ৬-১৪ বছরের সম্পূর্ণ সময়ের শিক্ষা যারা শেষ না করেই পড়া ছেড়ে দিয়েছে তাদের জন্য আংশিক সময়ের শিক্ষার বিশেষ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিকেলে এই ধরনের শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। এই শিক্ষা হবে অবৈতনিক ও স্থানীয় বিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত।
(১৬) বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পাবলিক স্কুল স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে। বিদ্যালয়গুলো হবে স্বাবলম্বী। সরকারি অনুদান এই থেকে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। এই বিদ্যালয়গুলির শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষণ পদ্ধতি প্রচলিত বিদ্যালয় থেকে পৃথক হবে। শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ার সুযোগ পাবে এবং তাদের সরকারি বৃত্তির ব্যবস্থা থাকবে। (১৭) উচ্চতর মাধ্যমিক স্তর বা নবম দশম শ্রেণিতে কোর বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হবে তবে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে ঐচ্ছিক বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রযুক্তি শিক্ষার প্রস্তাব গুলি:
কারিগরি শিক্ষাঃ (১) বহুমুখী বিদ্যালয়ের সঙ্গে অধিক সংখ্যক কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
(২) বড়ো বড়ো শিল্প কেন্দ্রগুলির পাশাপাশি কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
(৩) বড়ো বড়ো শহরে কেন্দ্রীয় কারিগরি স্কুল স্থাপন করতে হবে।
(৪) মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষার পাঠক্রম প্রযুক্তিতে নিখিল ভারত কারিগরি শিক্ষা সংস্থার সহায়তা নিতে হবে।
13.- কোঠারি কমিশন প্রস্তাবিত শিক্ষায় 10+2+3 ধরনের বিভাজন ব্যাখ্যা করো। ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় এর সাফল্য বিচার করো।
উত্তর- শিক্ষা কমিশন তাদের প্রতিবেদনে এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, যে-কোনে May দেশের শিক্ষার মান নির্ভর করে মূলত ৪টি বিষয়ের উপর। শিক্ষার মান নির্ণায়ক এ ঐ স্তরগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক, (২) মোট শিক্ষাকাল এবং প্রত্যেকটি স্তরের জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাকাল, (৩) শিক্ষার আনুষঙ্গিক অন্যান্য অত্যাবশ্যক সহায়ক উপাদান যেমন- শিক্ষক, শিক্ষণ পদ্ধতি, পাঠক্রম, মূল্যায়ন ব্যবস্থা ইত্যাদি, (৪) প্রাপ্ত সুযোগসুবিধার পূর্ণ ব্যবহার। শিক্ষার মানের এই নির্ণায়ক বৈশিষ্ট্যগুলি পরস্পর নির্ভরশীল।
স্কুলগুলি মেধাসম্পন্ন শিক্ষা কমিশন সারা দেশের জন্য বিদ্যালয় স্তরের জন্য যে শিক্ষার কাঠামো সুপারিশ করেছেন তা হল নিম্নরূপ
1.প্রাক-বিদ্যালয় শিক্ষা (Pre-School Education): এক থেকে তিন বছর।
2.প্রাক-প্রাথমিক স্তর (Pre-Primary Education): তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা। নার্সারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা হবে এই জ্বরে। পাঁচ থেকে ছয় বছরের জন্য শিশু শ্রেণি বা Infant Class
3.7 বা 8 বছরের প্রাথমিক শিক্ষা (Primary education): প্রাথমিক শিক্ষার দুটি স্তর থাকবে-
(a) নিম্ন প্রাথমিক শিক্ষা (Lower Primary): চার বা পাঁচ বছরের জন্য হবে নিম্ন প্রাথমিক শিক্ষান্তর বিদ্যার্থীদের বয়স হয় থেকে আগে থেকে নাম নথিভুক্তকরণ (Pre-registration) প্রথা প্রাথমিক স্তরে চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শিশুর বাড়ি থেকে। মাইলের মধ্যে নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং 1 থেকে ও মাইলের মধ্যে থাকবে উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাথমিক স্তরের পর 2/3 বছরের বৃত্তিশিক্ষার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
(b) উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষা (Higher Primary) 2 বা 3 বছরের জন্য হবে উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষান্তর। পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণি বা ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বয়স হবে 11 থেকে 14 বছর।
3.মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর (Secondary Stage): কোঠারি কমিশনের মতে এই স্তরে দুটি ভাগ থাকবে।
(a)নিম্ন মাধ্যমিক (Lower Secondary: 2 বা 3 বছরের হবে। কমিশন বলেছেন, নবম ও দশম শ্রেণি অথবা অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষা হবে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তর্গত। শিক্ষার্থীর বয়স হবে 14 থেকে 16 বছর।
(১) উচ্চমাধ্যমিক স্তর (Higher Secondary): 2 বছরের উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সাধারণ শিক্ষা (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি)- Higher Secondary Stage of two years of General Education, শিক্ষার্থীর বয়স হবে 16-18 বছর।
4.উচ্চশিক্ষান্তর (Higher for Education (স্নাতক) স্তর। দ্বিতীয় স্তরে থাকবে-
D ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় এর সাফল্য কোঠারি কমিশন শিক্ষার সার্থক রূপায়ণ ও উদ্দেশ্যসাধনের জন্য যে সমস্ত বিষয়গুলি উল্লেখ করেছেন সেগুলি হল
(a) তিন বছরের প্রথম ডিগ্রি
(b) তারপর দুই বছরের
❏ভারতীয় শিক্ষা কমিশনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম শিক্ষা এবং বৃত্তি ও কারিগরি শিক্ষার সমস্ত দিক (আইন ও চিকিৎসা বাদে) নিয়ে অনুসন্ধান করে শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নের সুপারিশ করা। সামগ্রিক দৃষ্টিতে শিক্ষা সংক্রান্ত নানা সমস্যাকে বিচার করে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ণয় করা হয়েছে।
❏কমিশনের বিচার্য বিষয় ছিল দেশের সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই স্বাভাবিকভাবেই কমিশনের সুপারিশসমূহ বহু ব্যাপক। কোঠারি কমিশনই প্রথম শিক্ষা কমিশন যেখানে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। আর প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে।
❏গতানুগতিক প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে বুনিয়াদি শিক্ষার সমন্বয়ের যে চেষ্টা চলছিল, কমিশন বুনিয়াদি শিক্ষার কর্মকেন্দ্রিকতাকে স্বীকৃতি দিয়ে একটিমাত্র শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলেছেন। এর ফলে প্রচলিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রুপান্তর সহজ হবে। আর প্রাথমিক স্তরে পুথিকেন্দ্রিক শিক্ষার একঘেয়েমি থেকে বিদ্যার্থী মুক্তি পাবে।
❏মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষাকাল একবছর বাড়িয়ে 12 বছরের করার কথা বলা হয়েছে। দশ বছরের শিক্ষা শেষে বহিঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। একাদশ শ্রেণি থেকে বিশেষীকরণের (Specialization) সুযোগ থাকবে।
❏প্রচলিত বহুমুখী শিক্ষায় আষ্টম শ্রেণির শিক্ষাশেষে বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিরূপ সমালোচনা অনেক হয়েছে। এই Early specialization-এর যৌক্তিকতা নিয়ে শিক্ষাবিদগণ সংশয় প্রকাশ করেছেন। দশম শ্রেণির শিক্ষা শেষে বিদ্যার্থীদের একটা বিরাট অংশ বৃত্তিশিক্ষার দিকে যাবে। যারা উচ্চশিক্ষা পেতে চায় তারা একাদশ শ্রেণির বিশেষীকরণের সুযোগ নেবে। এ ছাড়া উচ্চতর মাধ্যমিক স্তরে সাতটি শাখা বিভাগের প্রয়োজনীয়তা শিক্ষা কমিশন স্বীকার করেননি। একাদশ শ্রেণিতে বিদ্যার্থী পাঠক্রমের নির্ধারিত বিষয়সমূহ থেকে তিনটি বিষয় গ্রহণ করবে। পূর্বের শাখা বিভাগে নমনীয়তার অভাব ছিল। মিত্র বিষয় নেওয়ার সুযোগ ছিল না। কমিশন প্রস্তাবিত শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চতর মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের বিষয় নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
❏শিক্ষা কমিশন শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে বলেন। মেধাবী ছাত্রদের জন্য অগ্রবর্তী শিক্ষার (Advanced education) ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাদের ডিগ্রি কোর্স হবে চার বছরের। কমিশন Advanced Course-এর ব্যবস্থা স্কুল স্তর থেকেই প্রবর্তনের সুপারিশ করেন। একই শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অগ্রবর্তী ও সাধারণ শিক্ষামানের কথা এর পূর্বে কোনো কমিশন সুপারিশ করেননি।
❏কোঠারি কমিশনের সুপারিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে শিক্ষার প্রতি স্তরে বৃত্তি ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগদানের ব্যবস্থা। বহিঃপরীক্ষার পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ যেসব সুপারিশ করেছেন, তার ফলে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের বিরাট সুযোগ রয়েছে। 2023 এ ছাড়া, সবাই যাতে শিক্ষার সমান সুযোগ পায়, সেজন্য কমিশন কমন স্কুলের সুপারিশ করেছেন। কমন স্কুলে ধনী-দরিদ্র সবাই শিক্ষার একই সুযোগ পাবে।
❏গতানুগতিক শিক্ষাধারাকে পরিত্যাগ করে কমিশন নতুন শিক্ষার লক্ষ্যের কথা বলেন শিক্ষার্থীর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজসেবা, সহিযুতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস প্রভৃতি গুণাবলির বিকাশসাধনের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।
14. – শিক্ষার বৃত্তিমুখীকরণ বলতে কী বোঝো? বৃত্তিগত শিক্ষারক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান অবস্থা কি? 4 +8
উত্তর- শিক্ষার বৃত্তিমুখীকরণ হল, এমন এক শিক্ষা যার দ্বারা শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে বাস্তবে কাজের মাধ্যমে কোনো বিশেষ বৃত্তি সম্পর্কে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এই শিক্ষার উদাহরণগুলি যেমন- কৃষিকাজ, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ নানা শিল্পের কাজ, যন্ত্র চালানোর কাজ, বিভিন্ন ধরনের কাজ ইত্যাদি। অর্থাৎ যে শিক্ষা শিক্ষার্থীকে কোনো কাজের মাধ্যমে জীবিকা অর্জনের উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতা দান করে, তাকে বলে বৃত্তিমুখীকরন। যেমন- আইনবিদ্যা, সাংবাদিকতা, সেবামূলক বৃত্তি, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প ইত্যাদি।
❏বৃত্তিশিক্ষা হল এমন এক ধরনের শিক্ষা যার মধ্যে দিয়ে শিক্ষার্থীদের এমন কতগুলি সামর্থ্য অর্জনে সহায়তা করা হয় যাতে তারা তাদের ভবিষ্যৎ জীবিকা অর্জন ঠিক মতো করতে পারে। হার্টড্রোন-এর মতে বৃত্তিশিক্ষা এমন একটি প্রয়োজনীয় বিষয় যার অভাবে শিক্ষার্থীরা সারাজীবন অস্বস্তি ভোগ করে। আসলে বৃত্তিশিক্ষার দ্বারা ব্যক্তি সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে। বৃত্তিশিক্ষার দ্বারা স্বনির্ভর হয়ে উঠলে শিক্ষালাভ তার কাছে প্রয়োজনীয় ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। এর ফলে সে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যোগ্য দায়িত্ব পালন করার সক্ষমতা অর্জন করে।
❏বৃত্তিশিক্ষা সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞাকে এখানে উল্লেখ করা হল-
❏“বৃত্তিমূলক শিক্ষা হল কলেজ গ্রেডের নীচে শিক্ষার একটি প্রোগ্রাম যা শিক্ষার্থীকে একটি নির্দিষ্ট বাছাই করা পেশায় প্রবেশের জন্য বা নিযুক্ত কর্মীদের আপগ্রেড করার জন্য প্রস্তুত করার জন্য আয়োজিত হয়।“
❏সি.ভি. ভালো, শিক্ষার অভিধান 73-
❏“ঐতিহ্যগতভাবে বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে এমন শিক্ষা হিসাবে বোঝানো হয়েছে যা পেশা, বাণিজ্য বা চাকরির এক বা একাধিক গোষ্ঠীর জন্য যোগ্যতার নিম্ন স্তরে দক্ষ কর্মী তৈরি করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণত উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্রদান করা হয়” NWG 85. GOI।
❏অর্থাৎ সংজ্ঞাগুলি থেকে একথা স্পষ্ট যে, উচ্চ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে দক্ষ ব্যক্তি সরবরাহ করবার জন্য বৃত্তিশিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।।
❏শিশুকে ভবিষ্যৎ জীবনের উপযোগী কোন বৃত্তির জন্য প্রস্তুত করে তোলার দায়িত্ব অভিভাবক ও বিদ্যালয়কে নিতে হবে। তাই বৃত্তিশিক্ষাকে যুগোপযোগী ও শিক্ষার্থী সহায়ক করে তুলবার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রককে নীতি প্রণয়নে আরো সচেষ্ট ভূমিকা নিতে হবে।
বৃত্তিগত শিক্ষারক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান অবস্থা:-
বর্তমান চিত্র:- বর্তমানে দেশে বৃত্তিশিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের মৌলিক ধারা দু-প্রকারের প্রথাগত ও প্রথাবিমুক্ত।
প্রথাগত ধারার বিভিন্ন দিক নীচে দেওয়া হল:-
প্রতিষ্ঠান মূল শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ধারনক্ষমতা মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক দ্বারা | উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে 3% এর রুম কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত প্রকল্প | শিক্ষার্থীর, নামনথিবদ্ধকরন করে। যার লক্ষ্যমাধ্যমিক স্তরে বৃত্তিকরন। ও বিশ্ববিদ্যালয়ের IT IS (Industrial Training | মোট আসন সংখ্যা 9.54 লক্ষ। বিদ্যালয় বাইরের প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান Institutes) (Insdustrial Centres) এবং Training পরিমান 9583 টি বিদ্যালয় 2 বৎসরের 150 টি শিক্ষামূলক কোর্স পরিচালনা করে। ITI এর সংখ্যা 1997 এবং ITC-এর সংখ্যা 4909 টি। ডিপ্লোমা স্তর পলিটেকনিক MHRD দ্বারা পরিচালিত 1244 টি পলিটেকনিকে মোট আসন সংখ্যা 2.95 লক্ষ। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে AICTE অনুমোদিত মোট পলিটেকনিকের সংখ্যা 1747 টি
❏World Bank’ 2006-এর রিপোর্ট অনুসারে 15-29 বৎসর বয়সী মানুষদের মধ্যে 2% প্রথাগত ও ৪% প্রথাবিমুক্ত বৃত্তিশিক্ষার প্রশিক্ষন গ্রহন করে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রথাগত পদ্ধতিতে প্রশিক্ষনপ্রাপ্তদের মধ্যে চাকুরী না পাওয়ার সংখ্যাই বেশী। ভারতবর্ষে বৃত্তিশিক্ষার পরিসর খুব বড় নয় তার উপর ব্যবহারিক প্রয়োগেরও হার কম। World Bank – এর রিপোর্ট অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মাত্র 3% বৃত্তিশিক্ষায় প্রবেশাধিকার হয়। অর্থাৎ বৃত্তিশিক্ষায় নাম নথিবদ্ধকরন হয় 350,000 থেকে 400,000 জন শিক্ষার্থীর। পরিসংখ্যান আরো জানান দেয় প্রথম শ্রেণীতে নামনথিবদ্ধকরা শিক্ষার্থীদের মাত্র 1% শিক্ষার্থী বৃত্তিশিক্ষায় আগ্রহ দেখায়। উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে এই চিত্রটি একেবারেই আলাদা। যেমন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাশিয়ায় 60%, চীনে 55%, চিলিতে 40%, কোরিয়ার 31% বৃত্তিশিক্ষায় নাম নথিবদ্ধ করে।
❏এমনকি বর্তমানে বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছে যথা-
❏সাম্প্রতিক সরকারী উদ্যোগ 1990 সালের এপ্রিল মাসে Joint Council for Vocational Education স্থাপিত হয় জাতীয় স্তরে বৃত্তিশিক্ষানীতি ও সমন্বয়সাধনের জন্য।
❏সারাদেশে বৃত্তিশিক্ষায় প্রযুক্তিগত ও শিক্ষাগত সহযোগিতার লক্ষ্যে 1993 সালে ভোপালে Central Institute of Vocational Education গঠিত হয়।
❏উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার বৃত্তিকরনের জন্য 1998 সালে প্রকল্প গৃহীত হয়, এই প্রকল্পে 150টি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ৪০ টি বৃত্তিমূলক কোর্সকে অ্যাপ্রেন্টিস আইন বলে নোটিশ জারী করা হয়।
❏রেলওয়ে, জাহাজ ইত্যাদি মন্ত্রকের সঙ্গে সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়।
❏একাদশ পরিকল্পনায় National Skill Development Policy 2009 গৃহীত হয়।
❏CABE-এর অধীনে “National Vocational Qualification framework” গঠিত হয়।
নিচের যেকোনো দুটিতে সংক্ষিপ্ত নোট লিখুন: 4x2=8
প্রশ্ন- টীকা: গ্রামীন বিশ্ববিদ্যালয়
উত্তর- রাধাকৃষ্ণন কমিশন উপলব্ধি করেছিল যে পল্লিময় ভারতের সামগ্রিক উন্নতি করতে হলে প্রথমেই পল্লি উন্নয়নের দিকেই দৃষ্টি দিয়ে গ্রামগুলিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে উচ্চশিক্ষা বহুদিন অবহেলিত ছিল। গ্রামে সুযোগ না পেয়ে উচ্চশিক্ষার আশায় মানুষ শহরমুখী হতে থাকল। গ্রামের মানুষ যাতে গ্রামে থেকেই নিম্নস্তরের শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষালাভ করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কমিশন গ্রামীন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন। কমিশন বলেছেন যে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে প্রস্তাবিত নতুন গ্রামীন বিদ্যালয়ের কোন সংঘাত থাকবে না। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি স্থাপিত হবে গ্রামাঞ্চলের আগনিত মানুষের প্রয়োজন মেটাতে ও পল্লী জীবনের প্রাণ সঞ্চারের উদ্দেশ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন তাদের এই গ্রামীন বিশ্ববিদ্যালয় পর্বে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীন শিক্ষা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন।
অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড (Operation Blackboard)
সংগঠন:- তারা এই শিক্ষা পরিকল্পনায় শিক্ষার চারটি স্তরের উল্লেখ করেছেন প্রাথমিক স্তর থেকে আট বছরের বুনিয়াদী শিক্ষা।
❏পরবর্তী তিন বছরের উত্তরবুনিয়াদী বা মাধ্যমিক শিক্ষা। পরবর্তী তিন বছরের কলেজীয় শিক্ষা।
উত্তর- ‘অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড হল 1986 সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে গৃহীত একটি কর্ম প্রকল্প। এই প্রকল্পটি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির দৈন্যদশা দূর করবার জন্য এবং সাক্ষরতা প্রসারের কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়। এখানে ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ শব্দটিকে প্রতীক হিসাবে ধরা হয়। ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ শব্দটির দ্বারা প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাসহায়ক সবরকম উপাদানকে বোঝানো হচ্ছে।
প্রশ্ন সবশেষে উত্তরকলেজীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে এমন অনেক বিদ্যালয় আছে যেখানে ঘর নেই, শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাসহায়ক উপকরণ নেই, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি শিশুদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শৌচাগার নেই, পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। এইসব কারণে ছাত্রছাত্রীরা বিদ্যালয়ে আসে না। তাই অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড প্রকল্পের মাধ্যমে যেসব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। সেগুলি হল-
❏প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তত দুখানা বড়ো বড়ো ঘর থাকবে যেগুলি সব ঋতুতেই ব্যবহার করা চলবে।
❏ প্রাকপ্রাথমিক স্তরের শিশুদের জন্য খেলাভিত্তিক শিক্ষানীতি অনুসরণ করতে হবে।
মানচিত্র, চার্ট, ব্ল্যাকবোর্ড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাসহায়ক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।
❏অন্তত দুজন শিক্ষক প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে নিযুক্ত হবেন, যার মধ্যে একজন হবেন মহিলা, অন্যজন হবেন পুরুষ। ক্রমশ প্রতিটি শ্রেণিতে একজন করে শিক্ষক নিয়োগ করার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে পানীয় জল এবং শৌচাগারের ব্যবস্থা করতে হবে।
❏“অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড কর্মসূচির উদ্দেশ্য কেবলমাত্র বিদ্যালয়গুলিতে ব্ল্যাকবোর্ড বা শিক্ষাসহায়ক উপকরণ সরবরাহ নয়, বরং দেশের বিদ্যালয়গুলির মান উন্নয়ন করে ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করা।
❏জাতীয় শিক্ষানীতির (1986) অন্তর্গত ‘অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড’ রূপায়ন করতে গিয়ে দেখা গেছে, যে বিশ্বাসের ভিত্তিতে পরিকল্পনা তৈরী করা হয়েছিল, বাস্তবের সঙ্গে তার বিস্তর অমিল। কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষানীতি রূপায়ণের হাল সম্পর্কে একটি অগ্রগতির রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ধরে নেওয়া হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন রাজ্যের অন্তর্গত এলাকাগুলিতে যে সব প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, সেগুলির সামান্য কিছু সংস্কার করলেই এই কর্মসূচী রূপায়ণে কোন বাধা থাকবে না। অনুমানের উপর ভিত্তি করে কেন্দ্রীয় প্রকল্প রচয়িতারা প্রতি জেলায় ব্লক ভিত্তিক স্কুলগুলির কী রকম খরচ হতে পারে তার একটা খসড়া তৈরী করেন। সেই খসড়া পাশে রেখে সমীক্ষার পরে দেখা গেছে, দেশের অগ্রসর এলাকাগুলিতেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব আছে নামেই। খাতায় কলমে স্কুল থাকলেও আদতে কিছুই যে নেই সেটা ধরা পড়ে। ফলে দেখা যাচ্ছে, অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড সার্থক রূপ দেবার জন্য যে টাকার প্রয়োজন হবে বলে মনে করা হয়েছিল তা বহুগুণ বাড়াতে হবে বিশেষত বিদ্যালয় ভবনের জন্য। এই কর্মসূচীর কতকগুলি দিক আছে। যথা—সামাজিক, বস্তুগত ও মনোভাব মূলক। শিক্ষার্থীর মধ্যে উপযুক্ত মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে। এটি প্রতিফলিত করতে হবে সামাজিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে।
প্রশ্ন- সকলের জন্য শিক্ষা [ Education for All]:
লক্ষ্য: 2000 সালের এপ্রিল মাসে সেনেগালের ডাকার শহরে ওয়ার্ল্ড এডুকেশন ফোরাম ‘সকলের জন্য শিক্ষার’ একটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচি রূপায়ণের পরিকল্পনা রচনা করেন। এই সভায় আন্তর্জাতিক স্তরে সহমতের ভিত্তিতে স্থির হয় আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র ‘সকলের জন্য শিক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়নে সক্রিয় সহযোগিতা করবেন। ডাকার সম্মেলনে ৬টি মূল লক্ষ্যের কথা ঘোষিত হয়।
১. পৃথিবীর সকল শিশুদের, বিশেষত অবহেলিত শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ প্রাকৃ শৈশবকালীন প্রযত্নকে সম্প্রসারিত ও উন্নত
২. পৃথিবীর সকল শিশুদের বিশেষত বিভিন্ন স্তরের সামাজিক সংখ্যালঘু মেয়েদের ২০১৫ সালের মধ্যে উন্নতমানের প্রাথমিক শিক্ষার আঙিনায় প্রবেশ ও শিক্ষা সম্পূর্ণকরণকে সুনিশ্চিত করা।
৩. যথাযথ শিখন এবং জীবন শৈলী কর্মসূচির মাধ্যমে সকল যুব সম্প্রদায় ও বয়স্কদের শিখন চাহিদা পূরণলে সুনিশ্চিত করা।
৪. ২০১৫ সালের মধ্যে বয়স্ক বিশেষত মহিলাদের সাক্ষরতা স্তরে ৫০ শতাংশ উন্নয়ন সাধন করা এক বয়স্কদের জন্য প্রবহমান শিক্ষা ও ভিত্তি শিক্ষায় এদের শামিল করা।
অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক
৫.২০০৫ সালের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ এবং ২০১৫ সালে মধ্যে শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা। অর্জনের জন্য মেয়েদের উন্নত মানের শিক্ষায় সম্পূর্ণ এবং সমান অধিকার প্রদান করা।
৬. উন্নতমানের শিক্ষার বিভিন্ন দিক বিশেষত সাক্ষরতা, সংখ্যা গণনা এবং প্রয়োজনীয় জীবন শৈলীতে নির্ধারিত ও পরিমাপযোগ্য শিখন ফলশ্রুতির মাধ্যমে সকলের উৎকর্ষতা অর্জনকে সুনিশ্চিত করা।
প্রশ্ন- স্কুল-জট (School Complex):
উত্তর- কোঠারি কমিশনের ভূমিকাতে শিক্ষার ব্যবস্থার এক বৈপ্লবিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে (“A drastic reconstruction, almost a revolution”)। গতানুগতিকতা পরিত্যাগ করে শিক্ষা কমিশন শিক্ষার সর্বস্তরে যেসব অভিনব পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে তার মধ্যে স্কুল-জটের পরিকল্পনা অন্যতম।
স্কুল-জট গড়ে তোলার উদ্দেশ্য দুটি-(১) বিভিন্ন ধরনের স্কুলগুলির মধ্যে যে বিচ্ছন্নতা (Isolation) রয়েছে তা দূর করা এবং (২) শিক্ষা বিভাগের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে তার কিছুটা বিকেন্দ্রীকরণ করা।
❏কমিশন বিদ্যালয় শিক্ষার উন্নতিকল্পে বিদ্যালয় গুচ্ছের সুপারিশ করেন। বিদ্যালয়তুচ্ছ গড়ে উঠবে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তার পার্শ্বস্থ এলাকায় অবস্থিত। প্রাথমিক, বুনিয়াদি ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিকে নিয়ে। পাড়ার স্কুলের ধারণা থেকেই স্কুল-জোট গড়ে তোলবার কথা উঠেছে। স্কুল-জোটের ফলে স্কুলগুলির মধ্যে যে বিচ্ছিন্ন ভাব রয়েছে, তা দূর হবে। একটি বিদ্যালয় আর-একটি বিদ্যালয়কে সাহায্য করবে। এই পারস্পরিক সাহায্যের মধ্য দিয়ে এদের স্থায়িত্ববোধ বাড়বে ও ওপর থেকে এদের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত করবার পথ সুগম হবে। জেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ Unit- এর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে। স্কুল-জোট কার্যসূচি রূপায়িত হলে স্কুলগুলি শক্তিশালী হবে, সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাও আরও গতিশীল ও সজীব হয়ে উঠবে।
❏মাধ্যমিক বিদ্যালয়-গুচ্ছটি যুক্ত থাকবে পর্যায়ক্রমে মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। বিদ্যালয়-গুচ্ছের মাধ্যমে স্কুলগুলির মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তি পঠনপাঠনের মানোন্নয়ন সম্ভব হবে বলে কমিশন মনে করেন। শিক্ষক সহযোগিতা, শিক্ষা উপকরণের কার্যকারী ব্যবস্থার দ্রুত সমস্যাসমাধান ইত্যাদি নানা বিষয়ে স্কুল-জোটের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলি পারস্পরিক সহযোগিতা সৃষ্টি করতে পারবে। বাছাই করা বিদ্যালয়-গুচ্ছের নতুন পাঠ্য বইয়ের মূল্যায়ন ও শিক্ষক সহায়িকা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হবে
❏প্রতি জোটের শিক্ষকদের জন্য ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার থাকবে। মাঝে মাঝে জোটের শিক্ষকদের আলোচনাসভা ও শিক্ষকতাকালীন শিক্ষা প্রভৃতি দ্বারা শিক্ষামানের উন্নতি করা হবে। বিদ্যালয়-গুচ্ছে যৌথভাবে যেমন পরীক্ষানিরীক্ষার উৎসাহ দেওয়া হবে, তেমনি ইউনিটের মধ্যে থেকে পৃথকভাবে ভালো করে কাজ করবার উৎসাহ দেওয়া হবে। বিদ্যালয়- গুচ্ছের মধ্য দিয়ে এলাকার সার্বিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটানোর দিকেই বিশেষ জোর দিতে হবে।
প্রশ্ন- চুইয়ে পড়া নীতি। Downward filtration theory.
উত্তর- ১৮৩৫ সালে মেকলের মন্তব্য ও বেন্টিংকের শিক্ষাবিষয়ক প্রস্তাবের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট শিক্ষানীতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মেকলের মন্তব্যে দেশীয় শিক্ষাকে অবহেলা চরে গণশিক্ষার বদলে ‘চুইয়ে পড়া’র নীতি (Downward Filtration) গৃহীত হওয়ায় বিদ্যাসাগর, লর্ড হার্ডিঞ্জ, লর্ড ডালহৌসি প্রমুখ ব্যক্তিগণ দেশীয় প্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষা শিক্ষার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। লর্ড বেন্টিং-এর আইন সচিব টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ১৮৩৫ সালে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব দেন যা ‘মেকলে মিনিটস’ নামে পরিচিত।
এই প্রস্তাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের স্বপক্ষে যুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এদেশের উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটবে এবং তাদের দ্বারা তা চুইয়ে ক্রমশ সাধারণ দেশবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে ভারতীয়রা রুচি, মত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিমত্তায় ইংরেজদের মত হয়ে উঠবে। ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে মেকলের নেওয়া এই নীতি ‘চুইয়ে পড়া নীতি’ নামে পরিচিত।
প্রশ্ন- মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার উদ্দেশ্য। Aims of education in vernacular language.
উত্তর- পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষা রয়েছে। সেটিই হলো মাতৃভাষা; যা মায়ের মুখ থেকে পাওয়া। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এটি বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত একটি ভাষা। এই স্বীকৃতি আমরা পাই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর ঘোষণার মাধ্যমে। জীবন ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার একমাত্র পথ হচ্ছে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান। শিক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য ও সর্বশ্রেষ্ঠ দান হচ্ছে ব্যক্তিসত্তার পূর্ণ সাধন। আর এ জন্যে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানই হচ্ছে সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি।
❏তাই মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান এর কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো
১) অপরের কথা শুনে যথাযথ ভাবে বুঝতে পারা।
2) সুস্পষ্ট উচ্চারণে অর্থপ্রকাশের মধ্য দিয়ে সহজ ভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা।
3) স্পষ্ট, সুন্দর ও মোটামুটি দ্রুত হস্তাক্ষরে লিখতে পারা।
4) উৎকৃষ্ট শ্রেণীর সাহিত্য, মনীষীদের জীবনী ইত্যাদি পাঠের মাধ্যমে মহৎ ব্যক্তিদের মানসিকতার সাথে পরিচিত হওয়া।
5) শিশুর শিক্ষা সূচীতে ভাষার স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাষা হল ভাবচিন্তার ধারক। ভাষার মাধ্যমেই শিশু তার অনুভূতি, কল্পনা ইত্যাদি মৌখিক বা লিখিত রূপে প্রকাশ করতে পারে।
6) সঠিকভাবে, ভদ্রভাবে ও জড়তাবিহীন ভাবে প্রশ্নের উত্তরদিতে সমর্থ হয়।
7) নিজের মনোভাব ও বক্তব্য স্পষ্ট ভাষায় যুক্তি সহ প্রকাশ করতে পারে।
8) স্বাধীন চিন্তা ও সুরুচিকর আত্মপ্রকাশ এর ভিতর দিয়ে সৃষ্টিশীল সাহিত্যের কাজে ছাত্রছাত্রীরা অনুপ্রাণিত হয়।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you