Ticker

100/recent/ticker-posts

Translate

অরোভিল সম্পর্কে আলোচনা

 অরোভিল সম্পর্কে আলোচনা 


অরোভিল (ইংরেজি: Auroville) ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ভিল্লুপুরম জেলার বেশির ভাগ অংশে ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির কিছু অংশে বিস্তৃত বিংশ শতকের ষাটের দশকে পরীক্ষামূলক ভাবে গোড়া পত্তন ঘটে বিশ্বমানতার স্বপ্নের শহরের। চেন্নাই থেকে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার ও পুদুচেরি হতে প্রায় বারো কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ছোট্ট নগর।



 উষার শহর অরোভিল

ভারতের বিশিষ্ট দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী অরবিন্দ ঘোষ। তিনি এমন শহরের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ, রাজনীতি ও জাতীয়তার ভেদ ভুলে সব নারী-পুরুষ শান্তিতে বসবাস করবে। অরবিন্দের সেই স্বপ্নের শহর অরোভিলকে বাস্তবে রূপদানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ভক্ত মীরা আলফাসা। সম্প্রতি ভারত সরকার মূল নকশা অনুযায়ী শহরটিকে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। ভারতের পুদুচেরির এই শহর নিয়ে লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য। 

২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮। ভারতের পুদুচেরি। রাজধানী শহর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে। ‘শ্রীমা’ মীরা আলফাসা একটি নগরীর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তাঁর ভাষায়, ‘যেখানে ধর্ম-বর্ণ, রাজনীতি ও জাতীয়তা নির্বিশেষে সব দেশের নারী-পুরুষ শান্তি ও প্রগতির সঙ্গে বসবাস করতে পারবে।’ সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিল হাজার পাঁচেক মানুষ। ভারতের সব রাজ্যের তো বটেই, উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের ১২৪টি দেশের মানুষও। সঙ্গে করে এনেছিলেন নিজ নিজ দেশের মাটি। সেগুলো একসঙ্গে মিশিয়ে রাখা হয় একটি কলসে। কারণ সেটা বিশেষভাবে কোনো দেশ বা জাতির নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য একটা আদর্শ শহর। নাম অরোভিল। নেওয়া হয়েছে ফরাসি শব্দ ‘অরা’ (ইংরেজি ‘অরোরা’) থেকে। অর্থ উষাকাল। অনেকে তাই ইংরেজিতে বলে ‘টাউন অব ডন’ বা উষার শহর।



ফরাসি থেকে নাম নেওয়ার কারণ শ্রীমা নিজে ছিলেন ফরাসি। শুধু তাই নয়, পুরো ভারত ব্রিটিশদের দখলে থাকলেও এর পাঁচটি অঞ্চল ছিল ফরাসি উপনিবেশ। তারই একটা এই পুদুচেরি (আগের নাম পণ্ডিচেরি)। ব্রিটিশদের থেকে ভারত স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালে। আর ফরাসি অঞ্চলগুলো ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৫৪ সালে। তখন ফ্রান্সের সঙ্গে সঙ্গে ভারতেরও দ্বৈত নাগরিক হন শ্রীমা। তিনি প্রথম পুদুচেরিতে আসেন ১৯১৪ সালে। তিনি ও তাঁর স্বামী পল রিচার্ড দীক্ষা নেন শ্রী অরবিন্দের কাছে। বাঙালি আধ্যাত্মিক গুরু অরবিন্দ ঘোষ। তখন তাঁর খ্যাতি বাংলা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পৃথিবীতে। বিশ্বজুড়ে জুটেছিল ভক্তকুল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁকে নিয়ে লিখেছিলেন, ‘অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার।’ তাঁর সান্নিধ্য পেতে অনেকেই ছুটে এসেছিলেন ভারতে। তাঁদেরই একজন মীরা আলফাসা। জন্ম ১৮৭৮ সালে। ফ্রান্সের প্যারিসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁকে ফিরতে হয় স্বদেশে। সেখান থেকে জাপানে। ১৯২০ সালে আবার আসেন পুদুচেরিতে। আর যাননি।

অরবিন্দ তাঁকে ‘শ্রীমা’ বলে ডাকতেন। তাঁর অনুসারীদের মধ্যেও সেই নামেই পরিচিতি পান মীরা। ১৯২৬ সালে তাঁর হাতে আশ্রমের ভার দিয়ে নিজে যোগ সাধনায় পূর্ণ মনোযোগ দেন অরবিন্দ; এমনকি তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আস্ত একটা বই। ‘দ্য মাদার’। বর্ণনা করেছেন দিব্য মায়ের অবতার হিসেবে। ১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর মারা যান শ্রী অরবিন্দ। তখন শ্রীমাই হন আশ্রমের প্রধান। ধীরে ধীরে তিনিও মনোযোগ বাড়াতে থাকেন যোগ সাধনায়। চলে যান লোকচক্ষুর অন্তরালে। ১৯৫৯ সালের পরে আবার ‘দর্শন’ দেন ১৯৬৩ সালে। তাঁর ৮৫তম জন্মদিনে। আর পরের বছরই জানান তাঁর ‘স্বপ্নের’ কথা—এমন একটা শহর বানাবেন, যেটা হবে সমগ্র মানবজাতির। যেখানে নিশ্চিত করা হবে গুরু অরবিন্দের নির্দেশিত পথে যোগ সাধনা করার সঠিক পরিবেশ। সেটা হবে বিশ্ববাসীর জন্য আদর্শ।



শ্রীমার কল্পনার সেই শহরই অরোভিল। বাস্তবায়নের সময় ভেবেছিলেন দূর ভবিষ্যতের কথাও। তাই ৫০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার নগর পরিকল্পনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন ফরাসি স্থপতি রজার অ্যাঙ্গারকে। তিনি নকশাও করেছিলেন। মাঝখানে মাতৃমন্দির। এক হাজার ৪০০টি সোনার প্রলেপ দেওয়া বড় বড় চাকতি দিয়ে বানানো এক স্বর্ণগোলক যেন। তাকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্বের মতো বৃত্তাকারে গড়ে ওঠার কথা পুরো শহর। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। অরোভিলের জন্য অবশ্য ভারত সরকার থেকে কিছু টাকা পাওয়া যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভক্তরাও পাঠান টাকা। সেসব মূলত খরচ হয়ে যায় শহরের নির্মাণপ্রক্রিয়ায়। ওদিকে ১৯৭৩ সালের ১৭ নভেম্বর শ্রীমা মারা যান। সব মিলিয়ে মাতৃমন্দিরের বাইরে মূল নকশা তেমন একটা বাস্তবায়িত হয়নি; বরং অধিবাসীরা নিজেদের মতো করে বানিয়ে নিয়েছেন ঘরবাড়ি। লাগিয়েছেন প্রচুর গাছপালা। আগে এই অঞ্চলটা ছিল বিরান ভূমি। এখন সেখানে জংলা। বাস করে ময়ূর, শিয়াল, খাটাশের মতো বন্য প্রাণী।



এরই মধ্যে অরোভিলের বয়স পেরিয়ে গেছে অর্ধশতাব্দী। বসবাসকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সেখানকার নাগরিক হওয়া অবশ্য সহজ নয়। সে জন্য দুই বছর বিনা পয়সায় কাজ করতে হয়। পুরোটা সময় যাওয়া যায় না কোথাও। নগর কমিটির কাছে প্রমাণ করতে হয় যোগ্যতা। তবেই পাওয়া যায় ইউটোপিয়ান সেই সমাজে প্রবেশাধিকার। তবে ঘুরতে যেতে পারে যে কেউ। সে জন্য অবশ্য আগে থেকে জানিয়ে রাখা ভালো, বিশেষ করে মাতৃমন্দিরে যেতে চাইলে। কারণ নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি পর্যটককে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না।


বর্তমানে অরোভিলের আয়-রোজগার নেহাত কম নয়। সরকারি বরাদ্দ আর ভক্তদের টাকার পাশাপাশি আছে পর্যটন বাবদ আয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মূল নকশার বাস্তবায়ন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে দুটো মত। একদল এখনো তা চাইলেও অন্য দলের মতে আর প্রয়োজন নেই। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা অরোভিল নিয়েই খুশি। তাদের হতাশ করে সম্প্রতি ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রজার অ্যাঙ্গারের নকশা বাস্তবায়নের। তবে মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য নিয়ে অরোভিলবাসীর অনেকেই সন্দিগ্ধ। কারণ এরই মধ্যে অরোভিল ফাউন্ডেশনের সচিব করা হয়েছে জয়ন্তী রবিকে। ২০০২ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি ছিলেন গুজরাটের জেলা প্রশাসক। দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে তাদের সন্দেহ, অরোভিল নির্মাণের মাধ্যমে তারা আসলে শ্রী অরবিন্দকে ‘বিজেপিকরণ’ করতে চায়।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

Thank you