Ticker

100/recent/ticker-posts

Translate

 শিক্ষার লক্ষ্যের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করো। 12


উত্তর- শিক্ষার আদিমপর্বে আদিম মনুষ্য সমাজে শিক্ষার কোনো সচেতন প্রয়াস ছিল না। শিক্ষা ছিল অনিস্থিত। জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার তাগিদে এবং আত্মসংরক্ষণের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত জীবন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে মানুষ আপনা আপনি কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করত। তাই ছিল তার শিক্ষা। দল হিসাবে মানুষ যখন বাস করতে আরম্ভ করল, তখন দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সুষঠু অভিযোজনের প্রয়োজনে শিক্ষার লক্ষাহল ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করা, যাতে করে দলের সঙ্গে সার্থক সংগতি বিধানের মাধ্যমে বেঁচে থাকা যায়। তখন শিক্ষা ধীরে ধীরে সচেতনভাবে লক্ষ্যমুখী হল।


প্রাচীন ভারতে শিক্ষা ছিল ধর্মনিয়ন্ত্রিত। বৈদিক দর্শন এবং হিন্দু ধর্মের উপলব্ধি হচ্ছে পরমাত্মা অবিনশ্বর এবং অসীম। ব্যক্তি সেই পরামাত্মার সসীম অংশ এবং নম্বর। সক্ষম জগৎ পরম ব্রহ্মের বিচিত্র প্রকাশ। সর্বং খলু ইদং ব্রশ্ন। আত্মোপলব্ধি এবং ব্যক্তিত্বের উন্নয়নের মাধ্যমে নিজের অন্তরে এই পরমাত্মা' বা ব্রহ্মের উপলব্ধি এবং সমগ্র বিশ্বজগতের পরম বৈচিত্র্যের মধ্যে সেই এক-কে অনুভব করাই ছিল শিক্ষার পরম লক্ষা। বলা বাহুল্য, এই শিক্ষা ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক।


ও পাশ্চাত্যে বিভিন্ন নগররাষ্ট্রে শিক্ষার লক্ষ্যের বিভিন্নতা ছিল। গ্রিস দেশের নগররাষ্ট্রে স্পার্টায় ব্যক্তিস্বাধীনতার কোনো মূল্য ছিল না। এই রাষ্ট্র প্রায়ই বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হত। আত্মরক্ষার তাগিদে সমগ্রজাতিকে যোদ্ধাজ্যতি রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। শিক্ষা ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত। শিক্ষার লক্ষ্যছিল ব্যক্তির দৈহিক শক্তি, সাহস, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগতা।

শিক্ষায় ব্যক্তিসত আশা-আকাক্ষা চরিতার্থ করার কোনো স্থান ছিল না। সমাজ কল্যাণের কাছে ব্যক্তি কল্যাণকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। এতে জ্ঞানচর্চা ও সৌন্দর্য চর্চার বিশেষ সুযোগ ছিল না।


পাশের নগররাষ্ট্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বার্থকে সমাজের দাবির ওপর স্থান দেওয়া হয়েছে। ব্যাক্তির দেহ মনের সুসযন্ত্রণা বিকাশসাধনকে শিক্ষার লক্ষাবলে ধরা হয়েছে। তখন সোফিন্ট নামে একদল শিক্ষকের আবির্ভাব ঘটল। তাঁরা বললেন, বাক্তি মানুষই হবে সকল বিষয়ের মাপকাঠি ('Man is the measure of all things')। বাক্তির আত্মোন্নতির বাইরে কোনো শাশ্বত মূল্যবোধ থাকতে পারে না। তাঁরা ভাই সমাজের প্রতি দায়িত্বকে প্রায় অস্বীকার করে ব্যক্তিকল্যাণকেই শিক্ষার লক্ষাবলে গ্রহণ করলেন। সক্রেটিস, ডেটো, অ্যারিস্টটল প্রমুখ গ্রিক মনীষীগণ সোফিন্টদের এই উন্ন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে সমর্থন করতে পারেন।। সক্রেটিন বললেন নিজেকে জানো) (Know thyself)। এই জানা এবং আঙু জিজ্ঞাসার মাধ্যমে সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান করাই হবে শিক্ষার লক্ষ্য। অর্থাৎ শুধু আত্মোন্নতি নয়, এমন আত্মোপ্রতি যার ফলে সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান করা যায়। প্লেটো বাক্তির সমস্ত ক্ষমতার সর্বোত্তম প্রকাশকে শিক্ষার লক্ষা বলে চিহ্নিত করে ছিলেন যাতে সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজবিকাশ সংহত হয়।


প্রাচীন জোমান সমাজ ছিল কৃষিভিত্তিক। প্রাচীন রোমকগণ গ্রিকদের মতো চিন্তাশীল, জ্ঞানপিপাসু ও সৌন্দর্যের পুজারি ছিল না। তাঁদের চিন্তাধারা ছিল একেবারে বস্তুতান্ত্রিক। ব্যবহারিক জগতে বাস্তব সাফল্যলাভের মাধ্যমে আদর্শ নাগরিক হয়ে ওঠার গুণাবলি অর্জনই ছিল রোমক শিক্ষার আদর্শ।


এ মধ্যযুগে শিক্ষাব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে ধর্মযাজক সম্প্রদায়ের কুক্ষিগত হল। ধর্ম অনুশাসিত শৃঙ্খলার লক্ষ্যহল সর্বাত্মক শৃঙ্খলা। বলা হল ইন্দ্রিয় সুখ বিসর্জন, চিত্তবৃত্তিনিরোধ, কঠোর কৃচ্ছসাধনের মধ্য দিয়ে অনাগত অনন্ত জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এক কথায় ধর্মের কঠোর অনুশাসনে মানবধর্মের অবলুপ্তি ঘটল। শিক্ষাক্ষেত্রে অনুশাসন, অবদমন প্রাধান্য পেল।


মানুষের জীবনে সর্বক্ষেত্রে যাজকশ্রেণির আধিপত্যের বিরুদ্ধে, জীবনধর্মের সর্বব্যাপী এই অবদমনের বিরুদ্ধে মানুষ বিদ্রোহ করল রেনেসাঁ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এই নব জাগরণের ফলে যে শিক্ষা-মতবাদের উদ্ভব হল তার নাম মানবতাবাদ (Hamanom)। এই মতবাদ অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষাহল ব্যক্তিকে বাযীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দেওয়া যাতে সে সর্বতোমুখী ও স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশের মাধ্যমে সমকালীন সমাজজীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণের যোগাতা অর্জন করতে পারে। পরবর্তীকালে অবশ্য মানবতাবাদী এই শিক্ষা একেবারে কৃত্রিম ভাষাসবর্ষ গতানুগতিক, প্রথাগত, রোমান বাপ্পীদের বাকভঙ্গি অনুকরণের বার্ধ প্রয়াসে পরিণত হল। ইউরোপের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানবতাবাদ কৃত্রিমতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।


এই কৃত্রিম শিক্ষার বিরুদ্ধে সতেরো শতকে বেকন, কমেনিয়াস প্রমুখ মনীষীদের নেতৃত্বে শিক্ষায় বাস্তববাদ (Realism) আন্দোলন দেখা দিল। বাস্তববাদীরা বললেন সকল দুর্নীতির মূলে অজ্ঞানতা। তাই শিক্ষার মাধ্যমে খণ্ড যণ্ড জ্ঞানকে সুসংহত করে বিশ্বজ্ঞানের বিন্যাস ও প্রচার করতে হবে। বলা হল ইন্দ্রিয় পত্যক্ষণের মাধ্যমে বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতা অর্জনই হল শিক্ষার লক্ষ্য।


আঠারো শতকে সর্বপ্রথম বাক্তিকেন্দ্রিক, শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রকৃত উদ্বোধন হল। শিশুর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, প্রক্ষোভ, প্রয়েজন ও সামর্থ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার বিরুদ্ধে ও শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর ওপর সামাজিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন ফরাসি চিন্তানায়ক ও দার্শনিক রুশো (Rousseau)। তিনি বললেন, 'প্রকৃতির স্রষ্টার হাত থেকে যা কিছু আসে তা সব সৎ এবং মঙ্গলময় কিন্তু মানুষের হাতে পড়ে তাদের বিকৃতি ঘটে" ("Everything is good as it comes from the hands of the Author of nature, but everything degenerates in the hands of man")। তাই বয়স্ক পরিকল্পিত কৃত্রিম জ্ঞানের বোঝা বাইরে থেকে শিশুমনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। কৃত্রিমতাবর্জিত নিঃসর্গ পরিবেশে পরিপূর্ণ শিশুসুলভজীবনযাপনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ জীবন অভিজ্ঞতা অবলম্বন করে শিশু। প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশই হল প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য। এইভাবে শিক্ষাজগতে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রতিষ্ঠা ঘটল।

ট্রে উত্তরসূরি রুশের উত্তরসূরি পেস্টালৎসি (Pestalozin) শিক্ষকে মনোবিজ্ঞান সমম্মত করার প্রয়াসী হয়ে বললেন, শিশুর সহজাত শক্তি সম্ভাবনার সামগ্রিক স্বাভাবিক আত্মপ্রকাশ এবং সম্পূর্ণতা লাভই শিক্ষার চরম লক্ষ্য।


শিক্ষাবিদ হাবার্ট (Herhart) ঘোষণা করলে যে, চরিত্র গঠনই শিক্ষার চরম আদর্শ।


অধ্যাত্মবাদী ফ্রয়েবেল (Froebel)- এর মতে স্বতঃস্ফুর্ত সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে শিশুর আত্মবিকাশ এবং তার মাধ্যমে নিজ অন্তরে আগে থেকেই বর্তমান সুপ্ত পরমাত্মার উপলব্ধি বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে দ্রষ্টার অভিত্বকে অনুভব করাই শিক্ষার চম লক্ষাবলে গণ্য করা উচিত।


হোর্বাট স্পেনসার (Herbert Spencer) বললেন, 'ভবিষ্যতে পরিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুতি সাধনই শিক্ষার লক্ষ্যহওয়া উচিত। ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের কাজে লাগে না এমন শিক্ষা শিক্ষাই নয়। তাঁর মতে শিক্ষা হল ব্যক্তিগত বিষয়। এতে রাষ্ট্র ও সমাজের খবরদারি ঠিক নয়। শিশুর কচি প্রবণতা, আগ্রহকে পূর্বের মতো অবহেলা না করে আত্মসংরক্ষণ, ভবিষাতে সুষ্ঠু জীবিকা অর্জন, সন্তান পালন, যোগা নাগরিকতা অর্জন সুষঠ অবসর বিনোদনের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ জীবন যাপনের জনা সার্থকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তিনি আরও বললেন এর প্রতিটির জন্য বিজ্ঞানের জ্ঞান থাকা জরুরি। বলা হয়ে থাকে শিক্ষাক্ষেত্রে জীবনানুগ বিজ্ঞান শিক্ষার কথা তিনিই প্রথম বলেছেন। স্পেনসারের হাত ধরে উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্থে শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান স্বীকৃতি লাভ করল।


এবিংশ শতাব্দীর শিক্ষাধারা প্রধানত সমন্বয়ধর্মী। শিশুর ব্যক্তিসত্তার বিকাশ এবং সামাজিক আচরণ দক্ষতা অর্জনের মধ্যে একটা সামঞ্জসাস্থাপনের চেষ্টা আধুনিক শিক্ষার এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই সমন্বয়ের চেষ্টায় ব্রতী হয়েছেন প্রয়োগবাদী আমেরিকান শিক্ষাবিদ জন ডিউই (John Dewey)। তিনি শিক্ষা ও জীবনের মধ্যে, বিদ্যালয় ও সমাজের মধ্যে ঘনিষ্ঠ। সংযোগ স্থাপনে প্রয়াসী হয়েছেন।

শিক্ষার লক্ষ্যসম্পর্কে এই ঐতিহাসিক আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষার লক্ষ্যযুগে যুগে দেশে দেশে বিভিন্ন শিক্ষাবিদদের দ্বারা বিভিন্ন শিক্ষাদর্শন অনুযায়ী বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। শিক্ষার বহুল প্রচলিত কয়েকটি লক্ষ্যের উল্লেখ করলে এই পরিবর্তনশীলতার ধারণাটি আরও স্পষ্ট হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ