প্রশ্ন:পৃথকভাবে সংকীর্ণ অর্থে এবং ব্যাপক অর্থে শিক্ষার সংজ্ঞা দিন। দর্শন এবং শিক্ষা কীভাবে সম্পর্কিত? কিভাবে দর্শন তার শিক্ষার ক্ষেত্রে রাখতে পারে? ৬+৬+৬
ভূমিকা:- সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা:- শিক্ষার দুটি অর্থের মধ্যে অন্যতম হলো সংকীর্ণ অর্থ। সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা বলতে বোঝায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় বা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ কর্তৃক যে জ্ঞান বা পাঠ শিক্ষার্থীরা লাভ করে থাকে। সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা হল শিশুর শূন্যমনে ক্রমশ জ্ঞানের সঞ্চার। শিক্ষক বা পুস্তক হলো জ্ঞান ভান্ডার আর সেই জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে স্বর্ণরূপে জ্ঞান শূন্য মনে সঞ্চিত হয়ে থাকে।
শিক্ষক বা পুস্তক হলো জ্ঞানের খনি, সেই খনি বা উৎস থেকে মনের মাধ্যমে জ্ঞানের স্রোতে শিশুর শূন্য মন ভরে ওঠে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পাঠক্রমকে সামনে রেখে শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি দ্বারা পাঠক্রমের বিষয়গুলি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চালনের মাধ্যমে ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা লাভের প্রক্রিয়াকে সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা বলে।
এস এস ম্যাকেঞ্জির মতে সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা বলতে ক্ষমতার বিকাশ ও চর্চা করার যে কোনো সচেতন প্রয়াসকে বোঝায়।
ব্যাপক অর্থে শিক্ষা:- ব্যাপক অর্থানুযায়ী, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যঅত্যন্ত বিসতৃত। এই ধারণানুযায়ী শিক্ষাকে ব্যক্তির জীবনব্যাপী বিকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে শিক্ষা বলতে নিয়ন্ত্রিত, অনিয়ন্ত্রিত, বিধিমুক্ত, সমস্ত প্রকার শিক্ষার কথা বোঝানো হয়েছে। এখানে শিক্ষা বলতে 3R (Reading, Writing, Arithmetic) এবং 3H (Head, Heart, Hand) উভয়কে বুঝিয়েছেন।
ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হলো- 'Two Way Communication, অর্থাৎ শিক্ষা প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর সক্রিয়তার সুযোগ রয়েছে। এই মত অনুযায়ী শিক্ষকের কাজ শুধু শিক্ষাদান এবং নির্দেশদান নয়। শিক্ষক এখানে শিক্ষার্থীর বন্ধু, সহায়ক, পরিচালক। ব্যাপক অর্থে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর দেহ মন ও আত্মার সার্বিক বিকাশ ঘটানো। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা মানুষের সারা জীবন ধরে চলতে থাকে।
দর্শনশাস্ত্র (Philosophy) জীবনের মূল উৎস ও উদ্দেশ্য খুঁজে বের করাই হলো দর্শন। দর্শন মানে দেখা অর্থাৎ সত্যের সন্ধান ও সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করা। আবার দর্শন এর অর্থ হলো জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা।
শিক্ষা (Education)-শিক্ষা হলো জীবনব্যাপী ক্রমবিকাশের একটি নিরন্তন প্রক্রিয়া যা অভিজ্ঞতার পুনর্গঠনের মাধ্যমে মানুষকে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের সক্ষম করে তোলে। উপরের উল্লেখিত দর্শন শিক্ষার অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দর্শন নির্ধারণ করে জীবনের উদ্দেশ্য কি কি করণীয় এবং কি কি করনীয় নয়। আর শিক্ষা হলো সেই উপায় বা হাতিয়ার যার দ্বারা দর্শন নির্ধারিত জীবনের উদ্দেশ্য গুলি কে বাস্তবায়িত করা যায়। এই অর্থে দর্শন ও শিক্ষা পরস্পর সম্পর্কিত এবং দুটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছে। অর্থাৎ শিক্ষা যেমন দর্শনের উপর নির্ভরশীল তেমনই দর্শনও শিক্ষার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাই বলা যায় দর্শন হলো ভিত্তি এবং শিক্ষা হলো উপরিকাঠামো।
দার্শনিক ধারণা প্রকাশের ব্যবহারিক মাধ্যম। দর্শন ধারণা দেয় এবং শিক্ষা দর্শন দ্বারা প্রদত্ত এই ধারণাগুলি তৈরি করে। 7 দর্শন ছাড়া শিক্ষা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। তাই শিক্ষা ও দর্শন উভয়ই একে অপরের উপর নির্ভরশীল।
দর্শন ব্যতীত শিক্ষা অন্ধ এবং শিক্ষা ব্যতীত দর্শন অকার্যকর
দর্শন এবং শিক্ষা একই মুদ্রার দুই পিঠের মত। প্রথমটি হল জীবনের মননশীল দিক, আর পরেরটি হল সক্রিয় দিক। দর্শন হল প্রজ্ঞা আর শিক্ষা হল সেই জ্ঞানকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রেরণ করে।
তোই নিয়ে দর্শন ও শিক্ষার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অন্য ভাবে ব্যাখ্যা করা হলোঃ-
1. শিক্ষা এবং দর্শন উভয়ই গতিশীল: এর অর্থ হল উভয়ই স্থির নয় এবং সর্বদা পরিবর্তনশীল। শিক্ষা একদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে বিকশিত করে এবং সমাজের পরিবর্তিত চাহিদার সাথে মানানসই জ্ঞানকে প্রভাবিত করে। একই দিকে দর্শন ধারনা, দার্শনিকদের সর্বদা পরিবর্তনশীল মতামত, বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিভিন্ন দার্শনিক ধারণা বিশ্লেষণের একটি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে। আবার শিক্ষার অর্থ অৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে জয়িতার দার্শনিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
2. শিক্ষা হল দর্শনের গতিশীল দিক:- এর মানে হল শিক্ষা হল দর্শনের ব্যবহারিক দিক কারণ প্রতিটি দার্শনিক চিন্তা শিক্ষার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় এবং দার্শনিকদের জ্ঞান, বিশ্বাস এবং প্রজ্ঞার এই আবিষ্কারগুলি শিক্ষার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রেরণ করা হয়।
3 শিক্ষা দর্শনের উপর নির্ভরশীল:-কারণ দর্শন আমাদের শিক্ষার প্রতি কেমন অনুভব করি তা প্রভাবিত করে এবং শিক্ষা হল একটিক তত্ত্ব প্রচার ও প্রসার ঘটে। শিক্ষার মাধ্যমেই দার্শনিক ।
4. দার্শনিকের তত্ত্বের প্রচার ও প্রসার:- শিক্ষার মাধ্যমেই দার্শনিক তত্ত্ব। তত্ত্বের।
5. শিক্ষা এবং দর্শন উভয়ই তত্ত্বের সাথে জড়িত এবং দর্শন একজন ছাত্রকে বুদ্ধিমান, প্রশস্ত মনের এবং জ্ঞানের জন্য ক্ষুধার্ত করে তোলে।
শিক্ষাক্ষেত্রে দর্শনের অবদান:- শিক্ষা একটি জটিল সামাজিক প্রক্রিয়া। কতগুলি পরিকল্পিত পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এই শিক্ষা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াগুলির উপর দর্শনের ভূমিকা আলোচনার মধ্য দিয়েই শিক্ষার ওপর দর্শনের শ্রেষ্ঠ অবদান বিষয়টি অনুধাবন করা যায়। নিম্নে তা আলোচনা করা হলোঃ-
। দর্শন ও শিক্ষার লক্ষ্য:- নির্দিষ্ট লক্ষ্যব্যতীত শিক্ষা কার্যকরী হয় না। তাই প্রত্যেক শিক্ষাব্যবস্থারই একটা উদ্দেশ্য থাকে। বাস্তব জীবনকে ভিত্তি করেই শিক্ষার লক্ষ্যস্থির হয়। দর্শন এই লক্ষ্যগুলি স্থির করতে শিক্ষাকে সাহায্য করে। আবার এই লক্ষ্যগুলি কি করে শিক্ষার্থীর জীবনে বাস্তবায়িত হবে তারও ইঙ্গিত দেয় দর্শন।
2. দর্শন ও পাঠক্রম:- শিক্ষার পাঠক্রম তৈরি করা তথা পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রেও দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। পাঠ্যক্রমে কোন কোন বিষয় থাকবে তা নির্ধারণে দর্শনের ভূমিকা সুবিদিত। যেমন মহাত্মা গান্ধী প্রবর্তিত বুনিয়াদি শিক্ষার পাঠক্রম তাঁর জীবনদর্শন দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত।
3. দর্শন ও শিক্ষাদান পদ্ধতি:- শিক্ষন পদ্ধতি হল, যে কৌশলে সাহায্যে শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের নিকট উপস্থাপিত করা হয়। আর এই শিক্ষার পদ্ধতিতেও দর্শন সবিশেষ প্রভাবিত হয়েছে। সেই জন্য বিভিন্ন দার্শনিকগণ শিক্ষাদান যাতে সার্থক হয় তার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতির কথা বলেছেন। যেমন ভাববাদী দর্শন আলোচনা পদ্ধতি।
4. দর্শন ও শৃঙ্খলা- শৃঙ্খলা রক্ষা শিক্ষার একটি অপরিহার্য অঙ্গ। কিভাবে শৃঙ্খলা রক্ষা করা হলে সেক্ষেত্রে দর্শনের বিশেষ ভূমিকা দেখা যায়। যেমন প্রকৃতিবাদীরা মনে করেন প্রকৃতির দন্তবিধান এর মাধ্যমে প্রকৃত শৃঙ্খলা বোধ সৃষ্টি হয়। "আগুনে হাত দিলে হাত পোড়ে- এই শিক্ষা শিশু আগুনে হাত দিয়েই শিখবে।
5. দর্শন ও শিক্ষক:- শিক্ষক হলেন শিক্ষার্থীর গুরু। তাই প্রকৃত শিক্ষক হতে গেলে তার কি কি গুন থাকা দরকার এবং ছাত্রের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য কতটুকু ইত্যাদি দর্শনশাস্ত্র নির্ণয় করার চেষ্টা করে।
6. দর্শন ও পাঠ্যপুস্তক: যথার্থ পাঠ্যপুস্তক নির্ধারণের দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। পাঠ্যপুস্তক তৈরি করার সময় তার উদ্দেশ্য, মান, নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন হয় এমনকি পুস্তকে যথেষ্ট ছবি, উদাহরণ থাকবে কিনা, কি ধরনের ছবি থাকা। উচিত। এই সমস্ত বিষয়ে দর্শন সাহায্য করে থাকে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছেযে, দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা বিভিন্ন অংশের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। শিক্ষা যতদিন উদ্দেশ্যমুখি বিজ্ঞান হিসেবে বিবেচিত হবে ততদিন তাকে দর্শনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। সুতরাং দর্শনের প্রভাব বা গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you