প্রশ্ন :- পাশ্চাত্য দর্শন ও ভারতীয় দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা করো। 12
ভূমিকা :- ভারতীয় দর্শন ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি এই দুই দর্শনের মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য ভিত্তিতে এই দুই দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা করা হল। সাদৃশ্য উভয় দর্শনের মধ্যে যেসব সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় সেগুলি হল- (m) আত্মনিরীক্ষণ: উভয় দর্শনে আত্মনিরীক্ষণ বা আত্মবিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সক্রেটিস যেমন বলেছিলেন, 'Grothiscaution অর্থাৎ Know the myself অর্থাৎ নিজেকে জানা। তেমনি আমাদের দেশে উপনিষদের ঋষিগণ উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারন করেছিলেন আত্মানম বিদ্ধি।
মন সম্পর্কিত চিন্তাভাবনাঃ- উভয়প্রকার দর্শনে আত্মতত্ত্বের মনোবিশ্লেষণ যথোচিত মর্যাদা পেয়েছে। পরমাণুবাদঃ উভয় দর্শনে বস্তু বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পরমাণুবাদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।) পরিবর্তনশীলতাঃ দর্শনের উভয় শাখাতেই পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে সদর্থক মত পোষণ করা হয়েছে।
উদ্দেশ্যগতঃ উভয় দর্শন শাখার উদ্দেশ্য হল মানুষকে প্রকৃত তত্ত্বানুসন্ধানী, জিজ্ঞাসু ও মননশীল করে তোলা এবং সমন্বয়ী অধিকারী করে গড়ে তোলা। স্থানকাল ও কার্যকারণ সম্পর্কঃ দর্শনের দুটি শাখাতেই স্থান কাল ও কার্যকারণ বিষয়ক নানা সমস্যাকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছেসত্য, শিব ও সুন্দরকে প্রাধানাঃ দর্শনের উভয় শাখাতেই সত্য, শিব ও সুন্দর (Truth, Godnem and Beauty)-কে পর্যান্ত দেওয়া হয়েছে।
জ্ঞানতত্ত্বঃ দর্শনের দুটি শাখাতেই জ্ঞানতত্ত্বকে যথেষ্ট প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
(I) মূল্যবোধকে প্রাধানা ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শন উভয়ে বেশ কিছু মূল্যবোধ বা value-কে প্রাধান্য দিয়েছে।
(II) জীবনের জাতেন উভয় দর্শনেই জীবনের করতেন এবং মানুষের অরয়েলকে গুরুত্ব দেওয়া হে গুঙ্গানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ উভয় দর্শনেই প্রতিটি তথ্য ও তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
(২) স্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে প্রাধান্য। পাশ্চাতা ও অরতীয় উভয় দর্শনে ছান্দিক পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কারণ উভয় দর্শন মনে করে চিন্তাভাবনা বস্তু জগৎ, সংস্কৃতি ইত্যাদি দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মাধ্যমে বিবর্তিত রয়েছে।
বৈসাদৃশ্যঃ ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে যেমন পূর্বোক্ত সাদৃশ্য গুলি বর্তমান, তেমনি এই দুই দর্শনের মতো দেশ কিছু বৈসাদৃশ্যও দেখা যায়। যথাঃ
(1) বৈচিত্রোর দিক থেকে:- পাশ্চাত্য দর্শনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন বৈচিত্রা দেখা যায়, প্রাচ্য দর্শনে কিন্তু সেই পরিমাণ বৈচিত্র্য দেখা যায় না।
(2) দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য:- পাশ্চাত্য দর্শনে যেখানে বহিঃজগতের বিশ্লেষণ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের রূপ প্রায়ানা পেয়েছে। সেখানে ভারতীয় দর্শনে মানুষের অন্তর্গত বিশ্লেষণ বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। 28757
(3) ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা:- বাক্তিকেন্দ্রিকতার দিক থেকেও উভয় দর্শনে পার্থকা দেখা যায়। যেমন পাশ্চাত্য দর্শন অনেক বেশী ব্যক্তি মানুষ কেন্দ্রিক কিন্তু ভারতীয় দর্শনে ব্যক্তি মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি।
(4) যুক্তিবাদ:- পাশ্চাত্য দর্শন মানুষের যুক্তি-বুদ্ধি, বিচার-বিশ্লেষণ ইত্যাদির উপর অনেক বেশী গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে যুক্তি বিচার বিশ্লেষণকে সেই অনুযায়ী প্রাধান্য দেওয়া হয়নি।
(5) ভারতীয় দর্শন শাখা ভিত্তিকঃ ভারতীয় দর্শনে বিভিন্ন শাখা পরিলক্ষিত হয় কিন্তু পাশ্চাত্য দর্শনে সেই পরিমান শাখার অস্তিত্ব দেখা যায় না।
(6) দার্শনিক কেন্দ্রিকতা: পাশ্চাতা দর্শন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তি দার্শনিককে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন, আমরা বলি হেগেলিও সর্বভাববাদ (Absolute Idealism) বা Lock-এর অভিজ্ঞতাবাদ কিন্তু ভারতীয় দর্শনে এই রূপ কোন
ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা দেখা যায় না। (vii) স্বাধীনতাঃ পাশ্চাত্য দর্শনে স্বাধীনতা অর্জন সাপেক্ষ কিন্তু ভারতীয় দর্শন মতে প্রতিটি ব্যক্তিই স্বরূপত স্বাধীন। (viii) জ্ঞানতত্ত্বঃ জ্ঞানতত্ত্বকে দর্শনের উন্নয় শাখাতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেমন। পাশ্চাত্য জ্ঞান তত্ত্বে ইন্দ্রিয় বিষয় সন্নিকর্য জ্ঞানার্জনের প্রথম পদক্ষেপ বলে চিহ্নিত। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে জ্ঞানলাভপ্রক্রিয়া ইন্দ্রিয় নির্ভর। ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে মন, মনের থেকে বুদ্ধি ও বৃদ্ধির উপর আত্মজ্ঞানের অধিষ্ঠান ইত্যাদি ভারতীয় দর্শনে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you