Ticker

100/recent/ticker-posts

Translate

শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ

                   শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ

   ভূমিকা :- যে কোন শিক্ষাববস্থায় মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে গতিশীল এবং উন্নত করনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূল্যায়নের মাধ্যমে বিচার করা হয় শিক্ষার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কিনা। মূল্যায়ন সংক্রান্ত আলোচনা তিনটি পদ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো টেস্ট বা অভীক্ষা, পরিমাপ ও মূল্যায়ন । অনেকে এই তিনটি শব্দকে একই অর্থে ব্যবহার করে থাকেন। যদিও তিনটি শব্দ সমার্থক নয়। তবে একটি সাথে অপরটির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শিক্ষার্থীর আচরণিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হলে প্রয়োজন অভীক্ষা ও পরিমাপের। যে উপকরণ এর সাহায্যে পরীক্ষা নেওয়া হয় তা হলো অভিক্ষা। উত্তর পত্র যাচাই করে তাতে নম্বর প্রধান করাকে বলা হয় পরিমাপ। এই পরিমাপের ভিত্তিতে যখন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তখন তাকে বলা হয় মূল্যায়ন।

পরিমাপ :- J. C. Nunnally, 1981 তার মতেকোন বস্তুর বৈশিষ্ট্যকে পরিমাণ সূচক সংখ্যা হিসাবে প্রকাশ করার যে নিয়মাবলী, তাই হল পরিমাপ।

পরিমাপের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:-

১.বৈধতা (Validity):- পরিমাপ সরঞ্জামটি যে উদ্দেশ্য বা যে বৈশিষ্ট্যটি পরিমাপ করার কথা, সেটিই সঠিকভাবে পরিমাপ করছে কি না তা নিশ্চিত করে।

২.নির্ভরযোগ্যতা (Reliability):- পরিমাপের ফলাফলের ধারাবাহিকতা এবং স্থায়িত্ব নির্দেশ করে। অর্থাৎ, বারবার পরিমাপ করলেও একই ফল আসা।

৩.নির্ভুলতা (Accuracy):- পরিমাপ করা পরিমাণটি প্রকৃত বা বাস্তব মানের কতটা কাছাকাছি, তা নির্ভুলভাবে নিশ্চিত করে।

৪.আদর্শ একক (Standard Unit):- প্রতিটি পরিমাপের জন্য একটি প্রমিত বা আদর্শ একক (যেমন- মিটার, কিলোগ্রাম) প্রয়োজন, যার সাথে তুলনা করে পরিমাপ করা হয়।

৫.সংখ্যান নির্ধারণ (Numerical Assignment):- পরিমাপের মাধ্যমে যেকোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সাংখ্যমান দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

৬.তুলনামূলক প্রক্রিয়া (Comparison):- একটি অজানা বস্তুকে সমজাতীয় জানা বস্তুর (একক) সাথে তুলনা করে পরিমাণ নির্ধারণ করা।

৭.সংবেদনশীলতা (Sensitivity):- পরিমাপের যন্ত্র বা পদ্ধতি কতটা সূক্ষ্মভাবে পার্থক্য বা পরিবর্তন করতে পারে, তা নিশ্চিত করে পরিমাপ।

স্কেল ও পরিমাপ 

স্কেল:- যে একক পর্যায়ক্রম দিয়ে পরিমাপ করা হয় তাকে বলে স্কেল (Scale)।

      ** সাধারণ স্থূল থেকে সূক্ষ্ম পরিমাপের উদ্দেশ্যে চার প্রকার পরিমাপক স্কেল হয়ে থাকে।

পরিমাপনে বিভিন্ন রকমের স্কেলের ব্যবহার করা হয়। Stevens (1946) 4 রকমের স্কেলের উল্লেখ করেছেন। যথা-

(1) নামসূচক স্কেল (Nominal Scale) |

(2) ক্রমসূচক স্কেল (Ordinal Scale)।

(3) ব্যাপ্তিসূচক স্কেল (Interval Scale)।

(4) আনুপাতিক স্কেল (Ratio Scale)।

(1) নামসূচক স্কেল (Nominal Scale):- যখন কোন সংখ্যাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যে তা শুধুমাত্র একটি পরিচয়জ্ঞাপক চিহ্ন হিসাবে কাজ করে তখন ঐ জাতীয় সংখ্যার শ্রেণিকে নামবাচক স্কেল (Nominal Scale) হিসাবে উল্লেখ করা হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যখন কোন রাস্তায় অবস্থিত বাড়িগুলি ১নং, ২নং এইভাবে সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করা হয় তখন প্রকৃত উদ্দেশ্য হল একটি বাড়িকে অন্য সব বাড়ি থেকে পৃথক ভাবে চিনে নেওয়া। এখানে সংখ্যাগুলি বাড়ির কোন বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল নয়, এমনকি, তাদের পারস্পরিক অবস্থানও অনিশ্চিত হতে পারে। অর্থাৎ ১নং বাড়ি পাশেই যে ২নং বাড়ি থাকবে তা নাও হতে পারে। বাস্তবিক ক্ষেত্রে এই স্কেল কোন পরিমাপ সূচক স্কেল নয়, শুধুমাত্রই চিহ্নসূচক স্কেল।

যে পরিমাপ স্কেলে তথ্যকে কেবল নাম বা শ্রেণিভাগ অনুযায়ী বিভক্ত করা হয় এবং কোনো ক্রম বা পরিমাণ নির্দেশ করে না, তাকে নামসূচক স্কেল বলে।

উদাহরণ: লিঙ্গ, ধর্ম, রক্তের গ্রুপ ইত্যাদি।

(2) ক্রমসূচক স্কেল (Ordinal Scale):- যখন পরিমেয় বস্তুর কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন, গরিষ্ঠ থেকে লঘিষ্ঠ, সর্বাধিক থেকে সর্বনিম্ন বা অনুরূপ ক্রমপর্যায়ে বস্তুগুলিকে সাজানো যায় কিন্তু একটি থেকে অপরটি কতটা কম বা বেশি তা পরিস্কার করে বলা যায় না এবং একটি থেকে অপরটির ব্যবধান সমান কি না তাও বলা যায় না, তখন এইরকম ক্রম পর্যায় সূচক সংখ্যাগুলিকে একযোগে বলা হয় ক্রমিক স্কেল (Ordinal Scale)।

যে পরিমাপ স্কেলে তথ্যগুলোকে নির্দিষ্ট ক্রম বা শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী সাজানো হয়, কিন্তু তাদের মধ্যকার পার্থক্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকে না, তাকে ক্রমসূচক স্কেল বলে।

উদাহরণ: প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান; মেধাক্রম ।

(3) ব্যাপ্তিসূচক বা অন্তর স্কেল (Interval Scale):- আন্তর স্কেল অন্তর অর্থাৎ ব্যবধান ভিত্তিক। যখন কোন পরিমাপ এমনভাবে করা হয় যে প্রত্যেকটি একক ব্যক্তি বা বস্তুকে পরিমেয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একটি ক্রমিক অবস্থানে (Rank) চিহ্নিত করা সম্ভব এবং প্রতিটি ক্রমিক অবস্থানের সঙ্গে পূর্ববর্তী বা পরবর্তী অবস্থানের ব্যবধানও একটি নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী স্থির করা হয় কিন্তু পরিমাপের সংখ্যা মানটি সঠিক ভাবে বলা হয় না, তখন এই ধরনের পরিমাপ সূচক স্কেলকে বলা হয় আন্তর স্কেল (Interval Scale)।

যে পরিমাপ স্কেলে মানগুলোর মধ্যে সমান ব্যবধান থাকে, কিন্তু কোনো প্রকৃত শূন্য (Absolute Zero) থাকে না, তাকে ব্যাপ্তিসূচক বা অন্তর স্কেল বলে।

উদাহরণ: সেলসিয়াস ও ফারেনহাইট তাপমাত্রা স্কেল।

(4) আনুপাতিক স্কেল (Ratio Scale):-যখন আন্তর স্কেলের পরিমাপসূচক সংখ্যাগুলি এমনভাবে পরস্পর অবস্থান করে যে, পরপর দুইটি সংখ্যার মধ্যে ব্যবধান সর্বতোভাবে সমান এবং পরিমাপের সূচনা সব সময়ই ০ থেকে শুরু করা যায়, তখন ঐ স্কেলকে বলা হয় অনুপাত স্কেল (Ratio Scale)।

   যে পরিমাপ স্কেলে সমান ব্যবধানের পাশাপাশি একটি প্রকৃত শূন্য (Absolute Zero) থাকে এবং যার মাধ্যমে অনুপাত নির্ণয় করা যায়, তাকে আনুপাতিক স্কেল বলে।

উদাহরণ: উচ্চতা, ওজন, বয়স, আয় ইত্যাদি।

মূল্যায়নের সংজ্ঞা , বৈশিষ্ট , গুরুত্ব

প্রশ্ন:- মূল্যায়নের সংজ্ঞা দাও। মূল্যায়নের বৈশিষ্টগুলি লেখ। মূল্যায়নের বিভিন্ন কৌশলগুলি কী কী ? মূল্যায়নের গুরুত্ব আলোচনা করো। 

মূল্যায়ন - এর সংজ্ঞা :- ( Definition of Evaluation )  মূল্যায়ন শব্দটির সাধারণ অর্থ হল '' মূল্য আরোপ করার কাজ '' । এই মূল্যায়ন শব্দটি শিক্ষাক্ষেত্রে যুক্ত হয়ে এসেছে শিক্ষাগত মূল্যায়ন শব্দটি। আভিধানিক অর্থে তাই শিক্ষাগত মূল্যায়ন হল শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অতীত আচরণের প্রেক্ষাপটে , বর্তমানে সম্পাদিত আচরণের সাপেক্ষে ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পাদনা সম্বন্ধে মূল্য আরোপ প্রক্রিয়া। 

আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞান দার্শনিক , মনোবিজ্ঞানগত , বৈজ্ঞানিক , সামাজিক , নৈতিক ও প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের সমন্বয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। শিক্ষাগত মূল্যায়ন তাই এখানে শিশুর সামাজিক বিকাশ পরিমাপক একটি প্রচেষ্টা বা উপায়। অতএব , শিক্ষাগত মূল্যায়ন এমন একটি জটিল প্রক্রিয়া যার সাহায্যে শিক্ষার্থীর বিভিন্ন আচরণের উপর সামগ্রিক প্রভাব আরোপ করা যায় এবং যা সমাজ , ব্যক্তি বা উভয়ের বিচারে গ্রহণীয়। 

শিক্ষার্থীর বহুমুখী পরিবর্তনের ধারাকে সামগ্রিকভাবে পরিমাপ করতে হলে পরিমাপের যান্ত্রিক কৌশল ও তাত্ত্বিক ভিত্তিকে সামগ্রিক গুণসম্পন্ন করে শিক্ষার লক্ষ্য পূরণের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য মূল্যায়নের ধারণা ও কৌশলকে গ্রহণ করা হয়েছে। তাই Wesley বলেছেন , '' Evaluation is a total and final estimate .''

শিক্ষা প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যের উপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাবিদগণ শিক্ষাগত মূল্যায়নের সংজ্ঞায় বলেছেন , যে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়ায় কোন একটি স্তরের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার লক্ষ্য পূরণের পথে কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে , তা বিচার করা হয় এবং পারদর্শিতা নির্ণয় করা হয় - তাকে বলা হয় শিক্ষাগত মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন দ্বারা শিক্ষার্থীর আচরণের গুণগত ও পরিমাণগত মূল্যমান বিচার করা হয় এবং নির্ণয় করা হয়। 


শিক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্যে মূল্যায়নকে অন্তর্ভুক্ত করে বলা যায় যে , শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার ফলশ্রুতি বিচারের জন্য বা মান নির্ণয়ের জন্য বা তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ করার জন্য যে কৌশল প্রয়োগ করা হয় তাকে বলা হয় মূল্যায়ন। তাই ব্যাপক অর্থে Quillen ও Hanna - র সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে আমরা পাই - 

(ক ) শিশুর আচরণের সামগ্রিক বিচার-বিবেচনার মান নির্ধারণকারী কৌশল হলো মূল্যায়ন। 

(খ ) শিক্ষার্থীর ক্রমিক পরিবর্তনশীল বিকাশ নির্ণয়ের কৌশল হল মূল্যায়ন। 

(গ ) শিক্ষণ ও শিখন - এর গতি নির্ণায়ক ব্যবস্থা হল মূল্যায়ন। 

(ঘ ) শিক্ষার্থীর পারদর্শিতার মূল্যায়ন - এর গুণগত ও পরিমাণগত পরিমাপ হল মূল্যায়ন কৌশল। 

(ঙ ) শিক্ষার্থীর সমগ্র ব্যক্তিত্ব বিকাশকারী ও প্রকাশকারী ব্যবস্থাপনা হল মূল্যায়ন। 

(চ ) শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকের মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ প্রচেষ্টা রচনাকারী ব্যবস্থা হল মূল্যায়ন। 

মুদালিয়র কমিশনের মতে , পুঁথিগত পারদর্শিতা নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাঠক্রম বহির্ভূত দিকগুলোতে শিক্ষার্থীর মনোভাব , আগ্রহ , চিন্তাদর্শ , স্বাস্থ্য ও কাজের অভ্যাস এবং সামাজিক অভিযোজন ক্ষমতা পরিমাপক ব্যবস্থা হল মূল্যায়ন। 

মূল্যায়নের বৈশিষ্ট্য : - ( Characteristics of Evaluation ) 

' শিক্ষা ' একটি কাজ বা প্রক্রিয়া। প্রতিটি কাজের বা প্রক্রিয়ার যেমন মূল্যায়ন প্রয়োজন , তেমনি শিক্ষা প্রক্রিয়াতেও মূল্যায়ন অপরিহার্য। শিক্ষায় এই মূল্যায়নের বৈশিষ্ট্য গুলি হল - 

১. মূল্যায়ন শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে মূল্যায়ন গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করে। 

২. শিখন-শিক্ষণ পরিচালিত হয় পাঠ একক অনুসারে। তাই মূল্যায়ন শিক্ষাক্রমের পাঠভিত্তিক। 

৩. শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর শিখন ও শিক্ষকের পাঠ পরিচালনায় সহায়ককারী মুখ্য প্রক্রিয়া হল মূল্যায়ন। 

৪. মূল্যায়ন গঠনমূলক। শিক্ষার্থীর শিখনকে যথার্থ করে। 

৫. মূল্যায়ন সংশোধনাত্মক প্রক্রিয়া , যার দ্বারা শিক্ষার্থীর কাম্য সামর্থ্য অর্জিত হয় এবং কৃতিত্ব বা পারদর্শিতা অর্জন করে। 

৬. মূল্যায়ন লক্ষ্যভিত্তিক। শিক্ষার বহুমুখী লক্ষ্য সাপেক্ষে মূল্যায়ন পরিচালিত হয় বলে মূল্যায়ন সর্বদা নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখী হয়। 

৭. মূল্যায়ন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বাস্তবায়িত হয়। শিক্ষার্থীর একই আচরণকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিভিন্নতা সাপেক্ষে মূল্যায়নকেও ভিন্ন ভিন্ন ভাবে করা হয়। 

৮. মূল্যায়ন সর্বদা শিক্ষার লক্ষ্য ও শিক্ষার্থীর শিখনলব্ধ অভিজ্ঞতার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে অগ্রসর হয়। 

৯. মূল্যায়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীর কোনো আচরণকে তার বিভিন্ন দিকের তাৎপর্য বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা বিচার করা হয় এবং এই বিচার সাপেক্ষে শিক্ষার্থীর পারদর্শিতার মূল্যায়ন নির্ধারিত হয় বলে মূল্যায়ন একটি জটিল কিন্তু সামগ্রিক মূল্য আরোপের প্রক্রিয়া। অর্থাৎ , মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর সামর্থ্য ভিত্তিক প্রক্রিয়া। 

১০. মূল্যায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কারণ মূল্যায়ন শিক্ষার্থীকে তার বিভিন্ন শিক্ষাক্রমের মধ্যে দিয়ে সর্বাঙ্গীণ বিকাশের স্তরে বা তার ইন্সিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। 

১১. মূল্যায়ন শিক্ষার্থীকে আত্মশিক্ষনে উৎসাহিত করে। শিক্ষার্থী যথার্থ মূল্যায়নে নিজের যোগ্যতা যেমন নির্ণয় করতে পারে তেমনি নিজের শিক্ষা নির্ধারিত পথে অগ্রসর হতে পারে। 

১২. মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর দুর্বলতা নির্ণায়ক। 

১৩. মূল্যায়ন পারদর্শীতাকে জন্মগত ও পরিমাণগতভাবে প্রকাশ করে। 

মূল্যায়নের বিভিন্ন কৌশল :- ( Method of Evaluation ) 

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষন সাপেক্ষে শিখনকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করতে হলে বহুমুখী তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। কোন বিষয়ে উপায় অবলম্বন করে একক প্রচেষ্টা দ্বারা শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সম্ভব নয়। শিক্ষণ দ্বারা শিক্ষার্থীর নানাবিধ আচরণগত পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনসমূহ মূল্যায়নের জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়। কখনও একটি আচরণগত পরিবর্তন পরিমাপ করতে একাধিক কৌশলও ব্যবহার করতে হয়। 


শিক্ষণ-শিখন সাপেক্ষে যেসকল মূল্যায়ন কৌশল প্রয়োগ করা হয় , সেগুলি হল - 

১. পরীক্ষা ( Examination ) 

২. অভীক্ষা ( Test ) 

৩. তথ্য সংগ্রহ ( Data Collection ) 

৪. পর্যবেক্ষণ ( Observation ) 

৫. সাক্ষাৎকার ( Interview ) 

৬. গৃহ পরিদর্শন।  

মূল্যায়নের গুরুত্ব :- ( Significance of Evaluation ) 

শিক্ষার ধারাবাহিক পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার পথে একজন শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে বর্ধিত ও বিকশিত হয়। এই শিক্ষা প্রক্রিয়াকে আদর্শ এবং শিক্ষার্থীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে কার্যকরী করে তোলে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া। প্রাচীন যুগ থেকে আজ অবধি এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হলেও এর গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব বহুমুখী। 

১. শিক্ষার ধারা ঘটমান পরিবর্তনকে যথার্থভাবে বিচার করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার্থীর সার্বিক মূল্যায়ন। 

২. আজকের শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশের সঙ্গে সমন্বয় দ্বারা শিক্ষার্থীরা অকারণ পরিবর্তনকে বিচার করে মূল্যায়ন। 

৩. আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্যাভিমুখী মূল্যায়ন ব্যবস্থাও পরিবর্তিত পরিবর্ধিত। 

৪. শিক্ষার্থীর বহুমুখী আচরণধারার প্রকৃত তাৎপর্য বিচারকরণের জন্য প্রয়োজন হয় মূল্যায়ন। 

৫. মূল্যায়ন শ্রেণি শিক্ষনে বিভিন্নতা নিয়ে আসে। 

৬. মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত পাঠক্রমেও যথার্থতা নির্ধারণ করে। 

৭. শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কর্মসূচির নির্ধারক হলো মূল্যায়ন। 

৮. শিক্ষণলব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগ ও দক্ষতার যথার্থতা নির্ধারণ করে মূল্যায়ন। 

৯. মূল্যায়ন ব্যবস্থা শিক্ষা প্রশাসকের দক্ষতা নির্ণয়ে সহায়তা করে। আবার শিক্ষা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনারও উপযুক্ততা নির্ণয় করে মূল্যায়ন। 

১০. পশ্চাৎপদ শিক্ষার্থীদের যথার্থ শিক্ষার ব্যবস্থাপনা করতে সহায়তা করে মূল্যায়ন। 

১১. মূল্যায়ন শিক্ষার্থীকে উন্নততর শিখনের সহায়ক। 

১২. মূল্যায়ন বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে থাকে।  

১৩. শিক্ষক / শিক্ষিকা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শিখনের জন্য যে পদ্ধতি ও কৌশলগুলি ব্যবহার করছেন তার যথার্থতা নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন মূল্যায়ন। 


 অভীক্ষা :- ইংরেজি Test কথাটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। "টেস্ট" বলতে আমরা কখনও বুঝি পরীক্ষা তা যাচাই, যেমন:- টেস্ট পরীক্ষা, কখনো বুঝি পরীক্ষা নেওয়া । শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানে Test শব্দটির অর্থ একটি ভিন্নতর। 

 ✒ আপনাদের মনে এবার স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে Test বা অভীক্ষা বলতে তাহলে কী বোঝায়।

 অভীক্ষা বা Test :- আপনারা নিশ্চয়ই শিক্ষা জীবনে বহুবার পরীক্ষা দিয়েছেন । স্কুল ও কলেজ থেকে এক শ্রেণীর থেকে অন্য শ্রেণীতে উন্নীত হওয়ার জন্য, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যয়ন শেষে সার্টিফিকেট লাভের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষা, এমনকি চাকরির পাবার জন্য আপনারা পরীক্ষা দিয়ে থাকেন। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, এসব পরীক্ষায় আপনাদের সামনে এক সেট প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়েছে, যার উত্তর আমাদের প্রত্যেককে স্বতন্ত্রভাবে দিতে হয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যেকটি পরীক্ষার জন্যই এক বা একাধিক শের প্রশ্নপত্র ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আপনাদের এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে কখনো মৌখিকভাবে, কখনো লিখিতভাবে।

         *এই যে, প্রশ্নের সেট বা প্রশ্নপত্র, এগুলোকে বলা হয় অভিক্ষা।

**শিক্ষা ক্ষেত্রে Test এর চলিত বাংলা প্রতিশব্দ অভীক্ষা।

~বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ম্যারী এ. গ্রণল্যান্ড(Marie A. Grondlound) ও জয়সি ই.( Joyce E. Linn) লিন এর মতে~ "the test is the set of question" সুতরাং বলা যায়, "পরীক্ষা গ্রহণের জন্য যে প্রশ্নপত্র উপকরণ বা কৌশল ব্যবহৃত হয় তাকে অভিক্ষা বলে।" 

যেকোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এ গুলোকেই বলা হয় অভীক্ষা। যেমন - এসএসসি, এইচএসসি বাউবি এসএসসি ব্যবহারিক অংশের প্রশ্নপত্র কৌশলদি, বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন । 

শিক্ষামূলক অভিক্ষা :- শিক্ষামূলক অভিক্ষা হল সে উপকরণ বা হাতিয়ার বা যন্ত্র বা কৌশল যার সাহায্যে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান বা পারদর্শিতা যাচাই করে তাদের পরস্পরের শিক্ষাগত পার্থক্য নিরূপণ করা হয়।

অভীক্ষার বৈশিষ্ট্য:- প্রদত্ত সংজ্ঞা কে বিশ্লেষণ করলে অভীক্ষার যেসব বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় তা নিচে আলোচনা করা হলো।

১) একসেট প্রশ্ন:- অভীক্ষা হলো এক সেট প্রশ্ন বা কার্যের যা শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

 ২)স্বতন্ত্রভাবে সম্পাদন:- একসেট প্রশ্ন এসব প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার এর স্বতন্ত্রভাবে দিতে হয় বা এসব কার্যাবলী স্বতন্ত্রভাবে সম্পাদন করতে হয়।

৩) শিক্ষাগত পার্থক্য:- প্রাপ্ত ফল শিক্ষার্থীদের পরস্পরের মধ্যে শিক্ষাগত পার্থক্য নিরূপনে ব্যবহার করা হয়।

৪) সংখ্যায় প্রকাশযোগ্য:- অভীক্ষার ফল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

অভীক্ষার গুরুত্ব :- অভীক্ষা ও তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা থেকে আমরা অপেক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে খানিকটা ধারণা করতে পারি। অভিজ্ঞ শিক্ষার্থীদের পরস্পরের পার্থক্য নিরূপণ, শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শ্রেণীতে প্রমোশন দেওয়া, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা নিয়ে সহায়তা করে। এছাড়াও অভিক্ষা অন্যান্য শিক্ষা মূলক কাজে ব্যবহৃত হয়। নিচে অভীক্ষার কয়েকটি গুরুত্ব উল্লেখ করা হল-

১) অভীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে শিক্ষকদের উচ্চতর শ্রেণীতে প্রমোশন দেওয়া হয়।

২) শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য জন্য শিক্ষকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই স্বতন্ত্র জানতে অভিক্ষা সহায়তা করে।

৩) শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা সনাক্ত করে তাদের উন্নতির জন্য সঠিক নির্দেশনা প্রদান অভিক্ষা শিক্ষক এবং নির্দেশক বা counsellor কে সহায়তা করে।

৪) অভীক্ষা তৈরীর প্রক্রিয়া শিক্ষকের নিকট প্রদত্ত কোর্সের উদ্দেশ্য আরও নির্দিষ্ট, স্পষ্ট ও অর্থবহ করে তোলে।

৪) অভীক্ষার বাস্তব প্রয়োগ শিক্ষার্থীদের শিখন এর অধিক আগ্রহী করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ