প্রশ্ন:- শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিন। শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের প্রকৃতি বর্ণনা করুন। শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ আলোচনা করুন। শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের পরিধি বিবৃত করুন।
ভূমিকা:- বর্তমানে ব্যক্তি, সমাজ এবং জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। শিক্ষাও এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার এত বিস্তৃতি লাভ করেছে যে, শিক্ষাপ্রযুক্তি পৃথকভাবে অধ্যয়নের বিষয় হিসেবে বর্তমানে স্বীকৃতি লাভ করেছে।শিক্ষাপ্রযুক্তি হল অধ্যয়নের একটি বিষয়, যার লক্ষ্য হল প্রযুক্তিবিদ্যা, তথ্য সংক্রান্ত বিজ্ঞান, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, আচরণের বিজ্ঞান এবং মানব প্রযুক্তির সাহায্যে শিক্ষায় উৎকর্ষ নিয়ে আসা।
আধুনিক কালে 'শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান' হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ও প্রসারের মূল চাবিকাঠি। শুধু তাই নয় সকলের জন্য শিক্ষা এই সামাজিক প্রক্রিয়ার সর্বজনীন আবেদন ও স্বীকৃতি লাভের ক্ষেত্রে 'শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান' বিশেষ সামাজিক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। তাই একে একটি বিশেষ সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে অনেকে মনে করে থাকেন। শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান একদিকে যেমন শিক্ষণ তত্ত্ব, উপকরণ ও প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত অন্যদিকে এই প্রযুক্তি বিজ্ঞান মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্ক যুক্ত। তাই শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানকে শুধুমাত্র শিক্ষালাভের প্রধান চাবিকাঠি না ভেবে 'শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান'কে অনেকে শিক্ষা উন্নয়নের একটি সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে মনে করেন।
শিক্ষাপ্রযুক্তির সংজ্ঞা:- শিক্ষার ব্যবহৃত অন্যান্য শব্দের মতো শিক্ষাপ্রযুক্তিকেও নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
1. ডিপার্টমেন্ট অফ এডুকেশন অ্যান্ড সায়েন্স (U.K.): শিক্ষাপ্রযুক্তি হল মানুষের শিখন উৎকর্ষর জন্য তন্ত্র (সিস্টেম), কৌশল এবং সাহায্যকারী উপকরণের বিকাশ, প্রয়োগ এবং মূল্যায়ন।
2. জে. ব্লমার (J. Bloomer, 1973):- শিক্ষাপ্রযুক্তি হল শিক্ষা সম্পর্কিত বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান, যা বাস্তব শিখন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা হয়।
3. অধ্যাপক শিব কুমার মিত্র (1960):- শিক্ষাপ্রযুক্তি হল কৌশল এবং পদ্ধতির বিজ্ঞান, যার সাহায্যে শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
4. ইউ. এস. প্রেসিডেন্ট কমিশন অফ এসকোয়ারি (1970):- মানুষের শিখন এবং যোগাযোগের উপর গবেষণার ফলে যে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে তার ভিত্তিতে সমগ্র শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক নকশাকরণ, পরিচালনা এবং মূল্যায়নকেই শিক্ষাপ্রযুক্তি বলে।
5. এস. এস. কুলকার্নি (1968):- শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নীতি এবং সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলিকে প্রয়োগ করাকেই শিক্ষাপ্রযুক্তি বলে।
6. ন্যাশনাল সেন্টার ফর প্রোগ্রাম লার্নিং:- শিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণে উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য শিক্ষণ এবং শিখনের শর্তাবলি সম্পর্কীয় বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের ব্যবহারকে শিক্ষাপ্রযুক্তি বলে।
7. কমিশন অফ ইন্সট্রাকশন টেকনোলজি (U.S.A.):- গবেষণাভিত্তিক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে সমগ্র শিখন এবং শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে ধারাবাহিক ভাবে নকশাকরণ, বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নই হল শিক্ষাপ্রযুক্তির কাজ।
প্রকৃতি:-
বিভিন্ন চিন্তাবিদরা শিক্ষা প্রযুক্তির বিভিন্ন উপাদান ও তার বৈশিষ্ট্যগুলোকে বিভিন্ন ভাবে উপস্থাপনা করেছেন। একদিকে যেমন মানব সম্পদ ও শেখানোর পদ্ধতির উপযুক্ততা ও প্রয়োগ নিয়ে উল্লেখ হয়েছে, তারই পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে নানা শিক্ষণ উপকরণ, যন্ত্রাদি, গণমাধ্যম ও দৃশ্য-শ্রাব্য উপকরণের কার্যকরী ব্যবহার ও যথার্থ উপস্থাপনার। পূর্ব আলোচ্য সংজ্ঞাগুলো থেকে শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের নানা বৈশিষ্ট্য সমন্ধে জানা যায়। সেগুলি হল।
(১) বৈজ্ঞানিক রীতিনীতির প্রয়োগ:- শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক রীতিনীতির প্রয়োগ করা শিক্ষা প্রযুক্তির বিদ্যা একটি অন্যতম প্রকৃতি।
(২) শিক্ষণ-শিখন পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটানো:- শিক্ষণ-শিখন কে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশলের পরিমার্জন, পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটানো।
(৩) শিখন প্রক্রিয়াকে সহজ করা:- উপযুক্ত মাধ্যম ও পদ্ধতির নির্ধারণ করে শিখন প্রক্রিয়াকে সহজ ও ত্বরান্বিত করা প্রযুক্তির বিদ্যার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
(৪) উপযুক্ত পরিবেশ রচনা করা:- শিক্ষার মূল লক্ষ্যকে চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে পঠন-পাঠনের উপযুক্ত পরিবেশ রচনা করা।
(৫) বিভিন্ন কৌশলের নকশা প্রস্তুত করা :- শিখনের ফলশ্রুতি পরীক্ষা করা ও মূল্যায়ন করার জন্য বিভিন্ন কৌশলের নকশা করা ও তা প্রস্তুত করা।
(৬)প্রযুক্তি বিজ্ঞান জড়িত:- শিক্ষার উৎকর (Input), প্রক্রিয়া (Process) এবং ফলাফল (output) এই তিনটি স্তরের সাথেই শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান জড়িত।
(৭)সামগ্রিক প্রক্রিয়া ও পরিস্থিতির উপর গুরুত্ব আরোপ :- শুধুমাত্র প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে আবন্ধ না থেকে শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান শিক্ষার সামগ্রিক প্রক্রিয়া ও পরিস্থিতির উপর গুরুত্ব আরোপ করে।
(৮) সঠিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ার মাধ্যম:- শিক্ষা ক্ষেত্রে সঠিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সাথে শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।
(৯) শিক্ষকের গুরুত্ব :- শিক্ষাক্ষেত্রে পড়ুয়ার চাহিদা, ক্ষমতা ও প্রেরণাকে যেমন গুরুত্ব দেয় তেমনি শিক্ষকের সক্রিয় ভূমিকাকে যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করে।
(১০) সম্মিলিত প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া:-শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান উপকরণ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিকে আলাদা ভাবে না দেখে এদের সম্মিলিত প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেয়।
পরিশেষে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে যে শিক্ষার মূল লক্ষ্যকে স্থির রেখে শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়া যথার্থভাবে পরিচালিত করার উদ্দেশ্য- তথ্যপ্রচার ব্যক্তি ও শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন অনুসারে শিক্ষণকে স্থির করা
রীতি-সম্মত প্রয়াসে শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়া সঞ্চালিত করা।
শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের প্রকৃতি হলো এটি একটি গতিশীল, প্রায়োগিক এবং আন্তঃবিষয়ক ক্ষেত্র যা শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের নীতি ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে; এর লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষণকে আরও কার্যকর, আকর্ষণীয় ও সুশৃঙ্খল করা, যা শিক্ষণ সামগ্রী, পদ্ধতি, পরিবেশ এবং মূল্যায়নকে systematize করে। এটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার নয়, বরং শেখার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াকে বোঝা এবং উন্নত করার বিজ্ঞান।
শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের মূল বৈশিষ্ট্য:
বৈজ্ঞানিক ভিত্তি: মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, আচরণ বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং গণিতের মতো বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার জ্ঞান ব্যবহার করে শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ ও উন্নত করে।
সিস্টেম্যাটিক পদ্ধতি (Systematic Approach): এটি একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে শিখন পরিবেশ, উপকরণ, শিক্ষার্থী এবং শেখার প্রক্রিয়াকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা হয়।
প্রয়োগিক ও কর্মমুখী: এটি তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষণ-শিখনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তব কৌশল ও উপকরণ তৈরি ও প্রয়োগ করে, যেমন মাল্টিমিডিয়া, ইন্টারেক্টিভ বোর্ড, প্রোগ্রামড লার্নিং ম্যাটেরিয়ালস ইত্যাদি।
গতিশীল ও প্রগতিশীল: এটি স্থির নয়; নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণার সাথে সাথে এটি ক্রমাগত পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়।
আন্তঃবিষয়ক (Interdisciplinary): এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তি নয়, বরং শিক্ষাবিজ্ঞান (Pedagogy) এবং বিষয়বস্তু (Subject Matter) - উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।
মাধ্যম, লক্ষ্য নয় (Means, not an End): শিক্ষা প্রযুক্তি নিজেই শেষ কথা নয়, বরং এটি একটি 'উপায়' বা 'মাধ্যম' যার সাহায্যে শিক্ষার উদ্দেশ্য (যেমন ভালো ফলাফল, সামগ্রিক বিকাশ) অর্জন করা যায়।
'সফটওয়্যার' ও 'হার্ডওয়্যার' উভয়ই: এতে হার্ডওয়্যার (কম্পিউটার, প্রজেক্টর) এবং সফটওয়্যার (শিখন কৌশল, পদ্ধতি, ডিজাইন) উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
দক্ষতা বৃদ্ধি: এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের কর্মদক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং সীমিত সম্পদ দিয়ে ব্যাপক শিক্ষা প্রসারে সহায়তা করে।
সংক্ষেপে, শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান হলো শিক্ষার লক্ষ্য পূরণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুচিন্তিত ও নিয়মতান্ত্রিক প্রয়োগ, যা শিক্ষাকে আরও কার্যকর ও অর্থবহ করে তোলে।
শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য (Objectives of Educational Technology):-
শিক্ষা প্রযুক্তি বিদ্যার প্রধানত দুই ধরনের উদ্দেশ্য আছে, সাধারণ ও বিশেষ উদ্দেশ্য:
১.৫.১ সাধারণ উদ্দেশ্য (General Objectives):-
(১) চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্য চিহ্নিত করন:- সমাজের চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষার মূল লক্ষ্যগুলি চিহ্নিতকরণ ও নির্ধারণ করা।
(২)কর্মসূচী ও পরিকাঠামোকে নির্দেশ করা:- শিক্ষার মূল লক্ষ্য, মুখ্য কর্মসূচী ও পরিকাঠামোকে নির্দেশ করা।
(৩) মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ:- বিজ্ঞান, কলা ও মানবিক মূল্যবোধের কার্যকরী সমন্বয় ঘটিয়ে পাঠক্রম প্রস্তুত করা।
(৪)কর্মপদ্ধতি চিহ্নিত করন :- শিক্ষার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর উদ্দেশ্যে উপযুক্ত সম্পদ (মানব ও বস্তু) ও কর্মপদ্ধতি চিহ্নিত করা।
(৫) সঠিক মডেল তৈরি করা:- শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার উন্নয়ন কার্যকরী করার উদ্দেশ্যে সঠিক মডেল তৈরি করা।
(৬) শিক্ষার বাধা প্রতিরোধ করার উপায় নির্দেশ করা:- শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধাগুলোকে শনাক্ত করা ও তা প্রতিরোধ করার উপায় নির্দেশ করা।
(৭) স্বয়ং শিখনের সুযোগ বৃদ্ধি:- পড়ুয়াদের মধ্যে স্বয়ং শিখন ও স্বাধীন পাঠের সুযোগ বৃদ্ধি করা।
(৮)জাতীয় শিক্ষা কর্মসূচীর আওতায় অন্তর্ভূক্ত :- অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে জাতীয় শিক্ষা কর্মসূচীর আওতায় নিয়ে আসা।
(৯)বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ:- সমাজের প্রত্যেকের জন্য শিক্ষা, বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া।
(১০) শিখন-শিক্ষা প্রক্রিয়া ও মূল্যায়নকে পরিচালিত :- কার্যকরী শিক্ষা কর্মসূচী রূপান্তরিত করার পক্ষে সুসংবদ্ধ ভাবে (system approach) পরিকল্পনা, শিখন-শিক্ষা প্রক্রিয়া ও মূল্যায়নকে পরিচালিত করা।
(১১)সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি:- শিক্ষা তত্ত্ব সম্প্রচার করা ও সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
(১২)শিক্ষার মান উন্নয়ন করা:- উন্নতমানের উপকরণ সরবরাহ করে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা।
বিশেষ উদ্দেশ্য (Specific Objective) অথবা শ্রেণি কক্ষের প্রেক্ষিতে শিক্ষা কর্মসূচীর লক্ষ্য (Objectives of educational Technology interms of Specific Classroom Teaching):-
(১) প্রারম্ভিক জ্ঞানের পর্যালোচনা:- শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীর প্রারম্ভিক জ্ঞানের স্তর, বৈশিষ্ট্য ও চাহিদাগুলিকে পর্যালোচনা করা ও চিহ্নিত
(২)শিক্ষামূলক লক্ষ্যকে নির্ধারণ:- কোন শ্রেণিকক্ষের শিক্ষামূলক লক্ষ্যকে নির্ধারণ করা, তার পরিপ্রেক্ষিতে কোন সেই শ্রেণির জ্ঞানমূলক, প্রাক্ষাৎ মূলক ও সঞ্চালন মূলক নিরূপণ করা।
(৩) ক্রমানুযায়ী জ্ঞানের ধারণা ও পর্যায় অনুযায়ী সুবিন্যস্ত করা:- শ্রেণি কক্ষের পাঠ্যক্রমে পাঠ্যসূচীর পাঠকে পর্যালোচনা করা ও তাদেরকে ক্রমানুযায়ী জ্ঞানের ধারণা ও পর্যায় অনুযায়ী সুবিন্যস্ত করা।
(৪) উপকরণ- এর ব্যবহার:-শ্রেণিকক্ষের পাঠক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে উপকরণ ও সম্পদ শনাক্ত করা ও ব্যবহার করা।
(৫) শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক শিক্ষার্থী উপকরণ, শিখন-শিক্ষণ পদ্ধতি, প্রতিন্যাস (Attitude), প্রতিসংকেত (Feed back), মূল্যায়নের নিরীখে উপযুক্ত মিথক্রিয়ার (Classroom interaction) চিহ্নিত ও সুপরিচালিত করা।
(৬)শিখন-শিক্ষণ কর্মসূচীর মূল্যায়ন :- শিক্ষার্থীর সম্পাদিত কার্য ও আচরণের নমুনা অনুযায়ী শিখন-শিক্ষণ কর্মসূচীর মূল্যায়ন করা।
(৭)পারস্পরিক প্রতিসংকেত দান :-শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক প্রতিসংকেত (Feed back) দানের মাধ্যমে শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ার সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা। দানের মাধ্যমে শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ার সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা।
ম্যাক্রোস্তরীয় উদ্দেশ্যাবলি বলতে বোঝায় শিক্ষার ব্যাপক লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষাপ্রযুক্তির ভূমিকা। এইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ① জনসমষ্টির শিক্ষার চাহিদা এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা নির্দিষ্ট করা। ② শিক্ষার লক্ষ্য, কৌশল এবং কাঠামো স্থির করা। ③ উপযুক্ত পাঠক্রম প্রণয়ন করা। এ শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে মানুষ, উপকরণ, সম্পদ এবং কৌশল নির্ধারণ করা। ⑤ শিক্ষা-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার উন্নতিকরণে শিক্ষণ মডেল রচনা করা। ⑥ পরিবেশের বাধাগুলিকে চিহ্নিত করে, তার প্রতিকারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ⑦ জনগণ বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত শ্রেণির জন্য বৃত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা। (৪) পরিকল্পনাকরণ, তার বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়ন-সহ সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিচালিত করা। একই সময়ে বহু সংখ্যক শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছোনো। (10) স্ব-শিখনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
মাইক্রোস্তরের উদ্দেশ্যাবলি বলতে বোঝায় শ্রেণিকক্ষভিত্তিক উদ্দেশ্যাবলি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- শিক্ষার্থীদের চাহিদা এবং বৈশিষ্ট্যাবলিকে নির্দিষ্ট করে তার বিশ্লেষণ করা। ② শ্রেণিকক্ষে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য স্থির করা এবং আচরণের ভিত্তিতে ব্যক্ত করা। ③ পাঠদানের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে তাকে উপযুক্তভাবে বিন্যস্ত করা। ④ সহজলভ্য শিক্ষা-শিখন উপকরণ এবং সম্পদকে চিহ্নিত করা। ⑤ শিক্ষার উপব্যবস্থা সকল যেমন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা-শিখন উপকরণ, বিষয়বস্তু এবং পদ্ধতি ইত্যাদির মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার প্রকৃতি নির্ধারণ। শিক্ষার্থীদের পারদর্শিতা বা আচরণের পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে শিক্ষকের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা। ⑦ শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়ার সংশোধনের জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের কাছে উপযুক্ত ফিডব্যাক সরবরাহ করা। ⑧ শ্রেণিশিক্ষণকে আরও কার্যকরী করে তুলতে উপযুক্ত শিক্ষাপোকরণ ব্যবহার করা।
পরিধী:- শিক্ষা প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হল শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে সহজ ও ত্বরান্বিত করা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন করা। তাই শিক্ষা প্রযুক্তির পরিসর সুবিশাল। এই শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান একদিকে যেমন মূর্ত শিক্ষা পরিকাঠামোতে (Formal system) যুক্ত: তেমনি এর কার্যকারিতা বিমূর্ত শিক্ষা পরিকাঠামোতে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। শিক্ষ্য প্রযুক্তির পরিসর সম্বন্দে আলোচনা করতে গেলে প্রথমে জেনে নিতে হবে কি প্রসলো এই শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সংজ্ঞাকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে শিক্ষাপ্রযুক্তির একদিকে যেমন ব্যক্তি ও শিক্ষা কার্যক্রমের প্রয়োজন অনুসারে শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করে তেমনি বিজ্ঞানভিত্তিক ও রীতিসম্মত পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষে তথ্য সম্প্রসারণ, শিক্ষণ নানা উপকরণ ও সম্পদের সনাক্তকরণ ও ব্যবহারের দিকে নজর দিয়ে থাকে তাই দেশে শিক্ষার প্রসার ও গুণগতমান উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান প্রায় সর্বস্তরের শিক্ষা এই পঠন-পাঠন প্রক্রিয়াকে প্রত্যাশা ও চাহিদা মাফিক পরিচালনা করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান সাধারণ ভাবে তিনটি পরিসরের কথা বলেছে। যথা,
(১)নির্দেশদান প্রক্রিয়া:- শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুসারে নির্দেশদান প্রক্রিয়া পরিচালনা করা।
(২) প্রশাসন ও পরিচালনা ব্যবস্থা:- শিক্ষামূলক প্রশাসন ও পরিচালনা ব্যবস্থাপনার প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তি বিজ্ঞান।
(৩) মূল্যায়ন সংক্রান্ত:- শিক্ষাক্ষেত্রে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সংক্রান্ত প্রযুক্তি বিজ্ঞান।
নিম্নরূপ রাওস্থা (Rowntra, 1973) শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের ছয়টি বিশেষ পরিসরের কথা বলেছেন। সেগুলি
(১) শিখনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা
(২) শিখনের পরিবেশ পরিকল্পনা করা
(৩) সঠিকভাবে বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা করা
(৪) যথাযথ শিক্ষন পদ্ধতি ও মাধ্যম নির্ধারণ করা
(৫) শিখনের মূল্যায়ন করা
(৬) মূল্যায়ন থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের মাধ্যমে শিক্ষণ শিক্ষা প্রক্রিয়াকে কার্যকর করা।
এই মর্মে আগরওয়াল (Aggarwal, 1995) শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের পরিসর হিসেবে আরো কয়েক দিকের কথা উল্লেখ করেছেন। উপরোক্ত বিষয়ের সাথে সাথে শিক্ষাপ্রযুক্তি বিজ্ঞান বিশেষ ভাবে সূচীবব শিখন, শিখনের মডেল, শিখনের তত্ত্ব, বহুধা মাধ্যম দৃষ্টিভঙ্গী (Multimedia approach) ম্যাথেম্যাটিক্স সাইবার নেটিকস্, সিস্টেম দৃষ্টিভঙ্গী, মুক্তশিক্ষা, দূরশিক্ষা, মডিউলস, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জড়িয়ে বলেছে। এই সমস্ত বিভিন্ন দিক গুলোর সাথে শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের অন্যতম বিশেষ পরিসর হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশ্বায়ন, দ্রুতপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার মাধ্যমে ব্যাক্তি ও সামাজিক উন্নয়ন ও গুণগত মান বৃদ্ধি করা।
সীমাবদ্ধতা:- শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা (Limitations of Educational Technology):- শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান সমস্যা দেখা যায়। এই সমস্যাগুলি হচ্ছে-
(১)উপযুক্ত ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব:- শিক্ষা কেন্দ্রে বা বিদ্যালয় গুলিতে অনেক সময় উপযুক্ত ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব। এই কারনে মিথস্ক্রিয়া অনেক সময়ই অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাবে সম্পূর্ণ হতে পারে না।
(২) শিক্ষা প্রযুক্তির অপব্যবহার:- নানা কারণে শিক্ষা প্রযুক্তির অপব্যবহার।শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়াকে ব্যহত করে।
এছাড়াও আরও অনেক কারন রয়েছে সেগুলো হলঃ -
(৩)উপযুক্ত পরিবেশের অভাব:- শিক্ষা প্রযুক্তি ভালোভাবে চালানোর জন্য চাই বিদ্যালয়ে উপযুক্ত পরিবেশ। উপযুক্ত পরিবেশ না হলে প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হয়। এটি একটি প্রযুক্তি বিদ্যার অন্যতম বাধা।
এই সব কারণে শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়াকে ব্যহত করে। অথবা মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
শিক্ষা প্রযুক্তির সঠিকভাবে প্রয়োগ করার জন্য চাই উপযুক্ত পরিবেশের মাধ্যমে শিক্ষার জ্ঞান, প্রক্ষোভমূলক ও সঞ্চালন মূলক লক্ষ্যের সাথে মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সুসংহত মিথস্ক্রিয়া ঘটানো। এই মেলবন্ধন বা মিথস্ক্রিয়া অনেক সময়ই অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাবে সম্পূর্ণ হতে পারে না। তাই শিক্ষা প্রযুক্তির ব্যবহার অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
শিক্ষা প্রযুক্তির ব্যবহারের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে একে কি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখা হচ্ছে। অনেক সময় শিক্ষা প্রযুক্তির ব্যবহার শুধুমাত্র দৃশ্য-শ্রাব্য উপকরণ, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির উপর ইত্যাদিতে সীমাবন্দ রাখা হয়। অর্থাৎ এখানে উপকরণের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষা প্রযুক্তির ধারণাকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আবার কখনো একে শিক্ষা পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার উন্নয়নের কৌশল হিসেবে শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানকে গণ্য করা হয়। উপযুক্ত কৌশল শিক্ষার তাৎক্ষণিক লক্ষ্যে পৌছতে সহজ করে তোলে। তবে এই প্রতিক্রিয়া কার্যকরী করার জন্য চাই শিক্ষকের অন্তদৃষ্টি ও উপযুক্ত শিক্ষণ ক্ষমতা ও শিখনের পরিবেশ। এই তিনটি উপাদান একে অন্যের পরিপূরক হয়ে শিক্ষা কর্মসূচী সম্পন্ন করে। এদের মধ্যে কোন একটির অভাব হলে প্রত্যাশা মাফিক শিক্ষার ফললাভ হওয়া সম্ভব নয়।
শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের উপাদান (Components of Educational Technology):- শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের উপাদান হলো সাধারণত দুই ধরনের -1 hardware 2 software
শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞান পড়ুয়ার শিখন প্রক্রিয়ার উন্নয়নের লক্ষে যথোপযুক্ত সিস্টেম, কৌশল, সহায়ক উপকরণ তৈরি করা এবং এগুলির যথাযথ প্রয়োগ ও মূল্যায়ন করার দিকে মূলতঃ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই শিক্ষাপ্রযুক্তি বিজ্ঞানকে দুটি প্রধান উপাদানে ভাগ করা যেতে পারে-
(১) শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে সহজ ও উন্নতর করার জন্য শিক্ষা প্রযুক্তিকরণ (Technology of education) আর দ্বিতীয়টি
(২) শিক্ষা বিজ্ঞানে নানা প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োগ (Technology in education) এই প্রথম উপাদানের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেকে Soft-ware সফটওয়ার বলে থাকেন। আর দ্বিতীয় উপাদানকে হার্ডওয়ার (Hardward) বলে ধরে থাকেন।
সফটওয়ার দৃষ্টিভঙ্গী (Software Approach):- ব্যক্তিকে যথাযথ প্রক্রিয়া ও পরিবেশের মাধ্যমে জীবন পথে এগিয়ে নিয়ে চলা অথবা জীবনোপযোগী কৌশল ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করাই হল শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের বিশেষ লক্ষা। ব্যপক অর্থে শিক্ষার্থীর মধ্যেকার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বা শক্তিকে যথাযথভাবে প্রকাশ করার কাজই হল শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের। ব্যক্তিগত জীবনে ও সমাজজীবনের চলার পথে মানুষ নানাভাবে অভিজ্ঞতা বা কৌশল আয়ত্ত করে থাকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে নিজের ক্ষমতা, চাহিদা, প্রেষণা ইত্যাদির সাথে পড়ুয়াকে তার পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক চাহিদার
দূরাগত শিক্ষা কাকে বলে ? দূরাগত শিক্ষার বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য । সুবিধা ও অসুবিধা গুলি আলোচনা করো।
Distance Education And Open Education||দূরাগত শিক্ষা এবং মুক্ত শিক্ষা
BENGALI VERSION ENGLISH VERSION
Distance And Open Education's Concept, characteristics, Objectives, Advantage And Disadvantages.
Assignment Questions -
1. What is Distance Education. what is the Characteristics And Objectives Of Distance Education.
2. Write Down Advantage And Disadvantages Of Distance Education.
3. What is Open Education.what is the Characteristics And Objectives Of Open Education.
4. Write Down Advantage And Disadvantages Of Open Education.
1. দূরাগত শিক্ষা ব্যবস্থা-
1.1.1. ভূমিকা -
দূরাগত শিক্ষা এক বিশেষ ধরনের শিক্ষা,যা নিরবিচ্ছিন্ন ও সরাসরি শিক্ষকের তত্ত্বাবধানের ঘটে না,যার জন্য বক্তৃতার প্রয়োজন নেই এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বা ছাপানো কাগজের মাধ্যমে ঘটে থাকে।
Distance Education হল শিক্ষকদের দ্বারা পরোক্ষ নির্দেশনা, কারণ এক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটে না এবং এটা সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত নিয়মের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে।
অধ্যাপক হোমবাগ দূরাগত শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, "The various forms of study at all level which are not under the continuous, immediate supervision of tutors present with their students in lecture rooms or on the some premises,but which never the less, benefit from the planning, guidance and tuition of a tutorial organisation."
ডেভিড বাটস্ দূরাগত শিক্ষা সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন - "Those which offer students measure of fiexibility and autonomy,to study the programmes of their choice when and where they wish,and at a pace, to suit there circumstances."
• দূরাগত শিক্ষার ধরন -
পত্রাচারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর কাছে Course Metrial পৌঁছে দেওয়া হয়।
রেডিয়োর মাধ্যমে দূরাগত শিক্ষা সুদুর গ্ৰামাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া যায়।
টেলিভিশন সম্প্রচারের মাধ্যমে এই শিহ্মাকে আরও আকর্ষণীয় করা যায়।
মুক্তশিক্ষা বর্তমানে দূরাগত শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গের ইন্দিরা গান্ধী ও নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
1.1.2. দূরাগত শিক্ষার বৈশিষ্ট্য -
দূরাগত শিক্ষার বৈশিষ্ট্যগুলি হল -
১. নমনীয়তা -
এই শিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে অনেক নমনীয়তা রয়েছে। এই শিক্ষার ক্ষেত্রে সময় বা স্থানের কোনো বাধ্য বাধকতা নেই। শিক্ষার্থী তার সুবিধা মতো স্থানে নিজের সময় মতো অধ্যায়ন করতে পারে।
২. নন - ফর্মাল শিক্ষা -
দূরাগত শিক্ষাকে নন - ফর্মাল শিক্ষাও বলা যেতে পারে।কারণ এটি প্রথাযুক্ত শিক্ষা নয়।এটি পত্রাচারের শিক্ষা,মুক্ত শিক্ষা,মুক্ত শিক্ষন, মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি নামেও পরিচিত।
৩. পরোহ্ম শিক্ষা -
এটি হল পরোহ্ম শিক্ষা। এক্ষেত্রে মুখোমুখি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব নেই। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহপাঠী ও শিক্ষকের যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ ঘটে।
৪. শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শিক্ষা -
এই শিহ্মার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর চাহিদা ও শিক্ষার্থীর সুবিধার উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৫. সহজলভ্য -
যে জায়গায় স্কুল অথবা কলেজ নেই, সেখানকার শিক্ষার্থীরাও দূরাগত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।যেসব শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে দুর্বল এবং যারা প্রথাগত শিক্ষা কেন্দ্র যেতে পারে না তারাও এই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
৬. ডিগ্রির সুযোগ -
দূরাগত শিক্ষার মাধ্যমে ডিগ্ৰি বা ডিপ্লোমা পাওয়া যেতেও পারে আবার নাও পাওয়া যেতে
দূরাগত শিক্ষা প্রথাগত শিক্ষার তুলনায় অনেক কম খরচে সম্ভব।
৭. গণশিক্ষা ও গনমাধ্যমে ব্যবহার -
দূরাগত শিক্ষাকে গণশিক্ষাও বলা যেতে পারে।কারণ এর মাধ্যমে লহ্ম লহ্ম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। গণমাধ্যমের ব্যবহার দূরাগত শিক্ষার বিভিন্ন গণমাধ্যম যথা রেডিও, পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।
৮. ভর্তির প্রক্রিয়া -
ভর্তির ক্ষেত্রে বাঁধাধরা কোনো নিয়ম নেই।
৯. কর্মরত ব্যক্তিদের সুবিধা -
চাকুরিরত ব্যক্তিরা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়াতে পারেন এই শিক্ষার মাধ্যমে।
১০. Drop out শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সুযোগ -
শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা সম্পূর্ন করতে পারে দূরাগত শিক্ষার মাধ্যমে।
১১. উন্নয়ন ও দহ্মতা বিকাশ -
দূরাগত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তার মানসিক ও বৌদ্ধিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
1.1.3. দূরাগত শিক্ষার উদ্দেশ্যাবলী -
দূরাগত শিক্ষা ব্যবস্থা উদ্দেশ্য গুলি হল -
১. সকলের জন্য শিক্ষা -
দূরাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় মাধ্যমে সকলের জন্য শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা হয়।যেখানে দরিদ্র ও মেধা সম্পন্ন বা অন্যান্য কারণে যারা নিয়ন্ত্রিত পড়াশোন সুযোগ পায় না। তাদেরকে শিক্ষার সুযোগ করে দেয় দূরাগত শিক্ষার মাধ্যমে।
২. উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ -
যে সমস্ত ব্যক্তিরা দারিদ্রতা কারনে বা অন্য কোনো কারণে উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে পারে না।তারা এই শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে পারে।
৩. কর্মরত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ -
যে সমস্ত ব্যক্তিরা কর্মরত তারা নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
৪. প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষা -
যে সকল ব্যক্তিরা শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী, তারা নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা লাভ করতে পারে না।তাদের জন্য এই শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
৫. জাতীয় সংহতিতে সহায়তা -
প্রত্যেকটি মানুষের কাছে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে শিক্ষার সার্বিক প্রসারের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি স্থাপন করে।
৬. স্বল্প খরচে শিক্ষা -
প্রথাগত শিক্ষার তুলনায় দূরাগত শিক্ষা খরচ এমনভাবে স্থির করা হয়,যাতে দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা এই শিক্ষা লাভ করতে পারে।
৭. প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার -
যে সমস্ত এলাকাতে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় নেই,সেই খানে এই শিক্ষার প্রসারে মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দানের সহায়তা করে।
1.1.4. দূরাগত শিক্ষার সুবিধা -
দূরাগত শিক্ষার সুবিধাগুলি হল -
১. সবার জন্য শিক্ষা -
দূরাগত শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই শিক্ষার সবার জন্য উন্মুক্ত।যে কোনো মানের উৎসুক শিক্ষার্থী এই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।তবে এর জন্য আলাদা করে কোনো প্রকার শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না, নির্দিষ্ট বয়সে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারে।
২. জাতীয় সম্পদের মূল্য -
দূরাগত শিক্ষার জাতীয় সম্পদের আর্থিক মূল্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।দেশের যে সব মানুষ গতানুগতিক নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার অংশ নিতে পারে না,তারা এই জাতীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের সম্পদ বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয়।
৩. শিক্ষার্থীদের আর্থিক সুবিধা -
দূরাগত শিক্ষার শিক্ষার্থীকে প্রতিটি গতানুগতিক শিক্ষার মতো বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয় না।এর ফলে তারা অবসর সময়ে পঠন-পাঠন করে ডিগ্রি লাভ করতে পারে।
৪. ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য -
দূরাগত শিক্ষার শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত সুবিধা উপভোগ করে।ফলে শিক্ষার্থীদের কোনো নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা মেনে নির্দিষ্ট শিক্ষালয় হাজির হতে হয় না।ফলে তাদের পঠন-পাঠনের সুবিধা হয়।
৫. শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি -
দূরাগত শিক্ষা মাধ্যমে সেই সমস্ত মেধা সম্পন্ন এবং আর্থিক কারণে নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা সহজে গ্রহণ করার সুযোগ প্রদান করা হয়।ফলে এই সকল ছাত্র-ছাত্রীরা এই জাতীয় শিক্ষার দ্বারা ডিগ্রী অর্জন করে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের সুযোগ পায়।
৬. ব্যক্তিত্ব আত্মোন্নতি -
দূরাগত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের আপন ইচ্ছায় নিজস্ব নির্দেশিকা পথে শিহ্মালাভ করে।ফলে তাদের ব্যক্তিত্বে আত্মোন্নতি এবং মানসিক বিকাশ ঘটে।
৭. প্রস্তুত বিষয়বস্তু প্রাপ্তি -
দূরাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের কোর্সের পাঠ্য বিষয় গুলি ছোটো ছোটো এককের মাধ্যমে প্রস্তুত করে সরবরাহ করা হয়।ফলে শিক্ষার্থীদের পঠন পাঠনের সুবিধা হয়।
৮. স্বল্প ব্যয় -
দূরাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশাল ব্যয়বহুল বিদ্যালয়, শ্রেণিকক্ষে,পরীহ্মাগার,ছাত্রাবাস ইত্যাদি কোনো প্রয়োজন হয় না।ফলে স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা লাভ করতে পারে।
1.1.5. দূরাগত শিক্ষার অসুবিধা -
দূরাগত শিহ্মা ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য গুলির হল -
১. সংস্কৃতিগত পরিবর্তন এবং সামাজিক উন্নতিতে বাধা -
দূরাগত শিক্ষার মানুষের বা শিহ্মার্থীদের মধ্যে সংস্কৃতি পরিবর্তন এবং সামাজিক উন্নতির সুযোগ সুবিধা পায় না।কারণ শিক্ষার্থীরা সাধারণত পরস্পরের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পায় না বললেই চলে।কেবল 'কনট্রাক্ট প্রোগ্রাম' এবং পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা একক হওয়ার সুযোগ পায়।
২. ভাব বিনিময়ের অভাব -
এই শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা পারস্পরিক ভাব বিনিময় করার সুযোগ পায় না।কেবল পরীক্ষায় স্বার্থে এবং ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্যে যেটুকু প্রয়োজন তাই করে।
৩. বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই -
এই শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তেমন নেই বা খুব কম।
৪. শিক্ষনীয় বিষয়বস্তুর গ্রহণযোগ্যতা -
এই শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সমস্ত শিহ্মনীয় বিষয়বস্তুর শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো হয়,সেটি তাদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে, সে বিষয়ের খোঁজ খবর নিয়ে বিষয়বস্তুকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ থাকে না।
৫. শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃ ক্রিয়া অভাব -
এই শিক্ষা ব্যবস্থার চলাকালীন কিছু আলোচনা শোনা ছাড়া প্রকৃত শিক্ষক - শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃ ক্রিয়া বলতে যা বোঝায়।তার সুযোগ এই জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় খুব কম থাকে।
৬. ডাক ব্যবস্থায় গন্ডগোল -
ডাক ব্যবস্থায় কোনো গন্ডগোল দেখা দিলে শিক্ষার্থীরা সময় মতো শিক্ষনীয় বিষয়বস্তু পায় না।ফলে পঠন পাঠনের খুব অসুবিধা দেখা দেয়।অনেক সময় পরীক্ষার তারিখ, এডমিট কার্ড প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সময় মতো গিয়ে পৌছাতে পারে না।
৭. ব্যবহারিক বিষয়ে গ্ৰহনযোগ্যতা -
দূরাগত শিক্ষার ব্যবহারিক বিষয়বস্তুর যথাযথ ভাবে গ্রহণের সুযোগ কম থাকে।দেখা যায় এক সপ্তাহে মধ্যে কোনো রকম ভাবে সংক্ষিপ্তভাবে পাঠ্যসূচির অন্তর্গত বিষয়গুলি অভ্যাস করানো হয়।ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক দিক গুলি ভালোভাবে শিখতে পারে না।
1.2. মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা -
1.2.1. মুক্ত শিক্ষার ভূমিকা -
মুক্ত শিক্ষা দুর শিক্ষার একটি শ্রেণি।মুক্ত শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে এই শিক্ষার মূল বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশ পায়।মুক্ত শিক্ষা বলতে এমন একটি শিহ্মাকে বোঝায় যেখানে বিধিনিষেধের বাঁধন তুলনা মূলকভাবে অনেকটা আলগা।সাধারণ শিক্ষার হ্মেত্রে যেমন প্রবেশ ও প্রস্থানের নিয়ম মেনে চলতে হয়।মুক্ত শিক্ষার ধারণাটি সর্বপ্রথম বিদ্যালয় স্তরে অন্তর্ভুক্ত করা হয় 1968 খ্রিস্টাব্দে 'করেসপন্ডেন্স টিচিং' রূপে।মুক্ত শিক্ষাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।একদলের মতে, মুক্ত শিক্ষার অর্থ হল করেসপন্ডেন্স শিক্ষা।এই অর্থটি অস্ট্রেলিয়াতে বহুল প্রচলিত। আবার দ্বিতীয় দলের মতে, মুক্ত শিক্ষার অর্থ হল শিক্ষার প্রবেশের ক্ষেত্রে সবথেকে কম বাধ্যবাধকতা বা বিধিনিষেধ আরোপ করা। এই অর্থে আমাদের দেশের মহীশূর এবং মাদুরাই বিশ্ববিদ্যালয় এই শিক্ষার ব্যবস্থা করে। আবার তৃতীয় দলের মতে, মুক্ত শিক্ষার অর্থ হল সমাজের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা।চতুর্থ ধারণা অনুযায়ী বলা হয়েছে, মুক্ত শিক্ষা বলতে এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বোঝায়,যেখানে শিক্ষার্থীদের বিষয় নির্বাচনে, মাধ্যমে নির্বাচনে এবং শিখন পদ্ধতি অনুসরণে বা ওই জাতীয় অন্যান্য বিষয়ে স্বাধীনতা থাকে।এই শিক্ষার ক্ষেত্রে বহুমুখী স্তর এবং বহুমুখী শিখন পদ্ধতি অনুসরণের সূযোগ থাকে। বর্তমানে মুক্ত শিক্ষা তৃতীয় এবং চতুর্থ মতের সমন্বয় গড়ে তোলা হয়েছে।
1.2.2. মুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য গুলি হল -
১. সবার জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সকলের জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত করা। শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণীতে ভর্তি হবার জন্য কোন যোগ্যতা লাগে না। তাঁরা যে শ্রেণিতে পড়ার শুরু করার পর কোনো কারনে শেষ করতে পারেনি তারা এই শিক্ষার অংশ নিতে পারে।
২. আপন গতি -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা আপন গতিতে নিজের সুযোগ সুবিধা মতো পঠন-পাঠন করতে পারে।এর জন্য নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে,শ্রেণীর উপস্থিত হওয়া বাধ্যবাধকতা থাকে না।
৩. ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা যে কোর্সের তারা নির্বাচন করবেন,সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্বাতন্ত্রতা প্রদান করা হয়।
৪. নমনীয়তা -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা যে কোর্সে ভর্তি হবে,সেই কোর্সের পাঠ্য পুস্তকের বিষয়বস্তু ছোটো ছোটো এককের প্রস্তুতিকরণ ও সরবরাহ করা হয়। যা তাদের শিক্ষা গ্রহণে সুবিধা হয়।
৫. যোগাযোগ প্রযুক্তি -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শিখনের জন্য শিক্ষকের উপর নির্ভর করে না,যোগাযোগের সাহায্যকারী প্রযুক্তির সাহায্যে শিক্ষা লাভ করে থাকে। যেমন টেলিভিশন,বেতার,কম্পিউটার এবং বর্তমানে অনলাইন এর মাধ্যমে।
৬. গৃহ নির্ভর শিক্ষা -
এই শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকা দরকার পড়ে না।তারা নিজেরা গৃহে বসেই পঠন পাঠন করতে পারে।
1.2.3. মুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থার উদ্দেশ্যাবলী -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্যাবলী গুলি হল -
১. জীবনব্যাপী শিক্ষা -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষা গ্রহণের সময় নির্দিষ্ট না থাকায় যে কোনো সময়ে এই শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। অর্থাৎ মুক্ত শিক্ষার হল জীবনের যে কোনো সময়ে যে কোনো ব্যক্তি এই শিক্ষা লাভ করতে পারে।
২. উচ্চ শিক্ষার সুযোগ লাভ -
যে সমস্ত ব্যক্তিরা বা শিহ্মার্থীরা দারিদ্রতার কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগের অভাবে বা অন্য কোনো কারণে উচ্চ শিক্ষা সুযোগ লাভ করতে পারে নি,তারা এই শিক্ষা মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করতে পারে।
৩. কর্মরত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ -
যে সমস্ত ব্যক্তি কর্মরত তারা নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
৪. প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার -
দেশের যে সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো পর্যন্ত শিক্ষার আলো পৌঁছাতে পারি নি।অর্থাৎ যে প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো বিদ্যালয় বা কলেজ নেই, সেই সকল অঞ্চলের মানুষদের কাছে এই শিক্ষা ব্যবস্থা মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
৫. নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার চাপ হ্রাস -
এই শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হল নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার উপর থেকে চাপ কমানো।বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নিয়ন্ত্রিত শিক্ষালয় গুলিতে শিক্ষার্থীদের এত ভিড় যে অনেক সময় বহু মেধাবী শিক্ষার্থীরা ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়।তবে এই শিক্ষার মাধ্যমে তারা সুযোগ পায়।
৬. প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষা -
যে সকল ব্যক্তিরা শারীরিক এবং মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী, তারা নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা লাভ করতে পারে না, ফলে তাদের জন্য এই শিক্ষা ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৭. গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি -
মুক্ত শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হল জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন ও সম্প্রসারণের জন্য গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা।
৮. জাতীয় সংহতিতে সহায়তা -
প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে শিক্ষার সার্বিক প্রসারের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি স্থাপন করা।
৯. স্বল্প খরচে শিক্ষা -
প্রথাগত শিক্ষার তুলনায় মুক্ত শিক্ষার খরচ এমনভাবে স্থির করা হয় যাতে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছেলে মেয়েরা এই শিক্ষা লাভ করতে পারে।
১০. শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি -
দেশের সার্বিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১১. পরিপূরক শিক্ষা পদ্ধতি -
মুক্ত শিক্ষার গতানুগতিক নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার পরিপূরক হিসেবে সব মানুষের কাছে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করে।
1.2.4. মুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থার সুবিধা -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার সুবিধা গুলি হল -
১. শিক্ষাক্ষেত্রে অবাধ প্রবেশাধিকার -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের কোনো শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার জন্য কোন নির্দিষ্ট যোগ্যতা লাগে না।তারা সহজেই পছন্দ মতো শ্রেণী বা কোর্সে ভর্তি হতে পারে।
২. শিহ্মার স্বাধীনতা -
মুক্ত শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের যে কোর্স তারা নির্বাচন করবেন,সেই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দেওয়া হবে। যাতে সহজেই এবং স্বাধীনভাবে পঠন-পাঠন করতে পারে।
৩. শিক্ষাব্যবস্থার নমনীয়তা -
মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের যে কোর্সের ভর্তি হবে সেই কোর্সের পাঠ্যপুস্তক গুলি গতানুগতিক নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনা সহজ হবে এবং ছোটো ছোটো এককের বিভক্ত করা হবে।যা শিক্ষার্থীদের কাছে গ্ৰহনে অনেক বেশি নমনীয় হবে।
৪. গৃহ নির্ভর শিক্ষা -
এই শিক্ষা ব্যবস্থায় পঠন-পাঠনের জন্য শিক্ষার্থীদের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকে না।তারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রয়োজনের তাগিদে উপস্থিত হতে পারে বা নাও হতে পারে।মূলত গৃহে বসেই পড়াশুনা করতে পারে।
৫. যোগাযোগ প্রযুক্তি -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শিখনের জন্য শিক্ষকের উপর নির্ভর না করে যোগাযোগের সাহায্যে কারী প্রযুক্তির সাহায্য গ্রহণ করে।যেমন - বেতার, দূরদর্শন, টেপরেকর্ডার, কম্পিউটারের সহায়তা গ্ৰহন করা হচ্ছে এবং বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে মুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে।
৬. শিখনের গুণগত মান -
মুক্ত শিক্ষার ক্ষেত্রে শিখনের গুণগত মান খুবই ভালো। কারণ এই শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যপুস্তক ও শিখনীয় বিষয়বস্তু গুলি শিক্ষার্থীদের প্রদান করা হয় সেই গুলি দেশের সর্বাপেক্ষা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।যা শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য।
৭. শিহ্মার সুযোগ বৃদ্ধি -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সমস্ত মেধা সম্পন্ন এবং আর্থিক কারণে নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা গ্ৰহন করার সুযোগ পায় না, তাঁরা এই শিক্ষা মাধ্যমে শিক্ষার দ্বারা ডিগ্ৰি অর্জন করে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের সুযোগ পায়।
1.2.5. মুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থার অসুবিধা -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সমস্ত অসুবিধা গুলো লক্ষ্য করা যায়,সেগুলি হল -
১. পাঠ্যপুস্তক প্রস্তুতি কারী অভিজ্ঞ ব্যক্তির অভাব -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠনের জন্য যে সমস্ত পাঠ্যপুস্তক ও শিখন বিষয়গুলি দেওয়া হয়,তা প্রস্তুতকারী অভিজ্ঞ শিক্ষক সর্বদা পাওয়া যায় না।যা মুক্ত শিক্ষা একটি অন্যতম অসুবিধা।
২. ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবহারিক বিষয়গুলি যথাযথভাবে গ্রহণের সুযোগ কম থাকে।দেখা যায় এক সপ্তাহের মধ্যে কোনো রকমে সংক্ষিপ্ত ভাবে পাঠ্যসূচির অন্তর্গত বিষয় গুলিকে অভ্যাস করানো হয়।ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক দিক গুলি ভালোভাবে শিখতে পারে না।
৩. শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আন্তঃ ক্রিয়া অভাব -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় চলাকালীন কিছু আলোচনা শোনা ছাড়া প্রকৃত শিক্ষক শিক্ষার্থী মধ্যে আন্তঃ ক্রিয়া লক্ষ করা যায় না।
৪. বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তু ছাড়া বাস্তবিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সূযোগ তেমন নেই বা খুব কম।
৫. শিখনীয় বিষয় বস্তুর গ্রহণযোগ্যতা -
এই শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সমস্ত শিক্ষনীয় বিষয় বস্তু শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো হয়,সেটি তাদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে সেই বিষয়ের খোঁজ খবর নিয়ে বিষয়বস্তু আরো সমৃদ্ধ করার সুযোগ থাকে না।
৬. প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর অভাব -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের অভাব লক্ষ্য করা যায়।
৭. প্রযুক্তিগত অভাব -
মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় মূলত প্রযুক্তির মাধ্যমে পঠন পাঠনের করানো হয়।প্রযুক্তিগত ক্রটি মুক্ত শিক্ষার একটি বড়ো সমস্যা।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you