Ticker

100/recent/ticker-posts

Translate

শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম এবং শিক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রে পেস্তালজির অবদান আলোচনা করো।

 শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠক্রম এবং শিক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রে পেস্তালজির অবদান আলোচনা করো।

ভূমিকা:-পেস্তালজি  শিক্ষার মাধ্যমেই উপযুক্ত মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন যতক্ষণ না পর্যন্ত মানুষকে প্রকৃত মানুষরূপে (as true man) গড়ে তোলা যাচ্ছে, অর্থাৎ তার মধ্যে মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণতা আসছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি যেমন সুখী হতে পারে না তেমনি সমাজকেও সুখী করতে পারে না। এই জন্য তিনি স্বাভাবিক, সুসমন্বিত এবং উন্নয়নমূলক শিক্ষা (Natural, Harmonious, Progressive Education)-র ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাগুলি বিকশিত করতে চেয়েছিলেন। সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য অতি প্রয়োজনীয় গুণাবলি, যেমন-ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা অন্যের মঙ্গল কামনা প্রভৃতি তিনি শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত করতে চেয়েছিলেন।

পেভালৎসির মতানুসারে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্যগুলি নীচে আলোচনা করা হল-

(1) শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত ক্ষমতার বিকাশসাধন (Development of inner power or leamers): পেস্তালজি মতে, মানুষের মধ্যে তিন প্রকার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে যথা-দৈহিক, মানসিক এবং নৈতিক (Physical, Mental and Moral) শিক্ষার প্রথম লক্ষ্যহল শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার সমন্বিত ও স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশে সহায়তা করা।

(2) মানবীয় গুণাবলির বিকাশসাধন (Development of human qualities):- পেস্তালজিত সময় সমাজবদ্ধ মানুষের মধ্যে মানবীয় গুণাবলি, যেমন-ভালোবাসা, সহযোগিতা, প্রয়াস অনুকৃতি, দয়াশীলতা, সমাজসেবা প্রমুখ গুণাবলির অভাব ছিল। এই জন্য তিনি উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সকল দিক পরিপূর্ণ রূপে মেলে ধরতে চেয়েছেন।

(3) মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা (Making a man self-dependent):- তৎকালীন সময়ে   পেস্তালজির  পারিপার্শ্বিক পরিবেশে, মানুষজন অত্যন্ত পরিমাণে আর্থিক দূরবস্থা ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিনযাপন করত। এর প্রধান কারণ ছিল অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন, যাতে তারা নিজেদের ভরণপোষণ এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংরক্ষণ করতে পারে। এই উদ্দেশ্যে তিনি বৃত্তিমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

(4) সামাজিক উন্নয়ন (Social progress):- পেস্তালজির মতে, সামাজিক প্রগতি নির্ভর করে বাক্তির উন্নয়ন ও প্রগতির ওপর। তাই তিনি শিক্ষার্থীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পরিপূর্ণ বিকাশসাধন করতে চেয়েছেন, কারণ তিনি জানতেন ব্যক্তির উন্নতি হলেই সমষ্টির উন্নতি ঘটবে।

(5) ধর্ম ও নৈতিকতার বিকাশ (Development of religiosity and morality):পেস্তালজি বিশ্বাস করতেন যে, ধর্ম এবং নৈতিকতা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। মানুষ তার ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, ভালোমন্দ পরিপূর্ণরূপে বিচার করতে শেখে। এই জন্য তিনি শিক্ষার মাধ্যমে ধর্মীয় চেতনা ও নৈতিকতা বোধ জাগ্রত করতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার একটি অন্যতম লক্ষ্যহল শিক্ষার্থীর ধর্মীয়বোধ ও নৈতিকতা জাগ্রত করা।

পাঠক্রম (Curriculum): পোলৎসি মূলত বিদ্যালয় শিক্ষার (3-13 বছর) পাঠক্রমের ওপর আলোকপাত করেছেন। অর্থাৎ তাঁর মতে শিক্ষার্থীর অভ্যন্তরীণ সুপ্ত সম্ভাবনা সর্বাগ্রে বিকশিত করতে হবে। এইজন্য শিক্ষার্থীকে খেলাধুলা ও চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ করে দিতে হবে। তিনি ভাষাশিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, কারণ উপযুক্ত ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী মনের ভাব পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ করতে সমর্থ হয়। তাঁর মতে ছবি আঁকা এবং সংগীত শিক্ষার্থীদের অনুভূতি প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তাই তিনি বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে এগুলির অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেন। তিনি দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। তাই তিনি বৃত্তিমুখী শিক্ষাকে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। যেহেতু তিনি ধর্ম এবং নৈতিকতাকে মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত করেছেন, তাই শিক্ষার পাঠক্রমে একদম প্রারম্ভিক অবস্থা থেকেই ধর্ম, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন যে শিক্ষা শিশুকে প্রকৃত মানুষ রূপে গড়ে তুলতে পারে না, সেই শিক্ষা হল অসম্পূর্ণ। পেস্তালৎসির প্রস্তাবিত পাঠক্রমে লেখা পড়া ও গণিত স্থান পেয়েছিল। এ ছাড়াও পাঠক্রমে ভূগোল, ইতিহাস, প্রকৃতি পরিচয়, অঙ্কন, সংগীত, শরীরচর্চা, কৃষিকাজ প্রভৃতি প্রয়োজনীয় বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি শিক্ষার্থীদের মনে বহির্জগৎ সম্পর্কে কৌতূহল জাগ্রত করার জন্য পাঠক্রমে প্রকৃতি পরিচয় (Nature Study)- এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের জৈবিক বিকাশে সহায়তা করার জন্য নিয়মিত দেহচর্চাকেও শিক্ষার পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

শিক্ষাদান পদ্ধতি (Method of Teaching):- পেস্তালজী পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি (observation method) কে শিক্ষাদান পদ্ধতি হিসাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মৌখিক শিক্ষার উপর কোন গুরুত্ব না দিয়ে বস্তুভিত্তিক পাঠদান (object lesson)- এর উপর তিনি জোর দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে শিশু শিখবে মূর্ত বস্তু (concrete object) পর্যবেক্ষণ করে। তাছাড়া শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে শিশু বয়স অনুযায়ী। সহজ থেকে ক্রমশ কঠিন (from simple to difficult)। আবার শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককে ভাগ করে তিনি শিক্ষা দেবার কথা বলেছেন। Mori-এর মতে পোলজী প্রবর্তিত শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ।

(a) ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ:- শিক্ষাদানের ভিত্তি হবে পর্যবেক্ষণ অথবা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ।

(b)ভাষা বা বিষয়বস্তুর সম্পর্ক :- পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ভাষা বা বিষয়বস্তু সর্বদা সম্পর্কযুক্ত হবে।

(c) বিচারকরণ ও সমালোচনার সময় ভিন্ন:- শিখনের জন্য সময়, বিচারকরণ ও সমালোচনার জন্য সময় কখনও এক নয়।

(d) মনস্তাত্ত্বিক দিকে নজর দেওয়া :- যে কোনও শাখার কোনও বিষয় শিক্ষাদানের সময় সরলতম বিষয় থেকে ক্রমশ জটিল বিষয়ের দিকে অগ্রসর হতে হবে এবং শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক দিকটির প্রতিও নজর রাখতে হবে।

e) বৌদ্ধিক ক্ষমতার বিকাশ:- শিক্ষাদানের সময় খেয়াল রাখতে হবে শুধুমাত্র জ্ঞানের বিকাশসাধন নয়, শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক ক্ষমতার বিকাশ ও শ্রীবৃদ্ধি সাধনে সাহায্য করা। 

(f) পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ :- শিক্ষাদানের সময় শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানতে পারে।

(g) বিকাশমূলক দৃষ্টিভঙ্গী:- শিক্ষাদানের সময় বিকাশমূলক দিকের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

 (h)ব্যক্তিগত মনোযোগ:-  শিক্ষক/শিক্ষিকা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত দিকের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ দেবেন।

(i) দক্ষতার সংযোগসাধন :- জ্ঞানের সঙ্গে ক্ষমতার এবং শিখনের সঙ্গে দক্ষতার সংযোগসাধন হওয়া দরকার।

উপসংহার:- পেস্তালজীর শিক্ষাদান পদ্ধতির অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সিলেবারিজ (Syllabaries)-এর প্রবর্তন। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে শিশু জটিল শব্দগুলি সহজ ও সরল করে উচ্চারণ করতে সক্ষম হবে। তাঁর মতে প্রকৃত জীবনাদর্শ গড়ে তুলতে হলে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে শিক্ষা দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, "A man who has only Word Wisdom is less susceptable to truth than a savage"। তিনি যেসব শিক্ষাদান পদ্ধতির কথা বলেছেন তার মধ্যে পাঠ্যবস্তুর বিশ্লেষণ, ইন্দ্রিয় পরিমার্জনার শিক্ষা, মনোবিদ্যা সাতশিক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ